থানায় ধর্ষিতাকে বিয়ে

ওসির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা খেয়াল রাখবে হাইকোর্ট

পাবনায় ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও এ নিয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকে নজর রাখবে হাইকোর্ট। গতকাল বুধবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চে সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদ তুলে ধরে ওসি ওবাইদুল হকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে স্বপ্রণোদিত আদেশ চান তিন আইনজীবী।

এদিকে মামলার অন্যতম আসামি আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল ইসলাম ওরফে ঘন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই আওয়ামী লীগ নেতার অফিসেই তিন দিন আটকে রেখে গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘন্টু দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

অন্যদিকে গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণের প্রাথমিক সত্যতা ও প্রমাণ মিলেছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম।

গতকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের অবকাশকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাবনার ভুক্তভোগী ওই নারীর বিষয়টি তুলে ধরেন আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল, গাজী ফরহাদ রেজা ও রোহানী সিদ্দিকা। এ সময় তারা এ বিষয়ে হাইকোর্টের কাছে স্বপ্রণোদিত আদেশ চান। আদালত তাদের জানায়, গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা বিষয়টি নজরে রাখছে। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাস গুপ্ত।

তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনজন আইনজীবী পাবনার ওই ঘটনা নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আদালতের নজরে এনেছিলেন। আদালত তখন বলে, ওসিকে ইতোমধ্যে শোকজ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসন পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয় বিষয়টি তাদের নজরে থাকবে।

দলবদ্ধ ধর্ষণের আসামির সঙ্গে নির্যাতিতা নারীকে গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে পাবনা সদর থানায় জোর করে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ওসি ওবাইদুল হকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। যার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সেই রাসেল সাংবাদিকদের জানায়, তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুলিশ তাদের বিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় জেলা পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ভুক্তভোগী ওই নারীর অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয় ওসিকে। এছাড়া ওসি ওবাইদুল হক এবং এসআই ইকরামুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়।

নির্যাতিতা তিন সন্তানের জননী ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিবেশী রাসেল গত ২৯ আগস্ট রাতে তাকে তার বাড়িতে নিয়ে এক সহযোগীসহ পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এরপর তাকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে নিয়ে আটকে রেখে আরও চার থেকে পাঁচজন ধর্ষণ করে। পরে স্বজনদের সহায়তায় চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। এরপর পাবনা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ রাসেলের সঙ্গে তার বিয়ের ব্যবস্থা করে।

 

মূল হোতা আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার : পাবনার ওই গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলার অন্যতম আসামি দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ঘন্টুকে (৩৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীর মুলাডুলী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাবনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইবনে মিজান দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানান।

ঘন্টু সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের দড়িকামালপুর এলাকার সিরাজ মাস্টারের ছেলে। ঘন্টুর বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা এবনে মিজান বলেন, ‘ঘন্টুর অফিসেই ওই নারীকে তিন দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে।’

এ নিয়ে আলোচিত ওই মামলার পাঁচ আসামির মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে গৃহবধূর অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার পর ধর্ষণের অভিযোগে রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে : গত মঙ্গলবার পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম ধর্ষণের ঘটনাস্থল ঘন্টুর অফিসে গিয়ে ধর্ষণের আলামত ও থানায় বিয়ে দেওয়ার কাগজপত্র জব্দ করেন। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনাস্থল ঘন্টুর অফিসটি অপরাধস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে ক্রাইম সিন ফিতা দিয়ে ঘিরে দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ও আলামত দেখে দলবদ্ধ ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে। ওসির কাছ থেকে শোকজ নোটিসের জবাব পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মামলার অন্য আসামি গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামিরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, এ ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

এদিকে ওই গৃহবধূকে থানায় গিয়ে বিয়ে পড়ানোর কথা স্বীকার করেছেন কাজি মাওলানা ফজলুল হক আজম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদিও বিবাহিত নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে তালাকের পর বিয়ে দেওয়ার কোনো বিধি-বিধান নেই। তবুও ওসি ওবাইদুল হকের চাপে আমার এলাকার বাইরে গিয়ে বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ কথিত ওই বিয়ের কাগজপত্রাদি জব্দ করেছে। তবে এই অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য আমি অনুতপ্ত।’

 

কে এই ঘন্টু : আওয়ামী লীগ নেতা ঘন্টুর ব্যাপারে জানতে চাইলে দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘন্টু আমার কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। তিনি সভাপতি এবং আমার কোনো কথা শোনেন না। তিনি তার মতো করে চলাফেরা করেন। আমরা বলেও তাকে সংশোধন করতে পারিনি। কারও ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় দল বহন করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘন্টু গত চার-পাঁচ বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। অল্পদিনের মধ্যেই নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন। তার ত্রাসের রাজত্বে এলাকার ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।’

সরেজমিন এলাকায় ঘুরে ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের সত্যতাও পেয়েছে দেশ রূপান্তর। ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য না দিলেও ওসি ওবাইদুল হকের সঙ্গে ঘন্টুর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি এলাকার সবাই জানেন। তারা জানান, ঘন্টু বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সালিশি বাণিজ্য করলেও স্থানীয় পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।