শহীদুল জহিরের ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’: বাস্তব ও জাদুবাস্তবের দ্বৈরথ

রবীন্দ্রনাথ, আমাদের বাংলা ভাষায় গল্পের একটি ছাঁচ গড়ে দিয়েছিলেন; সেই গল্পের ছাঁচে ধরা পড়েছিলেন অনেকেই, পরবর্তীতে বহুদিন যাবৎ। কিন্তু ‘পরবর্তীতে বহুদিন যাবৎ’-এর পরে একটি হ্যাভোকে নাড়া খেলো রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর অনুসারী গল্পকারদের গল্পের ভিত; হ্যাঁ, কল্লোলের সাহিত্যিক হ্যাভোকের কথাই বলছি : যে হ্যাভোক রোমান্টিক আর ভিক্টোরিয়ান নীতিবোধের গোড়ায় সজোরে কুড়াল হাঁকিয়ে দেয়, ভেঙে পড়ে তা হুড়মুড়িয়ে। গড়পড়তা রাবীন্দ্রিক সাহিত্যবোধের আরও পরে; বহুদিনের গল্পচর্চা থেকে বহু যোজন যোজন দূরে অবস্থান শহীদুল জহিরের।

জহিরই প্রথম তাঁর গল্পে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে হাতে নিয়ে শুরু করেছিলেন জাদুবাস্তবতায় গল্প রচনা। যা বহুদূরের লাতিন আমেরিকার বুম সাহিত্য আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত ছিল বহুলাংশে; কিন্তু দেশজ গল্পের মাল-মসলায় ছিল ভরপুর। অর্থাৎ, জহির সাহিত্য-প্রভাব গ্রহণ করেছেন ওই লাতিন আমেরিকা থেকে; কিন্তু, সাহিত্যের উপাদান অবশ্যই দেশজ। এবং যদি প্রথমেই পার্থক্য নির্দেশ করতে হয়, সেই লাতিন ভূমি-বাস্তবতার সঙ্গে এই বাংলা অঞ্চলের ভূমি-বাস্তবতার : তবে দেখা যাবে যে পার্থক্য প্রচুর; তবে মিল খুঁজতে গেলে যে কেউই নিরাশ হওয়ার বদলে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠবেন, নানা বিষয়ের মিলের মাধ্যমে, এ হলফ করেই বলা যায়। এর প্রাথমিক যে ব্যাপার, তা হলো লাতিন আমেরিকা আর ভারতে উপনিবেশের নগ্ন কাজ-কারবার এবং উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক দেশজ অবস্থা থেকে খোলনচলে বদলে ফেলার ইতিহাস। এবং যা জায়মান ছিল এবং আছে এখনো; বিউপনিবেশায়নের বহুদিন পরও।

জাদুবাস্তবতার যে আখ্যান নির্মাণ কৌশল তার মধ্যে থাকে রূপকথা সহ নানা কাল্পনিক বিষয়; সে দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটি। কারণ, যে কেউ মার্কেজের ‘A Very Old Man with Enormous Wings’ পড়ার পর তার কাছে এই গল্পের বিষয়বস্তু রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে। কিন্তু জহিরের ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ গল্পটি পড়ার পর কেউই এ গল্পে মার্কেজের গল্পের মতো রূপকথাভিত্তিক ন্যারেটিভ খুঁজে পাবে না। আমি বলছি না যে, কেউই জহিরের কোনো গল্পে মার্কেজের জাদুবাস্তবতার মতো জাদুবাস্তবতা খুঁজে পাবে না; তা পাবে, বিভিন্ন গল্পে। আর প্রায় সব গল্পেই বয়ান-কৌশলের বেলায়; এবং জাদুবাস্তবতা-ভিত্তিক কথাসাহিত্য-টেকনিকের সঙ্গে নানা বিষয়ের মিলও খুঁজে পাবে।

