বড় বিচিত্র এবং বিব্রতকর অবস্থায় এখন দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ দল। লড়াইটা ১৯ বছরের অভিজ্ঞ এক দলের সঙ্গে মাত্র ২ ছুঁই ছুঁইয়ের নবীন দলের বিপক্ষে। এক পাল্লায় এ নিয়ে ১১৫ টেস্ট। অন্য পাল্লায় মাত্র ৩। কিন্তু প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিন শেষেও আফগানিস্তানের পাল্লা ভারী। ৫ দিনের মর্যাদার টেস্টের প্রথম চার সেশনের প্রায় পুরোটা জিতেছে অতিথি ব্যাটসম্যানরা। বাকি দুই সেশনে তাদেরই স্পিনারদের রাজত্ব। একের পর এক পাঞ্চে নিদারুণ আহত স্বাগতিকরা হোম অ্যাডভান্টেজ হারিয়ে বিপর্যন্ত খুব। সামনে আরও ভয়ংকর সময় ও পরিস্থিতি বুঝি ওঁৎ পেতে। এ লড়াই কীভাবে জিতবে বাংলাদেশ?
উইকেট হয়েছে বোলারদের জন্য বুমেরাং। প্রায় সব ব্যাটসম্যান প্রয়োগের অভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। নবীন সাদমান ইসলাম (০) থেকে অভিজ্ঞ মুমিনুল হক (৫২), ড্যাশিং সৌম্য সরকার (১৭), লিটন দাস (৩৩) থেকে বহু ঝড় সামলানো মাহমুদউল্লাহ (৭) কিংবা ক্যাপ্টেন সাকিব আল হাসান (১১) নিজে দায়িত্ব নিতে পারেননি কেউ। দুই দিন না যেতেই অকল্পনীয় এক জয়ের হাতছানি দেখে আরও বিপুল উৎসাহে ঝাঁপানোর প্রেরণা পেয়ে গেছে আফগানিস্তান। প্রথম ইনিংসে রহমত শাহ, আসগার আফগান, রাশিদ খানের দারুণ ব্যাটিং জাগিয়ে তুলেছে দলকে। আর তিন লেগ স্পিনার ও এক স্পিনারের অ্যাটাক স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে চতুর্থ ইনিংসে ভয়াবহ পরীক্ষায় ফেলতে এখনই তৈরি।
চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশ পিছিয়ে ১৪৮ রানে। হাতে ২ উইকেট। নবম জুটিতে মোসাদ্দেক হোসেন আর তাইজুল ইসলাম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা না দেখাতে পারলে কী যে হতো! নবম উইকেটে ৪৮ রানের মহা মূল্যবান অবিচ্ছিন্ন জুটি তাদের। ২০১৮ সালের জানুয়ারির পর এই আবার টেস্টে সুযোগ পেয়ে কঠিন পরিস্থিতির অনেকটা জয় করেছেন মোসাদ্দেক। ৮ নম্বর ব্যাটসম্যান ৪৪ রানে অপরাজিত। খেলেছেন ৭৪ বল। কীর্তি আরও বড় বোলার তাইজুল ইসলামের। শেষ এক ঘণ্টারও বেশি মোসাদ্দেককে শুধু সঙ্গ দেননি, ৫৫ বল খেলেছেন। দলকে দিয়েছেন ১৪ রান। যার একেকটি রান বাংলাদেশের জন্য এখন হীরার মতো দামি।
সাকিবের আক্ষেপ, আহা! তারাও যদি পারতেন! ব্যাটসম্যানদের মধ্যে প্রয়োগের অভাব দেখেছেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে দিনের শেষে ভাবছেন, মোসাদ্দেক-তাইজুলরা পারলে বাকি সময়ে আরও অনেক কিছু হতে পারে। ক্রিকেটে কত কিছুই না হয়! গৌরবময় মহান অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট। এই আপ্তবাক্যকে বুকে ধরে দলের কাছ থেকে একাধারে ভিন্ন পর্যায়ের পারফরম্যান্স ও ম্যাজিকের প্রত্যাশা তার। প্রত্যাশা নিজের কাছেও।
আফগান রহমত শাহ আগের দিন সেঞ্চুরি করেছেন। এদিন তাদের দল ৫ উইকেটে ২৭১ নিয়ে শুরু করল। আর ১০ রান করে ৯২-এ আউট হয়ে দেশের মাত্র দ্বিতীয় সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হলো অভিজ্ঞ আসগার আফগানের। তাইজুল এতটাই নিষ্ঠুর। এরপর আফসার খানও (৪১) ওই বাঁহাতি স্পিনারের শিকার। সাকিব ১০৭ ওভারে সময় বল হাতে নিতেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কাঁচকলা দেখিয়ে মাঠে ঢুকে স্যালুটের পর হাঁটু গেড়ে এক ভক্ত সাকিবকে ফুল নিবেদন করেন। এমনিতে মুড ঠিক রাখার মতো কিছু হচ্ছে না। তারপর এই কাণ্ড!
