আমরা বাংলাদেশিরা বিভাজিত হতে সম্ভবত অন্যসব জাতির তুলনায় একটু বেশিই ভালোবাসি। কথায় কথায় ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ বা ‘একতাই বল’Ñ প্রবাদ কচলালেও আমরা বোধ হয় একলাই চলো বা সুবিধার পথে চলো নীতিতেই বেশি আগ্রহী। আমরা দশচক্রে ভগবানকে ভূত বানাতেই বেশি পারদর্শী। আমাদের এই বিভাজিত জাতীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য রাজনীতিবিদরা তাদের পছন্দের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি প্রয়োগ করতে পারেন সহজেই। এখানে সব সময় তাদের দালাল কিনতে হয় না। দালালরাই বিক্রি হওয়ার জন্য ধরনা দিতে থাকে।
এই দেশে জাতে-পাতে বিভাজন, ধ্যানে-জ্ঞানে বিভাজন। পথে-মতেও বিভাজন। শত্রুর শত্রু যতই জঘন্য হোক, যতই ঘৃণ্য হোক, তাকে বুকে জড়াতে বাধে না আমাদের।
পৃথিবীর সব দেশেই পক্ষ-বিপক্ষ থাকে, আছে। বিভাজন আছে। কিন্তু সব বিষয়ে তারা কট্টরভাবে বিভাজিত নয়। কিছু সত্যকে তারা সবাই সত্য বলে মানেন। কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে তারা এক মেরুতে অবস্থান নেন। দেশের স্বার্থকেই সবার আগে স্থান দেন। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের চেয়েও তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে দেশ ও দেশের মানুষ। কিন্তু আমরা এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। একপক্ষ যদি বলে কালকে বৃষ্টি আসবে, আরেক পক্ষ নির্ঘাত বলে দেবে আসবে না। যদি আসেই তবে সেটা প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র।
আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পঞ্চাশ বছর পার করতে চলেছি। এখনো তা নিয়ে চলছে পক্ষ-বিপক্ষ খেলা। এই পক্ষ-বিপক্ষ হিসেবের সবই যে অমূলক, তা নয়। কিন্তু এটা তো সত্য, এই ইস্যুটার সমাধান না করে জিইয়ে রাখা হয়েছে। এই বিভাজন রেখা মিলিয়ে গেলে যে অনেকের রাজনীতি থাকে না! আমরা স্বাধীনতার নামে, দলের নামে, নেতার নামে, ধর্মের নামে, কে কোন দেশের অনুগত তার নামে, এমনকি কত নামে যে বিভক্ত তার ইয়ত্তা নেই।
বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের কথাই ধরা যাক। এ রোহিঙ্গারা যে আমাদের জন্য গোদের উপর বিষফোঁড়া, এটা সবাই জানি। মানিও। কিন্তু তাদের যে মিয়ানমারে পাঠাতে হবে, সে বিষয়ে একটা ন্যূনতম সহাবস্থান তৈরি হলো না বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। এ ক্ষেত্রে কে হবে ভারতপন্থি আর কে হবে চীনপন্থি তার প্রতিযোগিতাও লক্ষ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশপন্থি হওয়ার প্রতিযোগিতাটা খুবই ক্ষীণ।
আমাদের সীমান্ত হত্যা, তিস্তাসহ অমীমাংসিত নদীর পানির হিস্যা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় চুক্তি নিয়েও প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আলোচনা করে দেশের স্বার্থরক্ষায় একমত হতে দেখা যায় না। জঙ্গিবাদ নিয়েও চলে কত ধরনের রাজনীতি! কত ধরনের কার্ড চালাচালি হয় জঙ্গিবাদ নিয়ে। অথচ সমস্যাটা দেশের সবার। এটাকে কেউ অতিরঞ্জিত করেন। আবার কেউ করেন বেমালুম অস্বীকার।
আমাদের জাতীয় নেতাদের শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রেও আছে বিভাজন। আছে হীনমন্যতা। সেখানে নিজের আদর্শিক নেতাকে বড় করার এবং শ্রদ্ধা দেখানোর চেয়েও মুখ্য হয়ে ওঠে অন্যপক্ষের নেতাকে ছোট করার, অসম্মান করার প্রবণতা। আমরা ভুলে যাই, আমার নেতার মিশন, ভিশন অর্জন তুলে ধরলে মানুষই নির্ধারণ করবেন তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন, কত বড় নেতা ছিলেন, কত বড় গণতন্ত্রী ছিলেন, কতটা দেশপ্রেমিক ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায় তারা পাঁচ মিনিট বক্তৃতা দিলে তার মধ্যে চার মিনিট থাকে প্রতিপক্ষ দল ও নেতার বিরুদ্ধে কুৎসা। এভাবে যারা প্রতিপক্ষের আদর্শিক বা শীর্ষ নেতাকে গালি দেন, তারা প্রকারান্তরে নিজ আদর্শিক নেতাকেই গালি দিলেন।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে এ বিভাজন ও বিদ্বেষ পুরনো। বিভিন্ন ‘জীবী’র মধ্যেও এ বিভাজন আগে থেকেই ছিল। এখন তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের মধ্যেও বিভাজন ব্যাপকতা পেয়েছে। আগে বিভাজন থাকলেও দেশের ক্রাইসিসের সময় কিছু মানুষ অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে পারতেন। দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারতেন সংকট নিরসনে। কিন্তু ১৯৯৬-পরবর্তী বাংলাদেশে আস্তে আস্তে বহুপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সে অভিভাবক শ্রেণিটা ছোট হতে হতে প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এখন আর এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না, যাকে সব পক্ষ কিছুটা নিরপেক্ষ মনে করে, শ্রদ্ধা করে ও মান্য করে।
