১৮ বছর আগে কায়লা বার্গেরন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর কর্র্তৃপক্ষের একজন বড় কর্মকর্তা। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর পাশের ১১০ তলা ভবনের ৬৮ তলায় অফিস। সকাল ৮টার মধ্যেই অফিসে ঢুকতে হতো নিয়মিত। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরও সকাল ৮টার মধ্যে অফিসে ঢোকেন কায়লা। ওইদিনই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটির চার স্থানের হামলায় নিহত হয় প্রায় তিন হাজারের বেশি মানুষ।
কায়লার মনে করতে না চাইলেও বারবার মনে পড়ে দিনটি ছিল মঙ্গলবার। অন্যদের সঙ্গে সারা দিনের কাজ নিয়ে কথা বলছিলেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ৮টা বেজে ৪৫ মিনিট। হঠাৎ খুব কাছেই বিমানের শব্দ পান। এরপরই বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে সবকিছু। ধাতস্থ হতে হতেই জানতে পারেন বিমান হামলা হয়েছে তাদের ভবনে। ২০ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল ভর্তি আমেরিকান এয়ারলাইনসের বোয়িং-৭৬৭ মডেলের একটি উড়োজাহাজ আছড়ে পড়েছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর দিকের টাওয়ারে। প্রথম হামলার ১৮ মিনিট
পরে আরেকটি বোয়িং-৭৬৭ দক্ষিণ দিকের টাওয়ারে আঘাত হানে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তর দিকের ভবনটি ধসে পড়ে। ভয়াবহ ওই হামলায় ১৯ জন হামলাকারীসহ ২ হাজার ৯৯৬ জন নিহত হন। এর মধ্যে শুধু ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চালানো দুটি বিমান হামলায় মারা যান ২ হাজার ৭৬৩ জন। আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে ৩৪৩ জন দমকলকর্মী এবং ৬০ জন পুলিশ সদস্যও নিহত হন। কয়েক হাজার আহত মানুষকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
ওই ঘটনায় খুব অল্প কয়েকজন মানুষ শারীরিকভাবে অক্ষত থেকে বাইরে আসতে পারেন। কায়লা তাদেরই একজন। শারীরিকভাবে আহত না হলেও সেই ভয়ংকর ঘটনার ভয়াবহতা বয়ে বেড়াচ্ছেন আজো। এখনো বিমানের শব্দ শুনলেই আতঙ্কে সিটিয়ে থাকেন। ওই ঘটনার ১৮ বছর পর তিনি আদালতের নির্দেশে এখন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেচ ডিসঅর্ডার পুনর্বাসন কেন্দ্রে আছেন। ওই ঘটনার কয়েক বছর পরেই বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চাকরি ছাড়েন। এরপর অবশ্য আরেকটি সরকারি প্রকল্প শুরু করেন। কিন্তু সেই ভয়াবহ দিনটির কথা মন থেকে মুছতে পারেন না তিনি। সাময়িকভাবে ভুলতে অতিরিক্ত মদ পান শুরু করেন। মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন। ছাড়া পেয়ে চলে যান বাবার সঙ্গে থাকতে। কিন্তু সেই ভয়াবহ সময় তার পিছু ছাড়েনি। এখনো চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে।
ওই ঘটনায় আহত ১০ হাজারে বেশি মানুষ তার মতো ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তারা। ফিরতে পারবেন এমন আশাও করছেন না অনেকে। হামলার পর এলাকায় ডায়োক্সিন ও কার্সিনোজেনিক নামের বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় আহতদের অনেকেরই ক্যানসার ঝুঁকিও বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হেলথ প্রোগ্রামে এখনো পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষের চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে ৪০০০ মানুষ প্রোস্টেট, ব্রেস্ট ও স্কিন ক্যানসারে আক্রান্ত। এলাকায় কর্মরত প্রায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলেও গবেষণার জানা গেছে।
তবে হামলার ধাক্কাটা লাগে বিশ্বজুড়েই। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার জন্য দায়ী করা হয় আল কায়েদা নামের জঙ্গি সংগঠনকে। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে তালেবানরা আশ্রয় দিয়েছে এমন অভিযোগে এক মাসের মধ্যেই আফগানিস্তানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে এখন পর্যন্ত ১২ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানে প্রায় ৮ লাখ ৭৫ হাজার এবং পাকিস্তানে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া সেই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় এখনো মানুষ মরছে।
স্মরণ : ওই ঘটনায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের পাদদেশে আসেন সবাই। সেখানে নির্মিত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ। চারদিকে করুণ নিস্তব্ধতা নিয়ে গ্রাউন্ড জিরো নামের সেই স্তম্ভ বেয়ে ঝরনার পানি অশ্রু হয়ে বয়ে যায়। জলধারার পাড় ধরে প্রত্যেক নিহতের নাম খোদাই করা হয়েছে। নামের পাশে ফুল দিয়ে স্মরণ করেন হারানো স্বজনকে। ‘ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ইলেভেন মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামে’ গিয়েও স্বজনদের স্মরণ করেন দর্শনার্থীরা। এবারও সেখানে দিবসটি পালন করা হবে। তবে এবারের অনুষ্ঠানে থাকবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তালেবানদের সঙ্গে যে বৈঠকের কথা বলেছিলেন তার সমালোচনাও। তবে শুধু নিউ ইয়র্কে নয়, দেশটির অনকে রাজ্যেই অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করে শ্রদ্ধা জানানো হবে নিহতদের উদ্দেশে।
স্মরণের আইন : এদিকে চলতি বছর থেকে দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়ান ইলেভেনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং ওই ইতিহাস জানতে দিবসটি পালনে আইন করা হয়েছে। প্রতিটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করতে হবে।
তথ্যসূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, বিবিসি ও ইউএস টুডে।