থতমত অবস্থা কাটিয়ে পরের ওভারে ম্যাচে নিজের প্রথম উইকেট নেন অধিনায়ক। তবে টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দিতে নেমেই নিজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য মেলে ধরেন রাশিদ খান। বাংলাদেশ এমন ফ্ল্যাট উইকেট চায়নি, সাকিবের দাবি। যেখানে তাদের মতো ফিঙ্গার স্পিনারদের জন্য কিছু ছিল না শুরুতে। অথচ ‘স্পিন কোয়াট্রেট’-এর দল। মিরাজ-নাঈমরা মাথা খুটেছেন। রাশিদ ৫১ রান করে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়েছেন। ১১৭ ওভারে ততক্ষণে তারা পেয়েছেন দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। তাইজুলের ৪, নাঈম-সাকিবের ২টি করে এবং বাকি তিনের তিন উইকেট বড় পরিশ্রমসাধ্য।
অথচ আফগানরা মাঠে নামতেই স্পিনারদের নাভিশ্বাস তোলা উইকেট ভোজভাজির মতো পাল্টে গেল! অবশ্য সাদমান প্রথম ওভারে সস্তায় নিজেকে বিলিয়েছেন ম্যাচের একমাত্র পেসার ইয়ামিনের কাছে। একপ্রান্ত থেকে টানা বল করেছেন এই ম্যাচের পর আর টেস্ট না খেলার ঘোষণা এদিনই দেওয়া অফস্পিনার মোহাম্মদ নবী। টাইট বোলিংয়ে আটকে রাখছিলেন নিজের প্রান্ত। সৌম্যকে কখনো স্বচ্ছন্দ লাগেনি। নবীর কাছে এলবিডব্লিউর শিকার তিনি। লিটন নিজের মতো করে ৬৫ বল খেলে তখন সেট। কিন্তু রাশিদকে আড়াআড়ি খেলতে গিয়ে বোল্ড! জায়গা বের করার সুযোগই ছিল না। আত্মাহুতি। অথচ স্পিনে ভালো বলে তিনে প্রমোশন পেয়েছিলেন।
৫৪ রানে ৩ উইকেট হারালেও এই মাঠে ৬ সেঞ্চুরি হাঁকানো মুমিনুল আশা দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য ব্যাট করে আসা সাকিব তখন সঙ্গী। কিন্তু এই জুটিও ৩৪ রানে গিয়ে কাটা পড়ে। প্রতিপক্ষ অধিনায়ক রাশিদের বলে এলবিডব্লিউর শিকার বাংলাদেশ নেতা সাকিব। বিপদ ঘনিয়ে আসে এক বল পরই রাশিদের বলে একই আউটের শিকারে মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিক ডাক নিয়ে ফিরলে।
মাহমুদউল্লাহ এমন পরিস্থিতি সামলাতে জানেন। এবার হলো না। বোল্ড। মুমিনুল অযথা শটে উইকেট বিলান। ১৩০ রানে ৭ উইকেট। ফলো অন এড়াতে তখনো ১৩ রান চাই। দিনের বাকি এক ঘণ্টা দশ মিনিটের মতো সময় শেষ ব্যাটসম্যান মোসাদ্দেক বুক চিতিয়ে লড়লেন। বীরত্বের গল্প তাইজুলেরও।
কিন্তু ইনিংসের শেষটায় বাংলাদেশ। ক্রিকেটীয় হিসাব-নিকাশ বলে, তাদের জন্য সামনে এখন ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার।’ কিন্তু কাপুরুষ মরার আগে বারবার মরে। বীর সাকিব তাই শেষ বিকেলে চুরি যাওয়া আলোয় আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে বলে যান, ‘সম্ভব। এখনো জয় সম্ভব।’
দ্বিতীয় দিন শেষে
আফগানিস্তান প্রথম ইনিংস : ৩৪২
বাংলাদেশ : ১৯৪/৮