পোশাক যেন ক্যানভাস আফসানার কাছে। মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্প বুনেন পোশাকের জমিনে। গল্পগুলো সাধারণ মানুষের। সবুজ-শ্যামল বাংলার রূপ যেন সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে আফসানার ডিজাইনে। ফ্যাশনেবল মানেই যে পোশাকে পশ্চিমা ডিজাইন, আরবান ডিজাইন, ইংরেজি লেখা— সেই গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে এসেছেন আফসানা। নিজের মতো করেই প্রতিনিয়ত নানা ডিজাইন করে চলেছেন। যার কাজের মধ্যে রয়েছে দেশের মাটি আর মানুষ।
খাদি কাপড়ের ওপরেই পটচিত্র আর খাদির ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন তিনি। আবার একই সঙ্গে খাদিতে এনেছেন আধুনিক ডিজাইনের প্রতিচ্ছবি। স্টাইলিশ পোশাকে খাদির ব্যবহারের কথা হয়তো কেউই কখনো ভাবেননি। তবে তা নিয়ে ভেবেছেন আফসানা ফেরদৌসি। আধুনিক পোশাকে করেও দেখিয়েছেন।
মেয়েদের জন্য খাদির সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, টপস আর ছেলেদের জন্য খাদির পাঞ্জাবি ও শার্ট, যা গরমে আপনাকে দেবে স্বস্তি। আর ফ্যাশনের বেলায় দশে দশ তো থাকছেই।
এবার আসা যাক পোশাকে ছড়ার ব্যবহার নিয়ে। আফসানার ডিজাইন করা ছড়াওয়ালা এই পোশাকগুলো আপনাকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি কিন্তু সেই ফেলে আসা শৈশব। মায়ের কাছ থেকে প্রথম শেখা সেই ছড়াগুলো যদি বড় হয়েও পোশাকের মাধ্যমে গায়ে জড়িয়ে রাখতে পারেন, তাহলে কার না ভালো লাগে। সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে সেই ভালোবাসা তুলে ধরেছেন।
‘ওই দেখা যায় তালগাছ’, ‘আতা গাছে তোতা পাখি’— এগুলোর মতো প্রিয় সেই ছড়াগুলো যদি হালের সালোয়ার-কামিজ কিংবা হালের কুর্তা, টপসে পাওয়া যায়, তাহলে ছেলেবেলায় কে না ফিরে যাবে?
শুধু শৈশব ফিরে পাওয়া? পোশাকে প্রতিবাদ আর সচেতনতার বক্তব্যও তুলে ধরেছেন এই ডিজাইনার। সিল্কের কাপড়ে নকশিকাঁথা ডিজাইন ছিল। আর নকশিকাঁথার মাধ্যমেই বিভিন্ন সমাজের সমস্যা যেমন ধর্ষণ, কটূক্তি, পশু-পাখিকে না মারা, নিজের ভাষাকে ভালোবাসা, ড্রাগ না নেওয়ার মতো ঘটনাগুলোকে গল্প এবং কথার মাধ্যমে পোশাকে তুলে ধরেন।
ফেলে দেওয়া টি-শার্ট দিয়েও দারুণ এক গল্প তুলে ধরেছেন এই ডিজাইনার। ফেলে দেওয়া টি-শার্টকে নতুন একটি রূপ দিয়েছেন ইন্ডিগো এবং শিবুরির মাধ্যমে। প্রতিটি টি-শার্টের গায়ে ছিল প্রতিবাদের ভাষা। কীভাবে আমরা আমাদের প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারি, আপ সাইক্লিং, রিসাইক্লিং, প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট কম করার মতো বিভিন্ন গল্প ছিল।
শুধুই কি পোশাক! ডিজাইন করেছেন তিনি নকশিকাঁথাতেও। ছোটবেলার বিভিন্ন কবিতা, ছড়া থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কালেকশন করেছেন, পুরোটাই ফুটিয়ে তুলেছেন নকশিকাঁথা মাধ্যমে।
এক্সেসরিজও রয়েছে তার নতুনত্বের ছোঁয়া। আফসানা ফেরদৌসির কানের দুলগুলো আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে ছোটবেলার পুতুল খেলার দিনগুলোতে। কাপড়ের তৈরি পুতুলগুলো আপনার আউটলুকে এনে দেবে বৈচিত্র্য। ভিন্নধর্মী এই ফ্যাশন ডিজাইনার তার কাজ দিয়ে নজর কেড়েছেন দেশ-বিদেশে। অল্প বয়সেই পেয়ে গেছেন সাফল্যের দেখা। যদিও তার ছোটবেলা শখ ছিল স্থপতি হওয়ার। আর্কিটেক্ট থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে আসার পথটা ছিল অনেকটা গল্পের মতো। ছোটবেলায় তিনি কখনো ভাবেননি ফ্যাশন ডিজাইনার হবেন । বড়সড় আর্টের কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবেন। এইচএসসির পর ভর্তি হলেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে। ইউনিভার্সিটির