জহির কী কী হাজির করেছেন ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’ নামের গল্পে? দেখিয়েছেন নানা কিছু। প্রথমতই জহির রাজনৈতিকভাবে তাঁর প্রত্যেক গল্পে ভীষণভাবে সরব : তার ছিটেফোঁটা নয়, সম্পূর্ণটাই আমরা দেখি এই গল্পে। গল্পের নাম : ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’। আসলেই তাই। পুঁজিবাদের নিরন্তর বেখেয়ালি সঙ্গম এবং একরোখা আধিপত্যে ‘তৃতীয় বিশ্বে’র লোকজন যে আরও ভীষণভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, হয়ে পড়ে নানাদিক থেকে; পরিবর্তিত হয় সমাজের সকল স্তর, তার নিখুঁত চিত্র এই গল্প। এই গল্পের আলাপকালে আমরা নাম নেব ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পেরও। কারণ, স্তরভিত্তিক পুঁজিবাদী কর্মকাণ্ডের প্রথম পর্যায় যদি হয় ‘আমাদের কুটির শিল্পের ইতিহাস’, তবে এর পরের পর্যায় অবশ্যই ‘ডুমুরখেকো মানুষ’।

গল্পের সূচনায় জহির আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো পুরোনো ঢাকাকে ব্যবহার করেছেন গল্পের স্থানিক পটভূমি হিসেবে। এবং বহুদিনের এই অঞ্চলে নগরীয় কর্মকাণ্ডে মহল্লার ব্যাপারটাকে অনুধাবন করেই সামনে এগিয়েছেন জহির। মনে রাখা জরুরি, জহির যে সময় তাঁর ছোটগল্প লিখছেন সে সময় পুরোনো ঢাকা তার প্রতাপ-প্রতিপত্তি সবই হারিয়ে বসে আছে; বসে আছে বিয়ের অনুষ্ঠানের নেড়ি কুকুরের মতো, এক কোণে। সেই ‘ঢাকা’-ই আনলেন, আর আনলেন ‘ঢাকার ভাষাকে’; জহির। কেন আনলেন? আসলে ব্যক্তিক ব্যাপার-স্যাপার যেটুকু ছিল তার চেয়ে জহির এই মহল্লার কর্মকাণ্ডের হিসেবের মধ্যে সামষ্টিক একটি বয়ান নির্মাণেই বেশি আগ্রহী হলেন। তাই আধুনিকতার যে ব্যক্তিক খচ-খচানি তা থেকে রক্ষে হলো জহিরের এই গল্পের।

এ তো গেল; তা হলে আর কী কী আছে এই গল্পে? আসল বিষয়টাই বাদ রয়ে গেছে। জহিরকে যে আমরা গুনতির মধ্যে রাখব, তার জন্য প্রথমেই বলেছিলাম যে, জহির রাজনৈতিকভাবে ভীষণ সচেতন। হ্যাঁ, সেটাই এখন বলা যাক। এই গল্পের পুরো কর্মকাণ্ড পুরান ঢাকার এক মহল্লার প্রতীকে উঠে এসেছে। আর সকল কাজ-কারবার সামনে এগিয়ে চলেছে তরমুজ উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সেটা স্বাভাবিক ছিল প্রথমে; কিন্তু, বদলে গেছে সময়ের টাইমফ্রেমে। জহিরের অন্যান্য গল্পের দিকে চোখ লাগান, যে কেউ দেখবেন যে, বয়ানের টাইমফ্রেমকে ভেঙে ফেলার জন্য জহির বেশ সক্রিয়। কিন্তু, জহির, তাঁর এই গল্পে ক্রনোলজি মেনে নিয়েছেন। কীভাবে? সেটাই জিজ্ঞাসার কথা। জহির এই গল্পের তরমুজের উৎপাদন থেকে শুরু করে শেষতক ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেই টাইমফ্রেমে আটকা পড়েছেন। এবং তরমুজ উৎপাদন ও ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারটাতে যে ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে, তাও ক্রমায়ত বয়ানের মাধ্যমেই তুলে ধরেছেন। এখানেই জহির বেশ বাস্তব হয়ে উঠছেন, আর চাপা পড়ে গেছে বিষয়ভিত্তিক তাঁর জাদুবাস্তবতার বিষয়; এমনকি জাদুবাস্তবতার কিছু কিছু গাল্পিক করণ-কৌশলও বদলে গেছে।