কিছুদিন আগে দেশবরেণ্য একজন প্রবীণ অধ্যাপক একটি টিভি টকশোতে প্রস্তাব করলেন, একটি কমিশন গঠন করতে। এই কমিশন বিভিন্ন দেশে এমপি-মন্ত্রীরা কী সুবিধা পান, তার আলোকে বাংলাদেশের এমপি-মন্ত্রীদের জন্য একটা নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। তাকে অনুরোধ করলাম, এই কমিশনের আগে তিনি যাতে আরেকটি কমিশনের জন্য প্রস্তাব করেন। এমপি-মন্ত্রীদের সুবিধা দেওয়ার আগে এমন একটি কমিশন বা পদ্ধতির প্রস্তাব তিনি যেন করেন, যাতে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন। আগে প্রাইমারি কমিশনটা হোক। জনগণের ভোটে সত্যিকার প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসুক। তারপর হোক সেকেন্ডারি কমিশন, যারা নির্ধারণ করুন সেই জনপ্রতিনিধিদেন জন্য প্রাপ্য সুবিধার ফিরিস্তি। স্যার আর হাঁটলেন না ওই পথে। এমনকি ওই অনুষ্ঠানে সহ-আলোচক হিসেবে থাকা একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকও এ বিষয়ে আর মুখ খুললেন না। কিন্তু এ দুজন মানুষই একসময় ভোটের অধিকারের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেছেন, কাজ করেছেন। এভাবেই আমাদের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সুশীলসমাজসহ আমরা এতটাই পার্টিজান হয়ে গেছি যেকোনো বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার আগে আমরা ভেবে নিই এটা আমাদের সমর্থিত দলের স্বার্থপরিপন্থী কিনা। এই বিভাজনের আওতায় কে নেই?
এ দেশে এখন জঘন্য সব অপরাধের প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও সবাই থাকে ভীষণ সতর্ক। আগে ঠিক করে নিতে হয় এ বিষয়ে তার কী অবস্থান নেওয়া উচিত। সে ঔচিত্যের পেছনে থাকে রাজনৈতিক অবস্থান এবং ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব। একসময় এ দেশে কবি-সাহিত্যিকদের কলমেও প্রতিবাদের ঝড় উঠত। কবিতায়, গানে গানে ছড়িয়ে পড়ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। কিন্তু এখন আর সেসবের বালাই নেই। কেন নেই? আমাদের সমাজে-রাষ্ট্রে কি অনাচার, অবিচার, অধিকার হরণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের অবৈধ ও অনৈতিক ব্যবহার, লুণ্ঠন নেই? তা কি কমেছে বা উঠে গেছে? আমাদের মানবাধিকার কি এখন সুরক্ষিত? তাহলে কবির কলমে কেন আগুন ঝরে না! শিল্পীর গলায় কেন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে না? এখানেও রাজনৈতিক আনুগত্য। এখানেও সুবিধাবাদিতার জয়। ক্ষেত্রবিশেষে ভয়।
এই দেশের পুলিশ-প্রশাসন কি দেশের? জনগণের? নাকি দলের? এই প্রশ্নটাও দিনে দিনে বড় হচ্ছে। শুধু সরকারি চাকরি করেন বলে সরকারের হুকুম মানতে হয়, এই কথা এখন আর ধোপে টিকে না। বরং রাজনৈতিক আনুগত্য ও অনৈতিক লাভের প্রত্যাশায় প্রশাসনের বড় একটা অংশ দলের সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছেন বলেই তাদের আচরণে, কাজে প্রতীয়মান হয়। অনেক সময় তারা দলের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে জনগণের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন এমন নজিরও আছে। রাষ্ট্র পরিচালকরা সক্ষম হয়েছেন এই বিভাজন তৈরি করে প্রশাসনকে তাদের অনৈতিক কাজের অংশীদার করতে।
দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও মানুষের আস্থার সংকট প্রকট। সেখানেও রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ্য। দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে, মানুষের ভোটের অধিকার হরণের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে কী ভূমিকা নিয়েছে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কী পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও মানুষের আস্থার সংকট প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। তারাও যে সরকারের এজেন্ডার বাইরে যায় না, সে অভিযোগও বিস্তর। এর মূল কারণও এই প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পার্টিজান আচরণ ও ভূমিকা। দেশের মানুষকে এভাবে নানা ইস্যুতে বিভক্ত করে যারা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, তারা হয়তো লাভবান হন। তাদের ক্ষমতা, পদ, পদবি, অর্থবিত্ত জোটে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষ।
একটা জাতি এতটা বিভাজন নিয়ে, পারস্পরিক এত ঘৃণা-বিদ্বেষ নিয়ে বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারে না। আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে এবং দেশের স্বার্থ অক্ষুণœ রাখতে এই বিভাজনের রাজনীতিকে কবর দিয়ে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।
লেখক : চিকিৎসক ও কলামনিস্ট