শোক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

আ.লীগের বেইমান মোনাফেকরা জিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়া প্রথমে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট, তারপরে রাষ্ট্রপতি ভোট অনেক নাটক করে, এরপর রাজনৈতিক দল করলেন এবং সেটাও কয়েক দফা দলের নাম পরিবর্তন করে এই বিএনপির সৃষ্টি। আর সেই দলে যোগ দিল কে? আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী বেইমান-মোনাফেক তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। তারা ছাড়া সব নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কারাগারে ছিল। কিন্তু তারা যে এই চক্রান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িত তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না এবং আজ তা প্রমাণিত।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় ১৫ আগস্ট ভাগ্যচক্রে বেঁচে যাওয়াসহ সপরিবারে নৃশংস এই হত্যাকান্ডের কথা বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়ার সময়ে বহু নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে গেছে। দিনের পর দিন অত্যাচার করেছে। তার পরিবার লাশটাও পায়নি। আজ তারা গুম-খুনের কথা বলে। এই গুম-খুনের কালচার তো এ দেশে শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। আমাদের নারায়ণগঞ্জের ছাত্রনেতা মাহফুজ বাবু, তাকে যে তুলে নিয়ে গেল তার পরিবার তো আর তার লাশ পায়নি। শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর এই জুলুম-অত্যাচার তা নয়, সেনাবাহিনীতে যারা মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ছিলেন, যারা একদিন জাতির পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করেছিলেন, সে রকম বহু অফিসারকে নির্মমভাবে একের পর এক হত্যা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, মোশতাক বেইমানি করে ক্ষমতায় গিয়েছিল। আড়াই মাসও কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ঠিক যেভাবে মীরজাফর বেইমানি করে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেছিল, মীরজাফরও কিন্তু ওই দুই মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। এই মোশতাকই কিন্তু জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিল। আর পরবর্তী সময়ে সেই সেনাপ্রধানই এ দেশের একদিকে সেনাপ্রধান আরেক দিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেন আর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখি। টক শো বেশি একটা দেখার সুযোগ হয় না; তবুও দেখি। ইদানীং বিএনপির নেতারা নিজেদের সাফাই গাইতে একটা কথা বলা শুরু করেছে। ১৯৭৫-এ তো বিএনপির প্রতিষ্ঠাই হয়নি। কাজেই তারা আবার খুন করল কীভাবে? এটির পক্ষে সাফাই গাওয়ার তো কিছু নেই। বিএনপি নেতাদের এটিও জানা উচিত, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করেছে। বিএনপি খুনিদের দল যদি না হবে তাহলে স্যার টমাস উইলিয়াম এমপিকে কেন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের তদন্ত করতে আসতে দেয়নি?

দুই বোনের পঁচাত্তর-পরবর্তী লড়াইয়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি যখন দেশে ফিরতে পারলাম না। ১৯৭৯ সালে প্রথম রেহানা সুইডেনে যায়। কারণ সুইডেনে আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন ড. রাজ্জাক মোশতাক সরকারের কাছে আনুগত্য প্রকাশ করেননি এবং বলেছিলেন আমি খুনিদের চাকরি করব না। সেই পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন এবং এর প্রতিবাদ করেছিলেন। শুধু তা-ই না তিনি সেখানে একটা সভার আয়োজন করেন। রেহানা সেখানে ১৫ আগস্টে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করে বক্তব্য দিয়েছিল। রেহানার পাসপোর্টের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ দূতাবাস সেই পাসপোর্টের মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি।

আমি ১৯৮০ সালে লন্ডনে গেলাম। এ ব্যাপারে তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ওখানে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করে দিয়েছিলেন। এরপর লন্ডনে গিয়ে প্রতিবাদ সভা করি এবং সেখানে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠন করি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যিনি জাতির পিতাকে সমর্থন করতে এসেছিলেন স্যার টমাস উইলিয়ামস (কুইন্স কাউন্সিলের তিনি সদস্য)। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি ছিলেন। তিনি এবং শন ম্যাকব্রাইড আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নোবেল লরিয়েট, তাকেসহ ব্রিটিশ অন্যান্য দলের এমপিদের নিয়ে আমরা একটা ইনকোয়ারি কমিটি করি এবং এই ইনকোয়ারি কমিটিতে প্রবাসী বাঙালিরা তারা সেখানে ডোনেশন দেয় এবং ইনকোয়ারি কমিটির পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসবেন, এই ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের তদন্ত করার জন্য এবং স্যার টমাস উইলিয়ামস কিউসি এমপিকে আমরা ঠিক করি তিনি আসবেন এবং ওনাকে একটি সলিসিটারও নিয়োগ দেওয়া হয়, যার কাছে ফান্ড থাকত এবং সব কাজগুলো হবে। তিনি যখন ভিসা চাইলেন, জিয়াউর রহমান তখন রাষ্ট্রপতি। জিয়া কিন্তু স্যার টমাস উইলিয়ামস এমপিকে ভিসা দেননি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় তিনি যখন এসেছিলেন, তখন কিন্তু পাকিস্তান সরকারও ভিসা দিয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টের পরে যখন ১৯৮০ সালে স্যার টমাস উইলিয়ামস আসতে চাইলেন, জিয়াউর রহমান তাকে ভিসা দিলেন না।

প্রশ্ন এখানে, বিএনপি নেতাদের এটা আমি বলতে চাই এবং জিজ্ঞাসা করি, জিয়া যদি খুনি না হবেন, আর তার হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এই বিএনপি, এরা যদি খুনিদের দল না হবে আর খুনির দল না হয়, তাহলে স্যার টমাস উইলিয়াম কিউসি এমপিকে কেন বাংলাদেশে তদন্ত করতে আসতে দেয়য়ি? তার দুর্বলতাটা কী ছিল? তিনি কিন্তু ভিসা দেননি।

চরিত্রটাই তো এ ধরনের খুনের। যেটা আপনারা দেখতে পারেন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায়। কীভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড হামলা হলো। আইভি রহমানসহ আমাদের ২২ জন নেতাকর্মী নিহত। তাদের লাশও তো দিতে চায়নি। ২০০১ সালে এসে ঠিক একাত্তর সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যেভাবে, যে প্রক্রিয়ায় হত্যাকা- ও গণহত্যা চালিয়েছে, বিএনপি কিন্তু সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করল। জঙ্গিবাদ সৃষ্টি ও সন্ত্রাসে মদদ দেওয়া, চোরাকারবারি, মানি লন্ডারিং এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি। এভাবে তারা সমাজটাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ২১ বছর, আবার ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্তÑ এ দেশের মানুষ কী পেয়েছিল? মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তো কেউ কাজ করেনি। তাদের নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। এসব কাজে তাদের মনোযোগই ছিল না।

ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় ঢাকা মহানগর নেতাদের মধ্যে বক্তব্য দেন দক্ষিণের সহসভাপতি আবু আহম্মেদ মান্নাফী, উত্তরের সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমান, জাহানারা বেগম, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি ও কামাল চৌধুরী।