বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। গতকাল রবিবার বিকেলে দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের জেনারেল রেজিস্ট্রার (জিআরও) বাবুল আকতারের কাছে এ অভিযোগপত্র জমা দেন। গতকাল সন্ধ্যায় বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অভিযোগপত্রে মিন্নিসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামির সংখ্যা ১৪ জন। এ মামলার ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে রিফাত ফরাজীকে। আর নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে করা হয়েছে ৭ নম্বর আসামি। যদিও মামলাটি দায়েরের সময় এজাহারে মিন্নি ছিলেন এক নম্বর সাক্ষী। এছাড়া কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় অভিযোগপত্রে মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন ও গভীর তদন্তের পর রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ৩০২/৩৪/২১২/১০৯/১১৪/১২০-বি (১) ধারায় এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এই মামলার ১ নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রের ব্যাপারে জানতে চাইলে রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর ও এর ওপরে) ১০ জন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) ১৪ জনসহ মোট ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক তালিকায় রিফাত ফরাজীকে ১ নম্বর আসামি ও মিন্নিকে ৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক তালিকায় রিশান ফরাজীকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।’
রিফাত হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) এম এ হান্নান জানান, পুলিশের ওই প্রতিবেদন তিনি হাতে পান বিকাল সাড়ে ৪টায়। বিচারক ততক্ষণে এজলাস থেকে নেমে যাওয়ায় প্রতিবেদনটি তার কাছে দাখিল করা যায়নি। আজ সোমবার সকালে আদালত বসলে প্রতিবেদনটি বিচারকের কাছে দাখিল করা হবে।
এদিকে রিফাত হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী মুজিবুল হক কিসলু সাংবাদিকদের বলেছেন, পুলিশ দুই খণ্ডে এই অভিযোগপত্র দিয়েছে। এক খণ্ডে মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য খণ্ডে আসামি ১৪ জন, তাদের সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। ১৪ জন নাবালক হওয়ায় তাদের বিচার হবে শিশু আদালতে। অন্যদের নিয়মিত আদালতে বিচার হবে।
অভিযুক্তদের নাম (প্রাপ্তবয়স্ক) : মো. রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩), আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২), মো. হাসান (১৯), মো. মুসা (২২), আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি (১৯), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), মো. সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সায়মুন (২১)।
শিশু অপরাধী : মো: রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজী (১৭), মো. রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার (১৫), মো. আবু আবদুল্লাহ্ ওরফে রায়হান (১৬), মো: ওলিউল্লাহ্ ওরফে অলি (১৬), জয় চন্দ্র সরকার ওরফে চন্দন (১৭), মো. নাইম (১৭), মো. তানভীর হোসেন (১৭), মো. নাজমুল হাসান (১৪), মো. রাকিবুল হাসান নিয়ামত (১৫), মো. সাইয়েদ মারুফ বিল্লাহ ওরফে মহিবুল্লাহ (১৭), মারুফ মল্লিক (১৭), প্রিন্স মোল্লা (১৫), রাতুল শিকদার জয় (১৬) ও মো. আরিয়ান হোসেন শ্রাবণ (১৬)।
গত ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে তার স্ত্রী মিন্নির সামনে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে সন্ত্রাসীরা। তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর ওই দিন বিকেলে মারা যান। পরদিন ২৭ জুন নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে গত ১৬ জুলাই মিন্নিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। গত ২৯ আগস্ট বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মিন্নিকে জামিন দেয়।
এদিকে মিন্নিকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গতকাল রোববার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আবেদন করা হয়। আজ সোমবার অবকাশকালীন চেম্বার বিচারপতির আদালতে এই আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।