শুরুর দিকে তেমন ভালো ডিজাইন করতে পারতেন না। তবে বই পড়ার অভ্যাস ছিল। বই পড়ার কারণে ভার্সিটির লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়া করতেন। প্রথম সেমিস্টার শুরুর কয়েক মাস পর লাইব্রেরিতে বেশ সময় দেওয়া শুরু করলেন। ফ্যাশন-সংক্রান্ত বইপত্র আর ম্যাগাজিনগুলো পড়তেন তখন। আর এভাবেই মনের ভেতর ফ্যাশনের প্রতি ভালোবাসাটা ঢুকে যায়। তিনি বলেন, 'আমাদের অনেকের ভেতরেই অনেক প্রতিভা কাজ করে কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে আমরা বুঝে উঠতে পারি না অনেক সময়। ডেসটিনি আমাদের নিয়ে আসে ওই জায়গায়। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক সে রকমই হয়েছে।'
কিন্তু তার এই ভিন্ন আঙ্গিকের কাজের ভুবন নিয়ে আফসানা কী ভাবেন? উত্তরে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করি কি না জানি না, তবে আমি চেষ্টা করি আমার মতো করে কাজ করতে। আমার ভেতরের ইচ্ছা, ভেতরের চিন্তাটাকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করি পোশাকের মাধ্যমে। তথাকথিত অন্য কারোর ট্রেন্ড অনুসরণ করতে পছন্দ করেন না আফসানা। তিনি নিজেই ট্রেন্ড নির্ধারণ করতে ভালোবাসেন । তার মতে, একজন প্রকৃত ডিজাইনার যখন তার মনের ভেতরের সমসাময়িক চিন্তাগুলো সামনে নিয়ে আসে, সেটাই তখন ট্রেন্ড হয়ে যায়। তার কাছে ফ্যাশন অনেকটা প্রতিবাদের ভাষারও মতো। তিনি চান একজন মানুষ যখন তার নকশা করা পোশাক পরবে, তখন যেন সে একটা বিষয়কে বহন করতে পারে। তিনি তার ডিজাইনে প্রকৃতি রক্ষা, পশু-পাখি রক্ষা— এসবের ছোট ছোট বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেন। ছোট ছোট গল্প তুলে ধরতে চেষ্টা করেন, যেন মানুষ সচেতন হয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'একজন শিল্পীর দায়িত্ব অনেক বেশি। তারই সেই ক্ষমতা আছে, যে কি না তার সৃজনশীলতার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মানুষের সচেতন করে তুলতে পারে।'
আফসানার কাজগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। এখন প্রায়ই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এক্সিবিশনে ডাক পড়ে তার। আফসানার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে অন্যতম কাজ হলো লন্ডনে একটি এক্সিবিশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে তিনি সোয়েটারের ওপর কাজ করেছিলেন। পুরো সোয়েটারের ডিজাইনটা বাংলাদেশের জামদানি থেকে নেওয়া । বাংলাদেশি প্রথম কেউ সোয়েটার নিয়ে এভাবে কাজ করেছিলেন।
আফসানার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো আপ সাইক্লিং, যেটি বার্লিনে প্রদর্শিত হয়েছিল। পরিত্যক্ত টি-শার্টগুলোকে নতুন একটি রূপদান করেছিলেন তিনি। এই টি-শার্টগুলোই দেখানো হয়েছিল প্রদর্শনীতে।
আফসানা তার কাজগুলোতে সব সময় চেষ্টা করেন দেশীয় মোটিফগুলোকে ব্যবহার করার। শীতলপাটি থেকে শুরু করে জামদানি মোটিফ, আর্কিটেকচারাল স্থাপত্য কিংবা গল্প, কবিতা সবই তুলে ধরেন পোশাকে। আর নকশাগুলোকে তিনি বিভিন্নভাবে কাপড়ে তুলে ধরেন। কখনো প্রিন্ট আবার কখনো এমব্রয়ডারি করে। এ ছাড়া নকশিকাঁথা কিংবা টেকনিক জ্যাকার্ড আবার কখনো হ্যান্ড পেইন্টিং।
তবে নকশা যেমনই হোক ফ্যাশন যেন পরিবেশবান্ধব হয়, সেটি সব সময় মাথায় রাখেন। পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন নিয়ে কাজ করার আইডিয়া পান তিনি ২০১১ সালে। তখন তিনি একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন, যার থিম ছিল পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে তিনি অনেক রিসার্চ করা শুরু করলেন। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে তিনি পরিবেশবান্ধব জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া শুরু করলেন।
