ক্রু মৌসুমীর কাছ থেকে সাড়ে ৯ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার

ইউএস বাংলার চাকরিচ্যুত কর্মকর্তার ইন্ধনে চোরাচালান

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রু রোকেয়া শেখ মৌসুমীকে দিয়ে সোনা চোরাচালানের নেপথ্যে রয়েছেন সংস্থাটির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা নেসার (৩৯)। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত বলে জানতে পেরেছে মামলার তদন্ত সংস্থা। মৌসুমীকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে। এ তথ্য এখন যাচাই-বাছাই চলছে। গত বৃহস্পতিবার সাড়ে ৯ কেজি (৮২টি) স্বর্ণসহ গ্রেপ্তারের পর বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ, সোনা চোরাচালানিচক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও যাবতীয় তথ্য উদ্ধারের জন্য গতকাল শুক্রবার দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে মৌসুমীকে।

বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন শিমুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউএস বাংলার মাস্কাট থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আসা ফ্লাইটে ডি-১১ আসনের যাত্রী ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের আশিহাত গ্রামের (আশিহাতা দরবার শরিফ) সুহেল খাঁ (৩৮)। তিনি ৭৮ পিস স্বর্ণের বার বিমানের মধ্যেই মৌসুমীকে দেন। এর মধ্যে ৭২ পিস লাকি নামে জনৈক নারীর জন্য, বাকি ছয়টি ইউএস বাংলার চাকরিচ্যুত কেবিন ক্রু নেসার ও তার স্ত্রীর জন্য আনা হয়। মৌসুমী নিজের নামে কেনা চারটি সোনার বার এনেছেন একই এয়ারলাইনসের অপর কেবিন ক্রু আসাদের জন্য।’

শিমুল আরও বলেন, ‘নেসার এই চক্রের অন্যতম হোতা। তার সহযোগিতায় অপর আসামিরা দীর্ঘদিন থেকে বিমানবন্দরে কেবিন ক্রুদের ব্যবহার করে স্বর্ণ চোরাচালান করে আসছিলেন। নেসার একসময় ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসে কেবিন ক্রু হিসেবে চাকরি করতেন। পরে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মৌসুমী জানিয়েছেন, নেসার বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত। তিনি পলাতক থাকায় বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে স্বর্ণ চোরাচালানচক্রের আরও অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে।’

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, লাকি নামে যে নারী আসামির নামে ৭২ পিস স্বর্ণ আনা হয়েছে, তাকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এটা তার ছদ্মনামও হতে পারে। তার শুধু একটি ফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে। প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

এদিকে গতকাল শুক্রবার শেখ মৌসুমীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই শফিকুল ইসলাম মৌসুমীকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকা মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম শুনানি শেষে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন।

এসআই শফিকুল আদালতে আর্জিতে উল্লেখ করেন, রোকেয়া শেখ মৌসুমী মামলার পলাতক আসামি সুহেল খাঁর কাছ থেকে উড়োজাহাজের মধ্যে ৭৮টি স্বর্ণের বার গ্রহণ করেন। আসামি লাকির জন্য ৭২টি, নেসার ও তার স্ত্রীর জন্য ছয়টি স্বর্ণের বার আনেন। বাকি চারটি স্বর্ণবার আসাদ বাপ্পীর জন্য আনেন মর্মে স্বীকার করেন। আসামি নেসার ও অন্যদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র স্বর্ণ চোরাচালান করে আসছে। আসামি মৌসুমী এই চক্রের সক্রিয় সদস্য। বিদেশ থেকে স্বর্ণ এনে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশের ক্ষতি করছেন। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের প্রকৃত মালিক, গ্রহীতা ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত পলাতক সহযোগী আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে এই আসামির ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।

অন্যদিকে মৌসুমীর পক্ষে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে রিমান্ডের আদেশ দেয়।

গত বৃহস্পতিবার রোকেয়া শেখ মৌসুমীকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ওমানের রাজধানী মাস্কাট থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসা একটি ফ্লাইটের কেবিন ক্রু ছিলেন মৌসুমী। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরের কনকর্স হলে এপিবিএনের একজন নারী কনস্টেবল সন্ধ্যা রানী তার দেহ তল্লাশি করেন। এ সময় তার ইউনিফর্মে বিশেষভাবে তৈরি পকেট ও অন্তর্বাস থেকে মোট ৮২টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। যার ওজন ৯ কেজি ৫০০ গ্রাম এবং এর দাম আনুমানিক চার কোটি ১০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট এপিবিএনের এসআই মো. হেলাল উদ্দিন বাদী হয়ে মৌসুমীসহ চারজনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।