জহির মূলত এই গল্পে নানারকম স্থানিক এবং মানুষের বর্ণনায় একটি অঞ্চলেরই অবস্থাকে নির্দেশ করছেন; আর সেই অঞ্চল যে বাংলা, তা বোঝা যায় নানাভাবে। ধরা যাক এই গল্পে মলত্যাগের যে খোলা বর্ণনা, তা তো আমাদের দেখিয়ে দেয়, আমরা কোন অঞ্চলের গল্প পড়ছি। আবার এও জানায় যে, আমরা নিশ্চিতভাবে ইউরোপকে পড়ছি না। আমরা বুঝতে পারি ভূমিপুত্র আর বসৎকারের পার্থক্যের বিষয়টাও। এই যে কৌশল, আর এই কৌশলের কারণেই তাঁর এই গল্প জাদুবাস্তবতার মধ্যে চলেও বাস্তবতাকে ভীষণভাবে লেজে টেনে নিয়ে সামনে এগোয়। তবে এই জেনারেশনের কাছে, যাদের অভিজ্ঞতা নেই খোলা আকাশের নিচে তরমুজের ভূঁইয়ে মলত্যাগের, তাদের জন্য ব্যাপারটা যে জাদুবাস্তবতার মতোই হবে, তা আর বলার দরকার নেই। তবে জেনে রাখা জরুরি যে, মাটির সঙ্গে মল মিশে যাওয়া, এবং তার দ্বারা তরমুজের বৃদ্ধির প্রক্রিয়া যে কেউ বৈজ্ঞানিকভাবে মেনে নিতে বাধ্য, কিন্তু এই বর্ণনাকে যে কেউ জাদুবাস্তবতার নিরিখে আলোচনাও করতে পারবে। কিন্তু, এরই পরবর্তীতে উন্নয়ন-প্রকল্পের তালে তালে নিজস্বতার মেরুদণ্ড যে নেই হয়ে যাচ্ছে, তা জহির চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দিলেন এই গল্পে।

জহির এ গল্পে তরমুজের অবস্থা ও গুণগত মানের ক্রমাগত পরিবর্তন; এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মহল্লার পরিবর্তনের ব্যাপারটাকে হাজির করেছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থার যে সমস্ত পরিবর্তন দেখিয়েছেন, তা মূলত এই অঞ্চলের ইনডিজেনাসিটিরই ক্রমাগত পরিবর্তন; তা বোঝা যায় সহজেই। জহির এই গল্পকে সাজানোর সময় যে সকল লোকজন হাজির করেছেন, তাদের মধ্যে মহল্লার উপপ্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর যে উপস্থিতি; এবং তার যে ভূমিকা, তা তো দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারবেন; সেই সমস্ত দেশের উন্নয়ন-প্রকল্প কিংবা উৎপাদনের কাঠামোগত বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গেও। আসলেই তরমুজ খাওয়ার সময় অন্তর্বয়ানে যে ন্যারেটর বয়ান হাজির করছে, সে কিন্তু জানান দিচ্ছে তার পূর্বপুরুষের তরমুজ খাওয়ার ইতিহাস, এবং শেষ করছে তরমুজের ক্যানিং-ফ্যাক্টরিতে তরমুজ প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে। আর এরই মাধ্যমে এই অঞ্চলের তথাকথিত উন্নয়নের নামে যে নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে, তাই হাজির করেছেন জহির। ফলে এই সকল ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার মধ্যেই জহিরের গল্প যতোটা না জাদুবাস্তব; তার চেয়ে বহুলাংশে বাস্তব। তবে বাস্তব আর জাদুবাস্তবের কোনোটাই বাদ পড়েনি; গল্প লেখার বেলায়। আর এই সত্যতা গল্পের শেষ চরণের উচ্চারণে নিরুপিত হয় : ‘আমরা চিৎকার করে উঠি, এই শেপালি ফুল গা-ছ, আমরা তাকে আর পাই না, আমরা তাকে হারাই।’

লেখক: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: Sohan.du.13@gmail.com