দলের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুদিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানী ঢাকায় শোভাযাত্রা করেছে বিএনপি। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রার উদ্বোধনপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের খুন, গুম, মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে আটকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। আগামী দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে।
বিকেল ৩টার এই শোভাযাত্রা সামনে রেখে দুপুর ১২টা থেকেই নেতাকর্মীরা খ- খ- মিছিল নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো
হতে থাকে। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীদের ঢল নামে সেখানে। ফলে ফকিরাপুল মোড় থেকে কাকরাইল পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের সড়কে সৃষ্টি হয় যানজট। আগত নেতাকর্মীদের হাতে ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই লেখা সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন। এ ছাড়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করে নেতাকর্মীরা। শোভাযাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার ছবি সংবলিত টি-শার্ট পরা নেতাকর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিয়ে মুখরিত করে রাখে। ‘জেলের তালা ভাঙব, খালেদা জিয়াকে আনব’, ‘আমাদের মায়ের মুক্তি চাই’, ‘আমার নেত্রী আমার মা, জেলে থাকতে দেব না’ ইত্যাদি স্লোগান দেয় তারা। মহিলা দলের নেত্রীরা রংবেরঙের শাড়ি পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। শোভাযাত্রায় ছিল কয়েকটি ঘোড়ার গাড়িও। বিএনপির এ কর্মসূচির সার্বিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছিল সতর্ক কাকরাইল ও ফকিরাপুল এলাকায়। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় শোভাযাত্রা।
শোভাযাত্রাপূর্ব বক্তব্যে বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় ১৮ মাস ধরে আটকে রেখেছে সরকার। ২৬ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা দিয়েছে। তারা মনে করেছিল, পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম করে, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আটক করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে দমন করবে। কিন্তু আজকের এই র্যালি প্রমাণ করেছে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে তারা দমন করতে পারবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আজকে এই সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, ট্যাক্স বাড়িয়েছে। কিন্তু জনগণের কোনো সমস্যার সমাধান তারা করতে পারেনি। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে গোটা খাতটি ধ্বংস করে দিয়েছে। পত্রিকায় এসেছে তারা ২৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিয়েছে।
পরে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে নয়াপল্টন থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে বিজয়নগর, কাকরাইল, শান্তিনগর মোড় ঘুরে আবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় যোগ দেয় ঢাকা মহানগর বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, শ্রমিক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, কৃষক দল, মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
কার্যালয়ের সামনের অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি বক্তব্য দেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, মো. শাহজাহান, অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবে রহমান শামীম, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, আব্দুস সালাম আজাদ, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রমুখ।
উৎফুল্ল বিএনপি নেতারা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নেতাকর্মীদের এমন সরব উপস্থিতিতে উৎফুল্ল ছিলেন শীর্ষ নেতারা। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, এটা একটা জনসমুদ্র। দলের পক্ষ থেকে র্যালিতে আগত নেতাকর্মীদের শোডাউন ভিডিও করে রাখা হয়েছে। তারা বলেন, এটি যেন একটি মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পর একে অপরের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তারা নিজেরা গল্পগুজব করেছেন। সুখ-দুঃখের আলাপ করেছেন।
ভ্যানে মশারি টাঙিয়ে শোডাউন : ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা শোভাযাত্রায় কয়েকটি ভ্যানগাড়িতে মশারি টাঙিয়ে এনেছিল। এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার দুই মেয়র ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রতিবাদে ও জনগণকে সচেতন করতে তাদের এই উদ্যোগ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। এর অংশ হিসেবে গত রবিবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন সকালে শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতার কবর জিয়ারত করেন বিএনপি নেতারা। সেখানে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিকেলে রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বিএনপি।