শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের উপায় খুঁজছে সরকার

সরকারের সাড়ে ১৩ লাখ পদের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন লাখই শূন্য। গুরুত্বপূর্ণ সব খাতই কোনো রকমে চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি থেকে শুরু করে খাদ্য, যোগাযোগ, ভূমি সব খাতই জনবল সংকটে ভুগছে। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার উপায় খুঁজছে সরকার।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের বিদ্যমান শূন্য পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণের জন্য আলাদা কমিশন গঠন করা যায় কি না, সে বিষয়ে বিদ্যমান বিধিবিধান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি ধারণাপত্র তৈরির জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে (সমন্বয় ও সংস্কার) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা এখনো সেই ধারণাপত্র হাতে পাইনি।’

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ১৫ মের সচিব সভায় ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। ওই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা তাদের জনবল সংকটের কথা তুলে ধরলে বিকল্প কমিশন গঠন করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়। এ বিষয়টি বিধিবিধানে থাকলেই এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

তিনি আরও বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডেই সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ। এমন অনেক পদ রয়েছে যেগুলোতে লিখিত পরীক্ষার দরকার হয় না। সেগুলোতে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমেই জনবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিধি। খোদ সংবিধানেই বলা আছে প্রয়োজনে একাধিক কমিশন গঠন করা যাবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো বেকারের দেশে তিন লাখ শূন্য পদ ভাবাই যায় না। সেই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে যেখানে এক কোটি মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। 

জানা গেছে, আলাদা কমিশন গঠনের এ উদ্যোগ নতুন নয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছিলেন, শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। প্রয়োজনে একাধিক কমিশন করার কথাও বলেছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার পর এ নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করেছেন জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা। শেষ পর্যন্ত কমিশন গঠন করা হয়নি। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাদের সেই প্রস্তাবও আলোর মুখ দেখেনি। মূলত আলাদা কমিশনের বিপক্ষে নীতিনির্ধারক আমলারাই। তারাই চান না আলাদা কমিশন গঠন করা হোক।

গত বছর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশেই বেশি। ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এ হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে। প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং পূর্বাভাস তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

আইএলও’র প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষা এখন আর কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। তরুণরা যত বেশি পড়ালেখা করছে, তাদের তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ; যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১৫ মের সচিব সভায় আলাদা কমিশন গঠন করা ছাড়াও মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পরিচালনা এবং দুর্যোগকালীন সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাছাড়া সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর চলাকালে ও বাজেট পেশের সময় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়।

তারা আরও জানিয়েছেন, সভায় প্রকল্প প্রণয়নে ব্যাংক সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টর নির্ধারণ করার বিষয়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশনার পাশাপাশি সরকারের ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে শেষ করতে নিবিড় তদারকি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাছাড়া দাপ্তরিক কাজে আরও গতিশীলতা আনতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থায় ই-নথি কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ ও কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোতে স্ব-উদ্যোগে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, একই সঙ্গে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থার মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ও চিহ্নিত ট্রানজিট পয়েন্টসহ বিদেশ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ট্রাভেল পাস ইস্যুর ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই-বাছাই করতে হবে। এ ছাড়া সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়। প্রকল্প প্রণয়নে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’, ‘তারুণ্যের শক্তি’ এবং ‘সুশাসন’ এ তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় চলমান প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়নে সচিবদের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পরবর্তী সচিব সভা করার জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলে তা জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।