ঈদুল ফিতরের সিনেমার পর ঈদুল আজহার আগ পর্যন্ত আড়াই মাসে হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ‘আব্বাস’ সিনেমাটি খানিকটা আলোচনায় ছিল। এরপর ঈদুল আজহায় ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ ও ‘বেপরোয়া’ সিনেমা দুটি চলছে আগস্টজুড়ে। গত মাসে নতুন আর কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। অথচ চলতি সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে পাঁচটি সিনেমা মুক্তির তালিকায় আছে। প্রযোজক সমিতির অফিস সেক্রেটারি সমেন্দ্র চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ‘আমার জন্মভূমি’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তির জন্য নিবন্ধন করা আছে, তবে তা চূড়ান্ত হয়নি। সেপ্টেম্বরজুড়ে আরও পাঁচটি সিনেমার মুক্তি মোটামুটি চূড়ান্ত। ১৩ সেপ্টেম্বর ‘মায়াবতী’ ও ‘অবতার’ নামে দুটি সিনেমা মুক্তি পাবে। ২০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাবে মারুফ ও লাক্স তারকা অরিন অভিনীত ‘গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ’। সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ মুক্তি পেতে যাওয়া দুটি সিনেমা হলো ‘পাগলামি’ ও ‘সাপলুডু’।
সারা বছর প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা-খরা থাকলেও একই মাসে পরপর এতগুলো সিনেমা মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্রের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে তাই জানিয়েছেন সিনেমাসংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
‘সাপলুডু’ সিনেমার পরিচালক গোলাম সোহরাব দোদুল বলেন, ‘একই দিনে সিনেমা মুক্তি পাওয়া নতুন কিছু নয়। তবে আমাদের দেশে উৎসব ছাড়া একই দিনে একাধিক সিনেমা মুক্তির ঘটনা খুব একটা ঘটে না। তাই হয়তো অনেকের কাছে বিষয়টি নতুন ঠেকছে। আমি মনে করি যত বেশি সিনেমা মুক্তি পাবে ততই হলমুখী হবে দর্শক। প্রথমে দুটি সিনেমাই দেখতে চাইবে দর্শক। পরে যে সিনেমাটি ভালো সেটির দিকেই বেশিরভাগ দর্শক ঝুঁকে পড়বে। ফলে আমার সিনেমার সঙ্গে একই দিনে আরও একটি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে বলে আমি কোনো সংশয় বোধ করছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাপলুডু নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। এর টিজার, ট্রেইলার প্রকাশের পর অনেক পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সিনেমা হল মালিকরাও চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে। তারা প্রথম সপ্তাহে দেশে ২৫টির বেশি সিনেমা হলে চলচ্চিত্রটি মুক্তি দিতে চাচ্ছে না। ধীরে ধীরে সারা দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি মুক্তি দিতে তারা আগ্রহী। আমার বিশ্বাস গল্প এবং তারকানির্ভর সিনেমাটি সবার ভালো লাগবে।’
একই দিনে একাধিক সিনেমা মুক্তি পাওয়া নিয়ে ‘সাপলুডু’ সিনেমার নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম দিলেন মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, ‘আসলে আমার সিনেমার সঙ্গে আরেকটি সিনেমা আসছে বলে আমি সেদিক থেকে কথা বলছি না। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সদস্য হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের দেশে এখন সিনেমা নির্মাণের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বছরে ৫২ সপ্তাহে মুক্তি দেওয়ার মতো ৫২টি সিনেমাও তৈরি হচ্ছে না। ফলে একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া উচিত, যাতে প্রতি সপ্তাহে দর্শক নতুন সিনেমা দেখতে পায়। এতে প্রযোজক বা সিনেমা-সংশ্লিষ্টদেরও ভালো হবে। কারণ একটি সিনেমা অন্তত এক সপ্তাহ নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যতই বলি না কেন, যে সিনেমাটি ভালো সেটিই দর্শক গ্রহণ করবে। কিন্তু একই সঙ্গে একাধিক সিনেমা মুক্তি পেলে একটু হলেও দর্শক ভাগ হয়ে যায়। এতে সিনেমার সামগ্রিক ব্যবসার ওপর একটু হলেও প্রভাব পড়ে।’
নিজের সিনেমা নিয়ে মিম বলেন, ‘আসছে ২৭ সেপ্টেম্বর সাপলুডু মুক্তি পাচ্ছে। আমার সিনেমা নিয়ে আমি অনেক বেশি আশাবাদী। কারণ এর পেছনে পুরো টিমের অনেক পরিশ্রম রয়েছে। আশা করছি আমার সিনেমাটি দর্শক গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে অন্য সিনেমাটির জন্যও শুভকামনা।’
পরিচালক জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘আমাদের এখানে সিনেমা মুক্তির কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই। একটি ভালো সিনেমা মুক্তির দিন এলে তার সঙ্গে কোথা থেকে এসে আরও দু-একটি সিনেমা জুড়ে দেওয়া হয়। এতে করে কোনো সিনেমারই ভালো ব্যবসা হয় না। অথচ বলিউডের মতো বড় ইন্ডাস্ট্রিতেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দেখা হয়। শুনেছি, সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বিগ বাজেটের বলিউড সিনেমা সাহোর জন্য আরও চারটি সিনেমার মুক্তি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুই সুপারস্টার সালমান খান ও অক্ষয় কুমার তাদের সিনেমা ঈদে মুক্তি দিতে গিয়ে যাতে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এজন্য একজন পিছিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের এখানে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছেই। এ থেকে বেরিয়ে না এলে যে দু-একটা সিনেমা ভালো হচ্ছে তাও আর হবে না!’
এদিকে অনেক দিন পর এক মাসেই এতগুলো সিনেমা মুক্তির বিষয়ে ‘সিনেমার সুদিন আসছে’ বলে মন্তব্য করেন প্রযোজক পরিবেশক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ প্রায় আট বছর পর সমিতির কমিটি গঠিত হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি। সিনেমা মুক্তির সময় প্রযোজকের বাড়তি খরচের চাপ অনেকটাই কমিয়ে এনেছি ইতিমধ্যে। আস্তে আস্তে প্রযোজকদের জন্য আরও সুযোগ সুবিধা তৈরি হবে। এক মাসে পাঁচটি মোটামুটি বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এটি সিনেমার জন্য ইতিবাচক। এখন আমাদের সিনেমা ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।’
মাহিয়া মাহি ও জে এইচ রুশো অভিনীত ‘অবতার’ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন মাহমুদুল হাসান শিকদার। ইয়াশ রোহান ও নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত ‘মায়াবতী’ পরিচালনা করেছেন অরুণ চৌধুরী। ‘গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ’ পরিচালনা করেছেন মুস্তাফিজুর রহমান বাবু। কমল সরকার পরিচালিত ‘পাগলামি’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন বাপ্পী চৌধুরী ও কলকাতার শ্রাবণী রায়। ‘সাপলুডু’তে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ ও বিদ্যা সিনহা মিম।