প্রবৃত্তির তাড়না মানুষের অনেক বড় শত্রু। কারণ এটি মানুষকে বিপথগামী করে। অনেক সময় অন্যায় জেনেও মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়। তবে কারও ভেতরে আল্লাহর প্রকৃত ভয় থাকলে এসব মুহূর্তেও পাপকাজ থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়। সামাজিক অনাচার ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটে আল্লাহকে ভুলে গেলে। যে সমাজে আল্লাহকে ভয় করার মতো লোকের সংখ্যা বেশি, সে সমাজ অপেক্ষাকৃত সভ্য ও সুশীল। যত কড়া আইনই হোক, যত কড়া প্রশাসনই হোক, ফাঁকফোকরে মানুষ অপকর্মে লিপ্ত হবেই। তবে তার মধ্যে আল্লাহর প্রকৃত ভয় থাকলে এই তাগিদেই পাপাচার থেকে দূরে থাকবে। তাকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখতে কোনো আইনে খড়্গ বা প্রশাসনিক নজরদারির দরকার নেই। এ জন্য আল্লাহর প্রকৃত ভয় ছাড়া সমাজ সুষ্ঠু, সভ্য ও সুশীল হয় না।
সামাজিক ভারসাম্য ও সুষ্ঠুতা টিকিয়ে রাখতেই ইসলাম তাকওয়ার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে যে রকম ভয় করা উচিত তাকে তোমরা ঠিক সেভাবে ভয় করতে থাকো এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আল-ইমরান-১০২) হজরত ওমর (রা.) তাকওয়ার অর্থ জানতে চাইলে সাহাবা হজরত উবাইদ ইবনে কাব (রা.) বলেন, কাঁটা বনের ভেতর দিয়ে চলতে গেলে যেমন সাবধান ও সতর্ক হয়ে চলতে হয়, তেমনি গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা করে চলাকে বলে তাকওয়া। কাঁটা হলো এ ঘাত-সংঘাতময় জীবনে চলার পথে সব গোপন ও প্রকাশ্য পাপাচার। তাকওয়া হলো আল্লাহকে স্মরণ করে এগুলো পরিহার করে চলা। তাকওয়া কেবল ঠোঁটে বা হৃদয়ে বিশ্বাস হলে চলবে না। এটা হতে হবে বাস্তব কর্মভিত্তিক। আমাদের চিন্তা-চেতনায়, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায়, কৃষিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্পে, সাহিত্যে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
কেউ কেউ মনে করেন শিক্ষিত হলে তাকওয়া অর্জন করা যায়। কিন্তু মূলত তাকওয়া অর্জনের জন্য শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষা দ্বারা তাকওয়া কী তা জানা যায়; কিন্তু তা অর্জন করা যায় না। আমাদের সমাজের উঁচুশ্রেণির মানুষরা কি শিক্ষিত নয়? যদি জ্ঞান ও শিক্ষাতেই তাকওয়া অর্জিত হতো, তাহলে সমাজে কেন এত দুর্নীতি, অন্যায়, পাপাচার ও অপকর্ম! সমাজের নিম্নশ্রেণির লোকরা যে দুর্নীতি ও অন্যায় করে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি করে উঁচুশ্রেণির ভদ্রবেশী লোকরা। এ জন্য শুধুই জ্ঞান ও শিক্ষা তাকওয়া অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। তাকওয়া হলো এমন এক অন্তর্মুখী শক্তিসম্পন্ন গুণ, যা সুপ্ত আত্মা ও বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এটি অনুভবের, উপলব্ধির ও অনুধাবনের ব্যাপার। তাই এর অভাবে বাস্তব জীবনে দেখি এক অন্ধকার ও তমসাচ্ছন্ন ছবি।
নাগরিক ও সামাজিক জীবনে তাকওয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানুষের মনের রাজ্য নিয়ন্ত্রক তাকওয়া কারও ভেতরে থাকলে সে অসদাচরণ করতে পারবে না। সে দুর্নীতি করবে না, মানুষকে ঠকাবে না, প্রতারণা করবে না, সুদ-ঘুষের বাণিজ্য করবে না, কালোবাজারি করবে না, মিথ্যা কথা বলবে না, অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে হরণ করবে না, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইনের লঙ্ঘন করবে না। তাকওয়ার মাধ্যমে মানুষকে অন্যায়-অপকর্ম থেকে যেভাবে বিরত রাখা সম্ভব, তা আইন-প্রশাসন দিয়ে কখনো সম্ভব নয়। ইসলামের সোনালি যুগে শক্তিশালী আইন-প্রশাসন তেমন ছিল না, কিন্তু মানুষের ভেতরে ছিল তাকওয়ার বীজ। ফলে তৎকালীন সমাজ-সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সুখময় ও শান্তির আবাস হিসেবে। একজন নারী শত শত মাইল সফর করতেন একা একা, তার নিরাপত্তার কোনো ভয় ছিল না। মূল্যবান সম্পদ পড়ে থাকত খোলা আকাশের নিচে, কেউ ফিরেও তাকাত না।
তাকওয়ার প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে দেবেন বলে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মোত্তাকিরা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মোত্তাকি।’ (সুরা হজুরাত : ১৩) তাকওয়ার প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখে, নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবাসস্থল।’ (সুরা নাজিআত : ৪০-৪১) তাকওয়া প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রাসুলুল্লাহ! মানুষের মধ্যে অধিক সম্মানিত কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে অধিক মোত্তাকি বা পরহেজগার। (বোখারি ও মুসলিম) সুতরাং আমাদের সমাজকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে হলে প্রত্যেকের তাকওয়ার গুণ অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : ইসলামবিষয়ক লেখক