রাজধানীর বাংলামোটরে বাসের চাপায় গুরুতর আহত কৃষ্ণা রায় হাসপাতালের বিছানায় ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। গতকাল রবিবার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করে বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পায়ে আরও একাধিকবার অস্ত্রোপচার করা লাগবে। মাসলে পচন ধরেছে, যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইসিইউতে নেওয়া লাগতে পারে। এর আগে মঙ্গলবার দুর্ঘটনার দিনই বাঁ পায়ে প্রথম দফায় অস্ত্রোপচার করে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হয়। তখন থেকেই পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন কৃষ্ণা রায়।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার জন্য বর্তমান সময় সব থেকে ক্রিটিক্যাল। পায়ের ইনফেকশন থেকে কিডনি ও পেটে ইনফেকশন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. আবদুল গনি মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষ্ণা রায়ের পায়ে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। তার মাসলে পচন ধরেছে, যা উদ্বেগের বিষয়। এখান থেকে তার কিডনি ও লিভার আক্রান্ত হতে পারে। তিনি বর্তমানে সব থেকে ক্রিটিক্যাল সময় পার করছেন। যেকোনো সময় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া লাগতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষ্ণা রায়ের সুস্থতার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। তাকে সর্বোত্তম চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। টুকিটাকি কিছু জিনিস ছাড়া চিকিৎসার সব ব্যয় বহন করছে হাসপাতাল। আজও (রবিবার) ১০ জন প্রফেসর তার শরীরের অবস্থা দেখেছে। তাদের পরামর্শেই দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।’
এদিকে দুর্ঘটনার ৬ দিনেও বাসের চালক, চালকের সহকারী ও মালিককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি হাতিরঝিল থানার পুলিশ। আসামি ধরতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আসামি ধরতে পারলে আমাদেরই সুনাম।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই খায়রুল আলম বলেন, ‘আমরা কয়েকটি টিমে ভাগ হয়ে আসামিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছি। তবে তাদের অবস্থান এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আশা করছি দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’
গতকাল বেলা ১১টার দিকে পঙ্গু হাসপাতালের ২১৯ নম্বর মহিলা কেবিনে গিয়ে দেখা যায় ব্যথায় কাতরাচ্ছেন কৃষ্ণা রায়। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ। কেবিনের বাইরে স্বজনদের ভিড়। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন স্বজনরা। তার বেডের পাশেই বসা ছোট বোন শুকলা রায়ের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছে। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর থেকে ব্যথায় সারা রাত ঘুমাতে পারে না। পায়ে ড্রেসিং করার সময় ব্যথা সহ্য করতে পারে না। নিমেষেই সব শেষ হয়ে গেল, কী বলে সান্ত্বনা দেব দিদিকে?’
দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালকের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের চিকিৎসক দল কৃষ্ণার পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে দেখে। তখন পায়ের অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রথমে পায়ের হাঁটুর নিচে কাটা হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ওপরেও পচন ধরেছে। আমরা চেষ্টা করব যেন ইনফেকশন বেশি ছড়াতে না পারে। তবে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না। তার জীবন বাঁচানোয় আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি।’
দুপুর ১টার দিকে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকানো হয় কৃষ্ণা রায়কে। ৩টার দিকে অপারেশন শেষে অবজারভেশনে রাখা হয় তাকে। তার ভগ্নিপতি রবীন্দ্র কর্মকার বলেন, প্রথম দফায় তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার ঠিকমতো করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ জন্য দ্বিতীয় দফায় আবার পায়ের কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার দুপুরে বাংলামোটর ওভারব্রিজের নিচে ফুটপাতে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) হিসাবরক্ষণ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক কৃষ্ণা রায়কে চাপা দেয় ট্রাস্ট পরিবহনের একটি বাস। কৃষ্ণাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে পাঠানো হয় পঙ্গু হাসপাতালে। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় বাসের চালক, হেলপার ও মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন কৃষ্ণা রায়ের স্বামী রাধে দেব।