একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারে থাকতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা। মন্ত্রীর পদ পেতে নানাভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর অনেকটা ব্যর্থ হয়েই দুই মাস ধরে মন্ত্রিপরিষদে জায়গা করে নেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে দল গোছানোর কাজে নেমেছেন তারা। তাতেও তাদের হতাশা কাটেনি। কারণ দীর্ঘ ১০ বছর অর্থাৎ টানা দুটি সংসদে সরকারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় মাঠপর্যায়ে এখনো নেতাকর্মীদের আস্থা পাচ্ছেন না শীর্ষ নেতারা। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীরা তাদের প্রশ্ন করছেন, আবার মন্ত্রিত্ব পেলে বা বড় ধরনের কোনো সুযোগ পেলে দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে কি না?
সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের একজন জেলা নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি-দুটি মন্ত্রী পাওয়া দলের জন্য ক্ষতি হয়েছে। দল একবার ভাঙনের মুখেও পড়েছে এবং সেটিও শীর্ষ নেতাদের লাভ-লোকসানের হিসাবে গরমিল হওয়ায়। তারপরও এবার জাসদ থেকে মন্ত্রী না পাওয়ায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতারা বেশ খুশিই হয়েছে। তবে নেতারা এখনো নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। দলের সাংগঠনিক কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়েছে। মন্ত্রিত্বের আশা বাদ দিয়ে তারা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যদি সবসময় কর্মসূচি চাঙা রাখে এবং জনগণের পক্ষে কর্মসূচি দেয়, তা হলে ধীরে ধীরে তাদের আস্থা ফিরে আসবে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির একজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মার্চে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় প্রধান রাশেদ খান মেননের ডাকা কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা গত দুটি সংসদে মন্ত্রিত্বে থাকায় দলের যে বিপর্যয় হয়েছে, সেটি তুলে ধরেন। এরপর আবার সংরক্ষিত আসনে নিজের স্ত্রীকে মনোনয়ন দেওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। গত অধিবেশনে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সাংসদরা সংসদে যোগ দিলে দলের নেতাকর্মীরা রাশেদ খান মেননের কাছে জানতে চান তারা আবারও সরকারি দলে যাবেন কি না? এর মধ্যে গত দুই মাসে মেনন বন্যা, গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে সভা-সমাবেশ করেন এবং নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন, এবার তারা জোটের চেয়ে বেশি দলে মনোযোগ দেবেন।
জানা গেছে, নেতাকর্মীরা মেনন এবং সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এসব নেতার ওপর পুরো বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। নেতাকর্মীরা চান মন্ত্রিত্বের আশা বাদ দিয়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো শক্ত করা হোক।
১৪ দলের শীর্ষ একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের পর থেকে হতাশা বিরাজ করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দলগুলোর মধ্যে। বিএনপি সংসদে অংশ নিলে তাদের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই হবে এমন আশা ছিল এত দিন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই আশা ক্ষীণ হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাসদ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাকি দলগুলো নিজেদের গোছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে সম্প্রতি ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি, পদ্মা সেতুর জন্য কল্লা কাটা গুজব এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে অনেকটাই নীরব ছিল শরিক দলগুলো। গণপিটুনি, ডেঙ্গু, ছেলে ধরা গুজব ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা সরকারের ব্যর্থতার কথা বলতে শুরু করেছেন।
দুই মাসে এসব দলের নেতারা রাজধানী এবং সারা দেশে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে ডেঙ্গু বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র যখন বিতর্কিত হয়ে পড়ছেন, সে সময়ে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসারত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সাম্প্রতিক বিষয়গুলো মোকাবিলার জন্য আলোচনার পরামর্শ দেন। এরপর ১৪ দলের নেতারা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ডেঙ্গু সচেতনতা নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করেন। জানা গেছে, শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী ওবায়দুল কাদের জুলাই মাসের শেষ দিকে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন এবং সরকারের কর্মসূচিতে তাদের থাকার অনুরোধ জানান।
আওয়ামী লীগের একজন সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্যা, ডেঙ্গু ও গুজবের কারণে সরকার কিছুটা চাপে পড়ে। তখন শরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। শরিক দলগুলোর নেতারা সে সময় তাদের দেনা-পাওনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হওয়ার পর থেকেই শরিকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দূরত্ব বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, মন্ত্রিপরিষদে আর অন্য দলের স্থান না দেওয়াই ভালো। শরিক দলগুলো বিষয়টি বুঝতে পেরে দল গোছাতে নেমেছে।
গত ৩১ জুলাই দেশব্যাপী জাসদ সুশাসন দিবস দিয়ে সরকারের সমালোচনা করে কর্মসূচি শুরু করে। বন্যা উপদ্রুত এলাকা ছাড়া সব জেলা-উপজেলায় মানববন্ধন, সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি পালন করে।
১৪ দলের নেতাদের অভিমত, নির্বাচন ও সরকার পরিচালনা এ সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে ১৪ দল গঠিত হয়। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শরিক দলগুলোর সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৪ দলকে অনেকটাই পাশ কাটিয়ে চলার নীতি নিয়ে আওয়ামী লীগ অগ্রসর হচ্ছে বলে শরিক দলগুলোর নেতাদের অভিযোগ। এ পর্যায়ে তারা একলা চল নীতি নিলেও নেতাকর্মীদের কাছে জায়গা করতে পারছে না।
সরকারের গত মেয়াদে মন্ত্রিসভায় ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন ও জাসদ সভাপতি ইনু। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম মেয়াদে ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে কাউকে মন্ত্রী করা না হলেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারে মেননকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে জাসদের সভাপতি ইনুকে মন্ত্রী করা হয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারেও তিনি মন্ত্রী ছিলেন।
সরকারের প্রথম মেয়াদে মন্ত্রী ছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন, আমরা যখন ১৪ দলের শরিক হিসেবে মন্ত্রী ছিলাম, তখনো সংসদে এবং বাইরে সরকারের খারাপ কাজের সমালোচনা করেছি। এখনো করছি। তিনি বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো, ডেঙ্গু নিয়ে সরকারের মন্ত্রী এবং দায়িত্বশীলদের এলোমেলো বক্তব্য এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে সভা-সমাবেশে কথা বলেছি। তিনি বলেন, আমরা দলকে শক্তিশালী করছি।
জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাসদ সব সময়েই সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। আমরা দেশব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছি। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রতিদিনই একাধিক সভা-সমাবেশ করছি। সংসদে ও সংসদের বাইরে আমরা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করব।