ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষা করবে কে

একের পর এক বড় দরপতনের ঢেউয়ে শেয়ারবাজারের সূচক নামছে। চলতি বছর তিন দফায় দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ডিএসইএক্স পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসে। এর মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরেই দুই দফায় এ ঘটনা ঘটল। বুধবার বড় ধরনের দরপতনে ডিএসইএক্স ২০১৬ সালের অবস্থানে ফিরে গেছে। এক দিনেই সূচকটি ৭৬ পয়েন্ট বা দেড় শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৪ হাজার ৯৩৩ পয়েন্টে। গত প্রায় ৩৩ মাসের মধ্যে এটিই ডিএসইএক্সের সর্বনিম্ন অবস্থান। এর আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর ডিএসইএক্স সূচকটি ৪ হাজার ৯২৪ পয়েন্টের সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচকও বুধবার ২১৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে। শেয়ারবাজারের ধস থামাতে নানা সুপারিশ, তদন্ত কমিটি করেও কিছুতেই দরপতন ঠেকাতে পারছে না পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

 

শেয়ারবাজারের চলমান ধসের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, বাজারে কারসাজি, মানহীন কোম্পানির আইপিও ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বাজারসংশ্লিষ্টদের দ্বন্দ্বকে দায়ী করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। এ অবস্থার কারণে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে মতিঝিলে মানববন্ধনও করা হয়েছে। উল্টোদিকে, সম্প্রতি বিএসইসির নির্দেশে আন্দোলনরত বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করে ডিএসই কর্র্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। আগস্ট মাসের শেষ দিকে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, বিএসইসির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে কমিটি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সংবাদের পর ওই দিন সূচক বাড়ে। কিন্তু ২৮ আগস্ট বিএসইসি দাবি করে যে, দুদকের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর আবারও সূচক পড়তে থাকে। অবশ্য, দুদকের পক্ষ থেকে এই তদন্তের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

জুন মাসে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার পর থেকে বাজারে টানা দরপতন শুরু হয়। জুলাইয়ে ডিএসইএক্স সূচক কমে ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসে। দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে বিএসইসির গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ১৩ জুন বাজেট ঘোষণার দিন থেকে বুধবার পর্যন্ত ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা। ১ সেপ্টেম্বর থেকে বুধবার পর্যন্ত মাত্র ৭ কার্যদিবসে বাজার মূলধন কমেছে ৯ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। বুধবার ঢাকার বাজারে লেনদেন হওয়া ৩৫৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৮৮টি বা ৮২ শতাংশেরই দরপতন ঘটেছে। দাম বেড়েছে মাত্র ৩৭টি বা ১০ শতাংশের। কিন্তু বড় ধরনের দরপতনের মধ্যেও বুধবার দিন শেষে ঢাকার বাজারে লেনদেন হয় ৫০২ কোটি টাকার। যা গত এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে অনেকেই সন্দেহ করছেন, কম দরে শেয়ার কেনার জন্য জোটবদ্ধ হয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান দরপতনে ভূমিকা রাখছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারসাজি ছাড়া এসব শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।

শেয়ারবাজারে লাগাতার এমন ধসের নেপথ্যে যে কারণগুলোর কথা ঘুরেফিরে আসছে তার মধ্যে রয়েছে, টানা পতনের বাজারেও মানহীন কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনকে একটি বড় কারণ বলে মনে করা হয়। মানহীন কোম্পানিকে আইপিওর সুযোগ দেওয়ায় সেকেন্ডারি বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সম্প্রতি মানহীন বেশ কয়েকটি কোম্পানির আইপিও এবং তালিকাভুক্তি নিয়ে ডিএসইর সঙ্গে বিএসইসির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বাজারের তারল্য সংকট, পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন, গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির পাওনা নিয়ে দ্বন্দ্বও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাজারের উত্থান-পতনে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রায় দুই মাস আগে একটি তদন্ত কমিটিও করে এসইসি। সম্প্রতি ওই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা পড়লেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনো নিতে পারেনি কমিশন। এ পরিস্থিতিতে, শেয়ারবাজারের ধস ঠেকানো এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।