‘আমার মুন্না খুব মেধাবী ছিল। প্রতি রাতে আমাকে সালাম না দিয়ে ও ঘুমাতে যেত না। এমন মা-ভক্ত ছেলেটাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেল। তাকে আজও খুঁজে পেলাম না। ও বেঁচে আছে, না মরে গেছে তাও জানি না। আমার ছেলেকে আমি আমার কোলে চাই। ওর কারণে আজ আমার পুরো পরিবার দিশেহারা।’
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজামউদ্দিন মুন্নার উত্তরা দক্ষিণখানের মোল্লারটেক তেঁতুলতলার বাসায় গেলে এসব কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা ময়ূরী বেগম। এ সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুলও।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ‘গুম হওয়া নেতাকর্মীদের’ পরিবারকে সান্ত¡না দিতে এদিন তাদের বাড়ি বাড়ি যান বিএনপি নেতারা। মুন্নার মা বিএনপি মহাসচিবকে বলেন, ‘ছেলের সন্ধানে ওর বাবা সামছুদ্দিন আহমেদ থানা, পুলিশ, র্যাবের কার্যালয়ের ঘুরে ঘুরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারাই গেলেন মুন্নার বাবা। সম্প্রতি ওর ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছে। এভাবে একের পর এক ঘটনায় আমাদের পরিবার পুরো দিশেহারা।’
মুন্নার মা অভিযোগ করে জানান, ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেমবাগান এলাকা থেকে তার ছেলেকে তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মুন্না বিমানবন্দর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ‘শুধু বিএনপির রাজনীতি করার কারণে আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ছেলে মৃত না জীবিত তা কিছুই জানি না। তার কবরে গিয়ে যে দোয়া করব সে সুযোগটাও নেই’Ñ বলেন তিনি।
এ সময় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল, মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদ, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন। এরপর মির্জা ফখরুল যান তেজগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান সুমনের শাহীনবাগের বাসায়।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বসুন্ধরা থেকে সুমন নিখোঁজ হন জানিয়ে তার বোন সানজিদা ইসলাম তুলি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুমের বিষয়টি হত্যাকা-ের চাইতেও বেশি ভয়াবহ। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সুমনের দুটি ছেলে আছে। তারা যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আমার বাবা কই ফুপু, তখন উত্তর দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আমার থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘সুমন যখন নিখোঁজ হয় তখন তার মেয়ে আরওয়ারের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। এখন ওর বয়স আট বছর। ছয় বছরেও বাবার দেখা পায়নি মেয়েটা। গুমের সময় মনে দাগ না কাটলেও এখন প্রতিনিয়ত বাবাকে খুঁজছে।’
সুমনের মা হাজেরা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে জানি না। ছেলের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয় এই বুঝি ফিরে এলো আমার ছেলে। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। চোখে পানি চলে আসে।’ সুমনের মেয়ে আরওয়ার সেখানে দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘আঙ্কেল, আমার বাবাকে দেখতে চাই। আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাও। সবার বাবা আছে, আমার বাবা নেই কেন? সরকারকে বলো আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে।’
সুমনের বাসা থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল যান বনানীতে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর বাসায়, যিনি নিখোঁজ হন ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল। এ সময় ইলিয়াস আলীর মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল, ছোট ছেলে লাবিব ইলিয়াস মির্জা ফখরুলের সামনে আসেননি। বড় ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস ও স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা কথা বলেন তার সঙ্গে।
লুনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস নিখোঁজের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। এখনো তার কোনো খোঁজ নেই। সে কোথায় আছে জানি না। ছেলেমেয়েরা এখন বুঝতে শিখেছে। তাই তারা কোনো প্রশ্ন করে না।’ তিনি বলেন, ইলিয়াস নিখোঁজের সময় সাইয়ারা নাওয়াল ক্লাস টুতে পড়ত। এখন সে বড় হয়ে গেছে। ক্লাস নাইনে পড়ে। আগে মানারাত স্কুলে পড়লেও এখন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ে সাইয়ারা।
মির্জা ফখরুল সে বাসার নিচে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীন দেশের জনগণ গুম সম্পর্কে খুব একটা জানত না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে জনগণ দেখছে মানুষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পরে আর তাদের কোনো হদিস থাকে না। রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা গুমের শিকার হচ্ছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ২০১২ সালে প্রথম নিখোঁজ হন বিএনপির নেতা চৌধুরী আলম। তাকে রাজধানীর ফার্মগেট থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তারপর নেওয়া হয় এম ইলিয়াস আলীকে। তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি যে দেখেছে সেও গুম হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে। অথচ সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণকে গুম করছে। পাকিস্তান আমলেও এমনটা হয়নি। গুমের বিষয়টি জাতিসংঘের চার্টার অনুযায়ী মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ। শুধু রাজনীতি করার কারণে মানুষ গুম করার অপরাধের বিচার একদিন না একদিন হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে আজ গুম হওয়া নেতাকর্মীদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমরা গুম হওয়া পরিবারগুলোর পাশে আছি, থাকব।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল বিকেলে বংশালে ছাত্রদল নেতা সোহেলের বাসায় যান, যার খোঁজ নেই ২০১৩ সাল থেকে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ‘গুম হওয়া’ যুবদল নেতা জহির, পারভেজ ও চঞ্চলের স্বজনরা। মোশাররফ হোসেন তাদের সান্ত¡না দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল।
পরে মোশাররফ হোসেন উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, গুম করা একটি গর্হিত অপরাধ। এটা সারাবিশ্বে স্বীকৃত অপরাধ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বর্তমান সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই গুম, খুন, হত্যা ও গায়েবি মামলাসহ বিভিন্নভাবে বিরোধ কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য এই নির্যাতনমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘গুম হওয়া নেতাকর্মীদের’ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যারা গুম হয়েছে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০৯ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী রয়েছেন। বর্তমান সরকার একদলীয় শাসনব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী করতে গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।