পাঁচ মাসে পাঁচ হামলার চেষ্টা

আতঙ্কে পুলিশ, সারা দেশে সতর্ক থাকার বার্তা

গত পাঁচ মাসে রাজধানীর পাঁচ পয়েন্টে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পেতে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা। যার তিনটি বিস্ফোরণে পুলিশের কর্মকর্তাসহ অন্তত সাত সদস্য আহত হয়েছেন। অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় দুটি আইইডি। এসব হামলার পেছনে রয়েছে একই চক্র যাদের টার্গেট শুধুই পুলিশ। তবে হামলাকারী চক্রটি নিষিদ্ধ ঘোষিত কোন জঙ্গি সংগঠন না অন্য কোন গোষ্ঠী সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও বরাবরের মতো এবারও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে। গত শনিবার রাতে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে আইইডির বিস্ফোরণের পর আবারও বিভিন্ন রেঞ্জ ডিআইজি, কমিশনার ও ফিল্ড কমান্ডারদের নিরাপত্তা নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করতে বলা হয়েছে। গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার আগে থেকেই সারা দেশে পুলিশকে সতর্কাবস্থায় দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা ছিল। এ ঘটনার পর বিভিন্ন রেঞ্জ ডিআইজি, কমিশনার ও ফিল্ড কমান্ডারদের নিরাপত্তা নির্দেশনা যথাযথভাবে পালনের বিষয়টি আবারও বলা হয়েছে।’

পুলিশের ওপর হামলা মামলাগুলোর তদন্তে সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামানের নির্দেশে অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসিপ্রধান মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে আট সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, এ কমিটির সদস্য সচিব হলেন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম।

গতকাল ডিএমপি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘পুলিশকে টার্গেট করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে জঙ্গি হামলা, অগ্নি ও বোমা সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করেছি। এ কারণে একটি কুচক্রী মহল পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ ।’

ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগস্ট মাসে জঙ্গি হামলার তথ্য একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। সেই আলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশকে রাজধানীসহ সারা দেশে বিশেষ সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই আগস্ট মাসের শেষ দিনে শনিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় আবারও পুলিশকে টার্গেট করে আইইডির বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এ হামলায় পুলিশের এক কর্মকর্তাসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। এ নিয়ে গত পাঁচ মাসে পুলিশকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে পাঁচটি আইইডি বিস্ফোরণের চেষ্টা হয়। এর মধ্যে তিনটি আইইডির বিস্ফোরণে পুলিশের সাত সদস্য আহত হন। এছাড়া পল্টন ও খামারবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির কাছ থেকে আরও দুটি অবিস্ফোরিত আইইডি উদ্ধার করে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল টিম।

সায়েন্স ল্যাব, মালিবাগ ও গুলিস্তানে বিস্ফোরিত আইইডির বিভিন্ন আলামত এবং খামারবাড়ী ও পল্টনে উদ্ধার হওয়া দুটি অবিস্ফোরিত আইইডির কারিগরি দিক বিশ্লেষণ করেছে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল টিম। বিস্ফোরিত ও অবিস্ফোরিত বোমার বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের অতিরিক্ত উপকমিশনার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে পাঁচটি আইইডি একইরকম মনে হলেও এসবের গঠন ও উপাদানগত পার্থক্য রয়েছে। পল্টন ও খামারবাড়ী থেকে উদ্ধার অবিস্ফোরিত আইইডির সঙ্গে সর্বশেষ সায়েন্স ল্যাবরেটরি পুলিশ বক্সের সামনে বিস্ফোরিত আইইডির মিল রয়েছে। তবে এই তিনটি থেকে গুলিস্তান ও মালিবাগে বিস্ফোরিত আইইডির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, শনিবার রাতে সায়েন্স ল্যাবে পুলিশকে লক্ষ্য করে আইইডি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। এ হামলার ঘণ্টাখানেক পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জঙ্গি তৎপরতা নজরদারি প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্স জানায়, পুলিশের ওপর বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস। সায়েন্স ল্যাব পুলিশ বক্সের সামনে ওই হামলায় পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। তাদের একজন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের প্রটোকলের সদস্য।

এর আগে ২৯ এপ্রিল গুলিস্তান পুলিশ বক্সের সামনে বিস্ফোরণে তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ২৭ মে মালিবাগে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে আইইডি হামলায় ট্রাফিক বিভাগের এক নারী এএসআই ও রিকশাচালক আহত হন। ২৩ জুলাই মধ্যরাতে একই সময়ে পল্টন ও খামারবাড়ী পুলিশ বক্সের সামনে থেকে দুটি অবিস্ফোরিত আইইডি উদ্ধার করা হয়।

সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে হামলার হুমকি দিয়ে গত পাঁচ মাসে গুলিস্তান, মালিবাগ ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটালেও পল্টন ও খামারবাড়ী পুলিশ বক্সের সামনে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এসব আইইডিতে যেসব বিস্ফোরক পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে সেসব বিস্ফোরক পদার্থ খোলাবাজারেই পাওয়া যায়। সায়েন্স ল্যাবে বিস্ফোরিত আইইডিতে স্পিøন্টার হিসেবে বিয়ারিং বল ব্যবহার হয়েছে।

সব আইইডিই সময় নিয়ন্ত্রিত : সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ টিমের এক কর্মকর্তা জানান, গত পাঁচ মাসে পুলিশকে টার্গেট করে যেসব আইইডি ব্যবহার করা হয়েছে তার সবই ছিল সময় নিয়ন্ত্রিত। কোনোটিই ছুড়ে মারা হয়নি। প্রতিটি আইইডি ব্যাগ কিংবা প্যাকেটে ভরে সন্ধ্যার পর পথচারী বেশে পুলিশ বক্সের পাশে ও পুলিশের গাড়িতে রেখে গেছে তারা।

বিস্ফোরক পরীক্ষার ফল আসেনি এখনো : তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আইইডিগুলোতে কী ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে তা পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত একটি পরীক্ষার ফলও তারা হাতে পাননি।

জঙ্গিদের ব্যবহৃত বোমার সঙ্গে মিল নেই পাঁচ আইইডির : সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, অতীতে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী যে ধরনের বোমা বা আইইডির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, সেসব বোমা বা আইইডির সঙ্গে সম্প্রতি পুলিশকে টার্গেট করে ব্যবহৃত পাঁচটি আইইডির একটিরও মিল নেই। ধারণা করা হচ্ছে, এসব হামলার পেছনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন বা ভিন্ন কোনো গোষ্ঠী থাকতে পারে যারা পরিকল্পিতভাবে পুলিশকে টার্গেট করে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে হামলাকারীরা একই চক্রের মনে হলেও তদন্ত শেষে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। যেকোনো জঙ্গি সংগঠন কিংবা কোনো চক্র এর নেপথ্যে থাকতে পারে। সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত তদন্তকারী কর্মকর্তারা নব্য জেএমবিকে সন্দেহ করেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।