পরিবেশবান্ধব ফ্যাশন নিয়ে তার কাজগুলো বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে। যে কারণে তিনি গত বছর লন্ডনে স্পিকার হিসেবে ডাক পেয়েছিলেন টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কনফারেন্সে। যেখানে তিনি পরিবেশবান্ধব পণ্যগুলো নিয়ে কথা বলেছিলেন। তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশবিষয়ক অবস্থা নিয়ে।
দখলে-দূষণের কারণে আমরা কীভাবে আমাদের নদীগুলোকে হারাচ্ছি, সে বিষয়ে তিনি সেখানে কথা বলেছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশগুলোর প্রতিনিধিরা আফসানার কথা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন, তাদের পোশাক জোগান দিতে গিয়ে আমরা আমাদের প্রকৃতিকে কীভাবে প্রতিনিয়ত নষ্ট করছি।
এই কনফারেন্সের পর তিনি অনেক আত্মবিশ্বাস অনুভব করেন। নিজের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা আরও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। ভবিষ্যতেও নিজের কাজগুলোতে সময়ের সঙ্গে দেশের সংস্কৃতিগুলোকেও টিকিয়ে রাখবেন। আর পরিবেশবান্ধব কাজ তো থাকবেই।
তিনি অন্য ডিজাইনারদেরও পরিবেশবান্ধবভাবে কাজ করার প্রতি আহ্বান জানান। এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা এখন যে গ্লোবালাইজেশনে আছি, সেখানে আমরা সবাই যদি পরিবেশবান্ধব কাজ করি, তবে আমাদের এই পোশাক ইন্ডাস্ট্রি দ্বারা পরিবেশ কম দূষিত হবে।'
তবে বর্তমানে প্রতিযোগিতার এই বাজারে বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকার জন্য আমাদের দেশীয় ডিজাইনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কথাটি যে একদমই মিথ্যা, তেমনটা মনে করেন না আফসানা। সময়ের সঙ্গে তো সবকিছুই বদলায়। ফ্যাশনেরও বদল ঠিক তেমনই। তিনি বলেন, 'কোনটা বদলে যাচ্ছে আর কোনটা হারিয়ে যাচ্ছে, এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আমাদের বুঝতে হবে।'
ডিজাইনের মান অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। এর পেছনে কারণ হচ্ছে ক্রেতাদের চাহিদা অনেক বেশি এবং তারা অনেক কম মূল্যে পণ্য পেতে চান। তিনি আরও বলেন, বিদেশি কাপড়ের সস্তা দামের কারণে আমাদের তৈরি হাতের কাজের জিনিসগুলো যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি তার মান কমে যাচ্ছে। আমরা বর্তমানে যে যুগে আছি, সেখানে সবকিছু বদলাচ্ছে চোখের পলকে। তবে তিনি মনে করেন, দেশীয় ঐতিহ্যকে ঠিক রেখেও চলতি ট্রেন্ডের সঙ্গে মিলিয়ে চলা যায়। আমাদের পোশাকেও মডার্ন ভাব দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, 'আমার কালেকশনে সব সময় আমাদের দেশীয় মোটিফ যেমন রাখি, তেমনি আমাদের হাতের কাজগুলোও ব্যবহার করি। আবার পোশাকের গঠনের ক্ষেত্রে আধুনিক শেইপ দিই। ফেব্রিকসের বেলায় নিজেদের তৈরি কাপড় ব্যবহার করার চেষ্টা করি। এতে যা হয় আমার দেশীয় ঐতিহ্য, আমার দেশীয় ম্যাটেরিয়াল যেমন ব্যবহার হচ্ছে, ঠিক পাশাপাশি পোশাকে আধুনিক একটা লুকও থাকছে।'
দেশীয় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ডিজাইনার ও ক্রেতা দুজনেরই সমান দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ক্রেতা ও ডিজাইনারদের দায়িত্বের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমাদের ক্রেতাদেরও ইচ্ছা থাকতে হবে দেশীয় জিনিস ব্যবহার করার, আবার আমাদের ডিজাইনারদেরও এমনভাবে কাজ করতে হবে, যেন আমরা দেশীয় মোটিফের সমন্বয় করে মডার্ন ভাবও পোশাকে রাখতে পারি এবং ক্রেতাদের চাহিদাও মেটাতে পারি।”