ইয়ামি আলভী রবকে (১৯) পরিকল্পিতভাবেই ভিক্টর ক্লাসিকের আরেকটি বাস হত্যার চেষ্টা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন তার মা রুমানা পারভেজ। তিনি বলছেন, স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় গত শনিবার রাজধানীর উত্তরার কামারপাড়া এলাকায় তার ছোট ছেলে আলভীকে চাপা দেয় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের বাসটি। যে কোম্পানির আরেক বাসের চাপায় তার এক দিন আগে স্বামী কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক পারভেজ রবকে হারান তিনি।
কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদের চাচাতো ভাই পারভেজ রবের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আলভী মেজো। গত রবিবার বিকেল থেকে তিনি আছেন শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারের ষষ্ঠতলার পুরুষ ওয়ার্ডের ১২ নম্বর বেডে। গতকাল সোমবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বেডে নিথর শুয়ে আছেন আলভী। তার দুই হাতের ক্ষতস্থানে লেগে আছে শুকনা রক্ত। আলভী জানান, গত শনিবার বাসচাপায় আহত হওয়ার পর থেকেই তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ রয়েছে। তার পাশেই চেয়ারে বিমর্ষ অবস্থায় বসেছিলেন মা রুমানা পারভেজ ও ছোট বোন লামিসা ইবনাথ। তারা জানান, আলভীর জন্য রবিবার বিকেল থেকে ট্রমা সেন্টারে আছেন।
রুমানা পারভেজ অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলেকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাওয়াতে তারা এমন করেছে। আমাদের বাসা উত্তরার ইস্টওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের পাশে। ভিক্টর ক্লাসিক বাসের স্ট্যান্ডও সেখানে। এজন্য আলভীকে তারা আগে থেকেই চিনত। আমার পরিবারকে শেষ করে দিতে চায় তারা। আমি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে কি না জানি না, চিকিৎসকরা বলেছেন সুস্থ হতে সময় লাগবে। স্বামীর মৃত্যুর শোক না কাটতেই ছেলেকে হারাতে বসেছি। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক দিনেই ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’
স্বামীর মৃত্যুর পর ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে রুমানা বলেন, ‘শনিবার বিকেলে স্থানীয় আবুল মাতব্বরের বাসায় একটি বৈঠক হয়। সেখানে বাস কর্র্তৃপক্ষও ছিল। কিন্তু কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়। ওই বৈঠকের আগে থেকেই আলভী ওর বাবার হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিল।’
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তুরাগে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন পারভেজ রব। এর এক দিন পর শনিবার রাতে একই পরিবহনের আরেক বাসের চাপায় উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের কামারপাড়ার সøুইচগেট এলাকায় তার ছেলে আলভী ও ছেলের বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন (২০) আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান মেহেদী। আলভীকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে পরে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে রবিবার বিকেল ৩টায় নেওয়া হয় শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে। আবদুল্লাহপুরের টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আলভী। মেহেদী তার বাল্যবন্ধু। গত রবিবার আসর নামাজের পর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের ধউর কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। গত বছর উত্তরা কমার্স কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে চাকরি খুঁজছিলেন মেহেদী। তার বাবার নাম ইউসুফ আলী। গ্রিলের ওয়ার্কশপ রয়েছে তার। তিন সন্তানের মধ্যে মেহেদী ছিলেন মেজো।
গতকাল দুপুরে ট্রমা সেন্টারের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. রিয়াদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলভীর এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে, মাজার পেলভিস বোনের বেশ কয়েক জায়গায় ভেঙেছে। তবে এই মুহূর্তে কোনো অস্ত্রোপচার করার প্রয়োজন নেই। তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।’
আহত আলভী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা সেদিন উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের সøুইসগেট এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস গেট বন্ধ করে জ্যামে ধীরগতিতে যাচ্ছিল। আমি গেট খোলার জন্য হেলপারকে অনুরোধ করি। কিন্তু না খোলায় বাসের জানালার ওপরে উঠে ড্রাইভারকে ডাক দিয়ে গেট খোলার অনুরোধ করি। ড্রাইভার আমাকে দেখামাত্রই বাউলি দিয়ে বাস ডান দিক দিয়ে টান দেয়। আমি আর জানালা থেকে নামার সময় পাইনি। বাসের বাউলিতে আমার বন্ধু মেহেদী রাস্তায় ছিটকে পড়ে। আমি রাস্তার বাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মিনি বাসে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাই।’ এখন কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাজার নিচে থেকে অবশ হয়ে আছে। কোনো শক্তি পাচ্ছি না। ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না।’
উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্র জানায়, বাসচাপায় নিহত মেহেদীর মামাতো ভাই ফিরোজ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ বাসটি জব্দ করেছে। থানার ডিউটি অফিসার এসআই জাকির জানান, ভিক্টর ক্লাসিক বাসটির চালক রফিকুল ইসলামকে (৬০) গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার তার রিমান্ড শেষ হবে।
এদিকে আলভীর বাবা পারভেজ রবকে চাপা দেওয়া বাসটি জব্দ করলেও তার চালক ও সহকারীকে ধরতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তুরাগ থানার ওসি নুরুল মুকতাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারভেজ রবকে চাপা দেওয়া বাসটি জব্দ করা হয়েছে। চালক ও সহকারীকে শনাক্তও করা হয়েছে। তবে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
বিচার দাবিতে মানববন্ধন : বাসচাপায় পারভেজ রব ও মেহেদীকে হত্যার এবং আলভীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে জড়িতদের বিচার দাবিতে গতকাল সোমবার দুপুরে ইস্টওয়েস্ট মেডিকেলের সামনে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিলে সড়কের পাশে মানববন্ধন করেন তারা।