কৃষ্ণা রায়কে চাপা দেওয়া বাসচালক গ্রেপ্তার

রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তা কৃষ্ণা রায় চৌধুরীকে চাপা দেওয়া বাসের চালক মোরশেদকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬১ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন মোরশেদ। পুলিশের অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে তার সম্পর্কে নানা তথ্য।
পিবিআই জানিয়েছে, বাস চালানোর কোনো লাইসেন্সই ছিল না মোরশেদের। আগে কখনো বাস চালানোর অভিজ্ঞতাও নেই তার। ঈদুল আজহার পর গ্রাম থেকে ঢাকা এসে ঘটনার দিনই প্রথম বাস চালাতে ওঠেন। এর আগে মাঝারি যানবাহন চালাতেন তিনি। সেই লাইসেন্সটি অবশ্য তার আছে।
পিবিআই জানিয়েছে, তিন সদস্যের একটি টিম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করেছে। ওই টিমে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মো. জুয়েল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রবিবার খুব ভোরে সিভিলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে মোরশেদের বাসায় গেলে সে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তার বাথরুমের পাশে থাকা নারকেল গাছের মাথায় উঠে বসে থাকে। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে চলে আসার পর সে গাছ থেকে নেমে সোজা ঢাকায় চলে আসে। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর জনতার ধোলাই খেয়ে তার জামাকাপড় ছিঁড়ে যায়। এক রিকশাচালকের কাছ থেকে গামছা নিয়ে পরে কাফরুল থানাধীন ইব্রাহিমপুরে তার ভাড়া বাসায় যান। সেখান থেকে সরাসরি গ্রামে গিয়ে নিজ বাড়িতে না থেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকতে শুরু করে। মুঠোফোনের সিম পরিবর্তন করে ফেলে।’
অভিযানে থাকা পিবিআইর উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) আল আমিন শেখ বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে মধ্যম ক্যাটাগরির যানবাহন চালানোর লাইসেন্স ছিল ট্রাস্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের বাসচালক মোরশেদের। এই ক্যাটাগরির লাইসেন্সে সাত টনের নিচে যানবাহন চালানোর অনুমতি রয়েছে। এই লাইসেন্স দিয়ে সে প্রাইভেটকার চালাতে পারবে। ঈদের পর ঢাকা এসে ঘটনার দিনই প্রথম সে বাসে ওঠে। সে বাসটির বদলি চালক ছিল। প্রকৃত চালকের নাম মিলন। আমরা বাসের হেলপার ও মালিককে খুঁজছি।’  
তিনি বলেন, ‘বাসের ব্রেক কাজ করছিল না বলে মোরশেদ দাবি করেছে। সে জানিয়েছে হঠাৎ ব্রেক কাজ না করায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ওই সময় বাসের ডানে একটি প্রাইভেটকার ছিল এবং সামনে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। প্রাণহানি কমাতে বামে ফুটপাতে তুলে দেয় সে।’
পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. বশির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কৃষ্ণা রায় চৌধুরীকে বাস চাপা দেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হওয়ায় সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পিবিআই ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় একটি বিশেষ টিম কিশোরগঞ্জসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে গুপ্তচর ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামির অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে। তাকে থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়াধীন।
প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের পর গতকাল কৃষ্ণা রায়ের স্বামী রাধে দেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আর যেন এমন পরিণতি কারও না হয়। এ ধরনের একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। সারা জীবন পঙ্গু হয়ে থাকা মানুষটি অনেক সময় সমাজের বোঝা হয়ে পড়ে। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও সরকারের দৃষ্টিতে থাকা উচিত।’
প্রসঙ্গত, গত ২৭ আগস্ট দুপুরে বাংলামোটর ফুটওভার ব্রিজের নিচে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষ্ণা রায় চৌধুরী। এ সময় বেপরোয়া গতিতে আসা একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে যায়। এতে তার বাম পা পিষ্ট হয়ে গুরুতর জখম হয়। কৃষ্ণা রায়কে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার করে বাম পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলেন। গত রবিবার দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার করে তার পায়ের হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়।