রোহিঙ্গা এক নারীর ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সার্ভারে পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকের তথ্য সুরক্ষিত সার্ভারে কীভাবে এলো তা তদন্তে কমিটিও গঠন করেছে ইসি। ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ ঘটনার তদন্তে নেমে সার্ভারে আরও ৫৪টি অসংগতিপূর্ণ এনআইডির খোঁজ মিলেছে। কার্যালয়ের নথিপত্রে যেগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। এনআইডি সার্ভার জালিয়াতিতে জড়িতদের খোঁজে মাঠে নেমেছে পুলিশও। তারা বলছে, ইতিমধ্যে সালাম নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন আগে মিয়ানমার থেকে আসা ওই ব্যক্তিকে ধরতে পারলেই রহস্য উদঘাটন হবে।
‘লাকী’ নামে স্মার্টকার্ড নিতে রমজান বিবি নামে এক রোহিঙ্গা নারী এনআইডি নিয়ে গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আসেন। সার্ভারে তার সব তথ্য সংরক্ষিত দেখা যায়। লাকীর এনআইডি নম্বর-১৯৯২১৫১৩৭৭১০০০৬২৯, স্বামী: নজির আহম্মদ, পিতা: হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নের আব্দুর সালাম ও মাতা শাহেদা বেগম। ওই নারীর কথাবার্তায় সন্দেহ হলে জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে জানানো হয়, ভোটার হিসেবে নিবন্ধন কিংবা লাকীর নামে এনআইডি ইস্যু করা হয়নি। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় হাটহাজারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
এ ঘটনার তদন্তে ইসি ও চট্টগ্রাম কার্যালয় দুটি কমিটি গঠন করে। ইসির তদন্ত দলের প্রধান এনআইডি উইংয়ের পরিচালক খোরশেদ আলমের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিটি গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে আসেন। কমিটি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়সহ বিভিন্ন উপজেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে ইসির সার্ভার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি এটি সুরক্ষিত রাখতে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সার্ভারে কীভাবে রোহিঙ্গা নাগরিকের তথ্য এলোÑ বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত। বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই বেশি কিছু বলতে চাই না।’
২০০৮ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা করে ইসি। এরপর ২০১১ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তদন্তে তালিকায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা ভোটার থাকার বিষয়টি উঠে আসে। পরে যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা থেকে ৪৫ হাজার নাম বাদ দেয় ইসি। এর চার বছর পর আরও সাড়ে চার হাজার রোহিঙ্গার নাম বাদ দেওয়া হয়।
এদিকে রোহিঙ্গা নারী রমজান বিবির তথ্যানুসারে তার স্বামী নজির আহম্মদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নজির আহম্মদ ১৯৯০ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে। প্রথমে সে নগরীর পতেঙ্গায় আশ্রয় নেয়। পরে হাটহাজারী উপজেলায় বসবাস শুরু করে।’
রমজান বিবি কীভাবে ভোটার হলোÑ তা জানতে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে সালাম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বিস্তারিত জানা যাবে। এই সালামও মিয়ানমার থেকে দীর্ঘদিন আগে বাংলাদেশে এসে বসতি করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
এদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে তুরস্কের ভিসা সংগ্রহের জন্য ঢাকা যাওয়ার পথে মো. ইউসুফ (২৩) ও মো. আজিজ (২১) নামে দুই রোহিঙ্গাকে নগরীর আকবর শাহ থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে আরেক রোহিঙ্গা আটক হয়। এছাড়া গত ছয় মাসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও পাঁচলাইশ অফিসে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসে শতাধিক রোহিঙ্গা আটক হয়েছে। এ বিষয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ইসির সার্ভারটি কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও বিভিন্ন জেলা ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এ সার্ভারে কাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে এনআইডি সংক্রান্ত কাগজপত্র আপলোড করা হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে আলাদা আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) নম্বর বা পিন দিয়ে সার্ভারে কাজ করা হয়।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কীভাবে রোহিঙ্গারা ভোটার হলোÑ বিষয়টি নিয়ে আমরা নিজেরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছি। বিভিন্ন উপজেলা ও থানা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মানুযায়ী তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ভোটার করান। কিন্তু রোহিঙ্গারা কীভাবে ভোটার হলো, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তদন্ত দল কাজ করছে। আশা করি তদন্তে বিস্তারিত উঠে আসবে।’