বর্তমানে মশা বা মশাবাহিত রোগ একটি বৈশি^ক সমস্যা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন মারাত্মক ডেঙ্গুপ্রবণ। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে মশা আমাদের জন্য সমস্যা হলেও এ বছরের প্রাদুর্ভাব সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগ মোকাবিলা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং প্রোটেকশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সফল ও টেকসই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। দেশে বর্তমানে মশা নিয়ন্ত্রণ বা দমন পুরোটাই সিটি করপোরেশননির্ভর। আমরা সাধারণ মানুষ পুরোপুরি নির্ভর করছি সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের ওপর। মশা নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ বলতে আমরা সিটি করপোরেশনকেই বুঝি। তবে মশা দমনের বিষয়টা এই একক
কর্র্তৃপক্ষ যেভাবে দেখছে বা সার্বিকভাবে যেভাবে দেখা হচ্ছে, তাতে সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মশার নিয়ন্ত্রণ বা দমনকে সাধারণভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা দরকার। মশার উৎপাত বা ডেঙ্গু/চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়লে অন্যত্র এক্সপার্ট না খুঁজে নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। মশা দমন খাতে আমরা অনেক টাকা খরচ করছি কিন্তু সুফল পাচ্ছি না। তাই, মশা দমনের বিষয়টাকে আলাদা নজর দিয়ে দক্ষ লোকবলের সমন্বয়ে যুগোপযোগী, গবেষণাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করা দরকার। মশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশ-বিদেশে যারা কাজ করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। যে করেই হোক আমাদের প্রয়োজন একটি সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
মশা দমনে কর্র্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। অবশ্য তাদের জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও চোখে পড়ার মতো। তবে এ কথাও সত্য, আমাদের দমন কার্যক্রম প্রধানত কীটনাশক স্প্রেইং/ফগিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। মশার কার্যকর দমনের জন্য বেশ কিছু বিষয় আগাম জানার জন্য গবেষণা অতীব জরুরি। যেমন এলাকাভিত্তিক মশার উপস্থিতি/আধিক্য, মশার রেজিস্ট্যান্স লেভেল, কীটনাশকের কার্যকারিতা ইত্যাদি। আর সেই জায়গাটাতেই আমরা কম গুরুত্ব দিচ্ছি। নির্ভর করছি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইত্যাদি) ওপর। আমাদের মশা নিধন কার্যক্রম মোটেও গবেষণানির্ভর নয়। আবার দেশে মশা নিয়ে যতটুকু গবেষণা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে এবং তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে আমরা গবেষণালব্ধ তথ্য কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আমরা কীটনাশক প্রয়োগ করছি কিন্তু মশা কিছুতেই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মনে রাখতে হবে, মশা নিয়ে নিয়মিত/রুটিনমাফিক গবেষণা, সঠিক দমন পদ্ধতি (কীটনাশক বা জৈবনাশক) বাছাই ইত্যাদি ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ও টেকসই কোনো দিনই হবে না। তাই মশার সফল নিয়ন্ত্রণে কয়েকটা বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।
১. মশা নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন) ইউনিট আধুনিকায়ন
আমাদের মশা নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন) ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী তথা আধুনিক করতে হবে। মশার বায়োলজি ও কীটনাশক সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ লোকের দ্বারা তা পরিচালিত হতে হবে। অপারেশন টিমকে/টেকনিশিয়ানকে কীটনাশক প্রয়োগে যথাযথ ট্রেনিং দিতে হবে। কীটনাশকের (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) সঠিক ব্যবহার বিধি জানতে হবে। ফগার মেশিন ছাড়াও নতুন নতুন মেশিন (ইউএলবি স্প্রেয়ার) যোগ করতে হবে। কীটনাশক বাছাইয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে। একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করতে হবে। প্রয়োগ তালিকায় নতুন ও কার্যকর এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড যোগ করতে হবে। কীটনাশক যাতে কোনো ভেজাল না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কীটনাশকের ভুল প্রয়োগ/অতিপ্রয়োগ চলবে না। এতে মশারা প্রতিরোধী হয় বেশি। মনে রাখতে হবে, একই কীটনাশকের ব্যবহারে, মাত্রাতিরিক্ত/ভুল ডোজের ব্যবহারে মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে আরও সচেতন হতে হবে। এডিসসহ অন্যান্য মশা (কিউলেক্স, অ্যানোফিলিস ইত্যাদি) শনাক্তকরণের পাশাপাশি, টার্গেট ও নন-টার্গেটস প্রজাতির রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. মশা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা
সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকটা গবেষণানির্ভর হয়। ভেক্টর ম্যাপিং অর্থাৎ মশার স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রজননকেন্দ্র, পরিণত মশার উপস্থিতি/আধিক্য ইত্যাদি চিহ্নিত করতে হবে। কিছু বেসিক বিষয়ে গবেষণা যেমন মশারা সত্যিই কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে কিনা? কোন প্রজাতির মশা কোথায় কী পরিমাণ কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে? কীটনাশকের রিকমেন্ডেড ডোজ পরীক্ষাকরণ ইত্যাদি সব সময় পরিচালনা করতে হবে। বিভিন্ন টার্গেট এরিয়ায় মশা কী পরিমাণ কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে এবং এই প্রতিরোধের মাত্রা (রেজিস্ট্যান্স রেশিও) কেমন, তা গবেষণার মাধ্যমে জানতে হবে। কোন কীটনাশক (এডাল্টিসাইড/লার্ভিসাইড) কোন মশা/লার্ভাকে সফলভাবে দমন করতে পারে, তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট করে (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) পরে তা প্রয়োগ করতে হবে।
মশা দমনে গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণার বিষয় হচ্ছে মশার সারভিলেন্স। এডিসসহ অন্যান্য মশার (অ্যাডাল্ট এবং লার্ভা) সারভিলেন্স কার্যক্রম নিয়মিত (সারা বছর) পরিচালনা করতে হবে এবং তা মনিটরিং করতে হবে। অভি ট্র্যাপ (ডিম সংগ্রহের জন্য) ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির মশার উপস্থিতি জানা যেতে পারে। বিভিন্ন এরিয়ায় জমানো পানিতে লার্ভার উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হোস্ট-সিকিং মশা (মানুষ বা প্রাণীদের কামড়ায়) ও এগ-লেইং মশা (ডিম পাড়া মশা) ধরার জন্য বিভিন্ন ট্র্যাপ (মশা ধরার ফাঁদ) যেমন লাইট ট্র্যাপ, বিজি ট্র্যাপ, গ্রাভিড ট্র্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে কোন এরিয়ায় কী কী প্রজাতির মশা রয়েছে, এদের আধিক্য কেমন, এমনকি কোথাও জীবাণুবাহী মশা আছে কি না (ভাইরাস সারভিলেন্স) তাও জানা যাবে। জীবাণুবাহী মশা শনাক্তে আরবোভাইরাল টেস্ট করতে হবে। নিয়মিত সারভিলেন্স করে কোথায় কোন প্রজাতির মশা আছে, তা জেনে নির্দিষ্ট কীটনাশক (ডোজসহ) প্রয়োগের সুপারিশ করতে হবে। কীটনাশক (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) নির্বাচন করার আগে তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) করতে হবে।
৩. মশা দমনে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার
মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে কীটনাশকের (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) পাশাপাশি জৈবপ্রযুক্তিনির্ভর ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার (স্ত্রী মশার উর্বর ডিম উৎপাদন ব্যাহত করে) ব্যবহার কার্যকর হয়ে উঠছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে এর সফল কার্যক্রম চলছে। তা ছাড়া বর্তমানে মেল স্টেরাইল টেকনিক (মশাদের মেটিং হবে কিন্তু ডিম উৎপাদন হবে না) পদ্ধতির সফল ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার মশক প্রিডেটরস যেমন মশক মাছ (গাপ্পি, গ্যামবুসিয়া ইত্যাদি) ইত্যাদির বাণিজ্যিক ব্যবহার বিদেশে প্রচলিত আছে। আমাদের দেশেও এদের ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে (ল্যাব রিসার্চ করে) চালু করা যেতে পারে।
৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধির জোরালো পদক্ষেপ
এডিস একটি ঘরোয়া মশা। এরা বসতবাড়িতে বা এর আশপাশে বংশবিস্তার করতে ও উড়তে অভ্যস্ত। তাই ব্যক্তিগত প্রোটেকশন ও সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেককে এডিস মশা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখতে হবে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্র্তৃপক্ষের চেষ্টা জোরালো আছে বলা যায়। তা ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিজিট করে মশার প্রজাতি, মশার আক্রমণ, জীবন-চক্র, জীবাণু-রোগ সম্পর্কে অবিহিত করা যেতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সচেতনতা সপ্তাহ, ‘ওপেন ডে’ পালন করা যেতে পারে।
লেখক
কীটতত্ত্ববিদ ও সহযোগী অধ্যাপক পবিপ্রবি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট অগাস্টিনে ‘এনাসটাসিয়া মসকিটো কন্ট্রোল’-এ বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত
mamiah81@yahoo.com