রাজধানীর উত্তরার তুরাগ এলাকায় ভিক্টর ক্ল্যাসিক বাসের চাপায় নিহত কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক পারভেজ রবের (৬৬) স্ত্রী রুমানা পারভেজ তার অসহায়ত্বের কথা জানাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান। স্বামী হারানোর শোক না কাটতেই একই কোম্পানির অপর একটি বাসের চাপায় গুরুতর আহত ছেলে ইয়ামি আলভী রব (১৯)। তার কোমরের হাড় ভেঙে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে গেছে। বড় ছেলে ইয়াসিম ইসরাক (২৪) মালয়েশিয়াতে পড়ালেখা করছেন।
ছোট মেয়ে লামিসা ইবনাথ (১৩) উত্তরা কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্বামী পারভেজ রবই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি মারা যাওয়ায় ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানো, চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবার চালাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন রুমানা পারভেজ। তার এই বিপাকের কথা জানাতে চান প্রধানমন্ত্রীকে।
গতকাল বিকেলে আহত ছেলে আলভীকে উত্তরায় নিজ বাসায় নেওয়ার পরে কথা হয় তার মা রুমানা পারভেজের সঙ্গে। তিনি মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। বড় ছেলের পড়ালেখার খরচ কীভাবে দেব, আলভীর চিকিৎসা কীভাবে করাব, সংসার কীভাবে চলবে? আমাদের আয়ের কোনো পথ নেই। আমাদের কোনো অভিভাবকও নেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অসহায়ত্বের কথা বলতে চাই। আপনারা আমাকে একটু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভিক্টর বাস এর আগেও অনেক অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়েছে। মানুষ মেরেছে, অনেক পরিবারকে পথে বসিয়েছে। এর কি কোনো প্রতিকার হবে না। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই।’
তিনি বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর বাস কর্র্তৃপক্ষ সাহায্যের কথা বললেও ছেলেকে চাপা দেওয়ার পর আর কোনো খবর নেয়নি। এখন আমরা আতঙ্কে দিন পার করছি। আমাদের পাশে কেউ নেই। পুলিশ কোনো খবর নিতে আসেনি। বুধবার তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ আলভীকে দেখতে এসে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১২ হাজার টাকা ছাড় দিয়েছে। এখন পর্যন্ত আর কেউ কোনো সহায়তা করেনি।’
গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর শ্যামলীর ট্রমা সেন্টার থেকে আলভীকে ছাড়পত্র দিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। চার সপ্তাহের ওষুধ দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ না হলে কোমরে অস্ত্রোপচার করা লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ট্রমা সেন্টারের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রিয়াদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলভীর শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিমুক্ত। তাকে কিছুদিন বেড রেস্টে থাকতে হবে। আমরা আশা করছি সে সুস্থ হয়ে যাবে।’
এদিকে পারভেজ রবকে চাপা দেওয়ার সাত দিন পার হলেও বাসের চালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবার।
এ বিষয়ে তুরাগ থানার ওসি নুরুল মুকতাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারভেজ রবকে চাপা দেওয়া ভিক্টর বাসের চালক ও তার সহকারীতে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
শনিবার আলভীর সঙ্গে বাস চাপায় নিহত মেহেদীর মামাত ভাই ফিরোজ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন উত্তরা পশ্চিম থানায়। পুলিশ ঘটনার দিনই ঘাতক বাসটি জব্দ করে বাসের চালককে গ্রেপ্তার করে। এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পরই ভিক্টর ক্ল্যাসিক বাসের চালক রফিকুল ইসলামকে (৬০) গ্রেপ্তার করে দুই দিনের রিমান্ড আজ (বুধবার) শেষ হয়েছে। তাকে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে।’
ওসি আরও বলেন, ‘সে বিষয়টি দুর্ঘটনা বলে দাবি করেছে। আমরা সকল পক্ষের সঙ্গে কথা বলছি। তদন্ত শেষ না হলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
উল্লেখ্য, ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তুরাগে ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন পারভেজ রব। কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদের চাচাত ভাই পারভেজ রব। পারভেজ নিহতের এক দিন পর শনিবার রাতে একই কোম্পানির অপর একটি বাসের চাপায় উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের স্লুইসগেট এলাকায় পারভেজ রবের ছেলে আলভী ও তার বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটন (২০) গুরুতর আহত হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যায় মেহেদী। গুরুতর আহত হয় আলভী।