অনিচ্ছুক আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা জাপার

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ায় চিন্তায় পড়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলীয় প্রার্থী সাদ এরশাদকে নিয়ে এমনিতেই রংপুর জাপায় তুমুল দ্বন্দ্ব। সাদের পক্ষে মাঠে না নামার ঘোষণা দিয়েছেন রংপুর জাপার শীর্ষ নেতারা। তার ওপর এতদিন ছাড় দিয়ে আসা মহাজোটের প্রধান আওয়ামী লীগ এবার প্রার্থী দেওয়ায় বেশ বিপদেই পড়েছে দলটি।

অন্যদিকে, ২০০১ সালের পর এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে উচ্ছ্বসিত রংপুরের মানুষ। এখানে রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজুকে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন রাজু। এ সময় তার সঙ্গে থাকা নেতারা সমঝোতার বিষয়টি স্রেফ গুজব বলে মন্তব্য করেন। তারা বলেন, এ কথায় কেউ কান দেবেন না। সমঝোতা হবে না। নৌকা থাকবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই আসনের এমপি ও জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যাওয়ার পর থেকেই আমরা আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলাম। এতদিন তারা কিছু বলেনি। এখন হঠাৎ করেই প্রার্থী দিয়েছে। আমরা একসঙ্গে নির্বাচন করেছি। আশা করছি আওয়ামী লীগ এখানে ছাড় দেবে।

গতকাল সোমবার জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন। দলের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা কিছুটা হয়েছে। তবে তারা এখনো ঐকমত্যে আসতে পারেননি। এটা হবে কি হবে না তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ বিষয়টি বিবেচনা করবে বলেছে। তবে এ জন্য মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

এ নিয়ে বেশ চিন্তিত রংপুরের জাপার প্রার্থী সাদ এরশাদের সমর্থক নেতারা। এ ব্যাপারে রংপুর জেলা জাপার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমঝোতার ব্যাপারে কেন্দ্র ব্যবস্থা নেবে। কেন্দ্রীয় নেতারা আলোচনা করবে। যতদূর জানি আলোচনা অব্যাহত রেখেছেন। সমঝোতার সম্ভাবনা আছে। আশা করছি আওয়ামী লীগ সহযোগিতা করবে।

এই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী রাজু ভাই আমাদের খুব প্রিয়। এখানে তার সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না। আমাদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এখান থেকে কিছু হবেও না। এ বিষয়গুলো ওপর থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সমঝোতা হলে লাঙ্গলের জিততে একটু সহজ হয় উল্লেখ করে জাপার এই নেতা বলেন, এখানে জাপার ভোট বেশি। সব রেডি ভোট। ফেয়ার নির্বাচন হলে জাপা জিতবে। তবে রাজু ভাই (আওয়ামী লীগের প্রার্থী) না থাকলে সহজ হয়।

এই নেতা এমনও মনে করেন, প্রার্থী নিয়ে রংপুরে দলের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব তা কেটে যাবে। তিনি বলেন, আমি নিজেও প্রার্থী হতে চেয়েছিলাম। দল দেয়নি। অন্যদের মনেও কষ্ট আছে। এই মান-অভিমান কেটে যাবে। আশা করছি সবাই ঐক্যবদ্ধভাবেই দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে।

প্রার্থী নিয়ে সমঝোতার ব্যাপারে রংপুর আওয়ামী লীগ কিছু জানে না বলে মন্তব্য করেছেন সেখানকার নেতারা। এ ব্যাপারে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমঝোতার ব্যাপারে এখনো আমাদের কাছে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) রাজু ভাইকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন। নেত্রীর মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর বাইরে অন্য কারও সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, তারা (জাপা) সমঝোতা চাইতেই পারেন। তারা মহাজোটের অংশ। তবে চাইলেই হবে না। সবকিছু নির্ভর করবে নেত্রীর ওপর। নেত্রী যা বলবেন তাই হবে। তবে মাঠ আমাদের দখলে।

তুষার কান্তি ম-ল আরও বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো খবর আসেনি। সমঝোতার ব্যাপারে এখানে কোনো আলোচনা হবে না। এখানে তখনই আলোচনা হবে, যদি সমঝোতা হয়। তখন জাপা ও আওয়ামী লীগ কীভাবে ভোট করবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হবে।

এর আগে গত শনিবার আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৮ বছর পর এখানকার মানুষ নৌকা প্রতীক দেখতে পেল। তারাও একটা পরিবর্তন চায়। এখানে মহাজোটের অংশ হিসেবে জাপাকে এত বছর ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে দেশের লাভ হয়েছে। কিন্তু রংপুরের কোনো উন্নতি হয়নি। রংপুর সব থেকে পিছিয়েছে।

১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুল গণি স্বপন জেতার পর থেকে রংপুর-৩ আসনটি আর কখনো জাতীয় পার্টির হাতছাড়া হয়নি। সর্বশেষ দুটি নির্বাচনে এ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ওই নির্বাচনে এরশাদের বিপরীতে কোনো প্রার্থী দেয়নি মহাজোটে তাদের শরিক আওয়ামী লীগ। চলমান একাদশ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদ গত ১৪ জুলাই মারা গেলে রংপুর-৩ আসনটি শূন্য হয়।

আওয়ামী লীগ আভাস দিয়েছিল, এবার তারা আর রংপুরে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিতে চায় না। এরশাদের আসনে উপনির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের প্রার্থী রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজুর নাম ঘোষণা করা হয় গত শনিবার। নানা নাটকীয়তার পর জাতীয় পার্টি রবিবার জানায়, দলের প্রতিষ্ঠাতার আসনে তার ছেলে রাহগীর আল মাহী সাদকেই (সাদ এরশাদ) মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

৯ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা : গতকাল সোমবার ছিল ওই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। মোট ৯ জন তাদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ১২ জন। রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস এ তথ্য জানিয়েছে।

যারা মনোনয়নপত্র জমা দিলেন আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু, জাতীয় পার্টির রাহগীর আল মাহী সাদ এরশাদ, বিএনপির রিটা রহমান, খেলাফত মজলিসের তৌহিদুর রহমান ম-ল, গণফ্রন্টের কাজী শহিদুল্লাহ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির শফিউল আলম, বাংলাদেশ কংগ্রেসের একরামুল হক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এরশাদের ভাতিজা আসিফ শাহরিয়ার ও বিএনপির মহানগর কমিটির সহ-সভাপতি কাওসার জামান।

মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেও যারা জমা দেননি, তারা হলেনÑ আওয়ামী লীগের মহানগর কমিটির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক এমএ মজিদ ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর জেলার সাধারণ সম্পাদক এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসীর।