চিহ্নিত অপরাধীদের সঙ্গে ওসি ওবাইদুলের সখ্য

নির্যাতিতা গৃহবধূর করা দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শরিফুল ইসলাম ঘন্টুকে বাঁচাতেই পাবনা সদর থানা চত্বরে বিয়ের আয়োজন করেন ওসি ওবাইদুল হক। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই বছর আগে ওবাইদুল হক সদর থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ঘন্টুর এলাকায় দাপট বেড়ে যায়। নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সালিশ বাণিজ্য করে বেড়ালেও তাকে থামাতে পারেননি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। এদিকে ওসি ওবাইদুলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি এলাকায় ‘ওপেন সিক্রেট’ হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়েও ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে অভিযোগ দেওয়ার সাহস পাননি। কেউ ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই তাকে ওসির মাধ্যমে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হতো। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘন্টুর মাধ্যমে ওসি ওবাইদুল হক মাদক কারবারি ও বিভিন্ন অপরাধ চক্রের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন। তাদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে, দাপুনিয়া এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিংসহ জেলা পুলিশের যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বও পড়ত এই ঘন্টুর কাঁধেই। গত বুধবার গৃহবধূকে ধর্ষণ মামলায় ঘন্টু গ্রেপ্তার হলে তার সঙ্গে ওসি ওবাইদুলের ঘনিষ্ঠতার একাধিক ছবি ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৯ আগস্ট রাতে অপহৃত হওয়ার পর টানা কয়েকদিন টেবুনিয়া সিড গোডাউন এলাকায় ঘন্টুর ব্যক্তিগত কার্যালয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় তিন সন্তানের জননী গৃহবধূকে। পরে ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ওই নারী ঘন্টুসহ পাঁচজনকে আসামি করে পাবনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেন। এ বিষয়টি জানাজানি হলে দেশ রূপান্তরসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে ওসি ওবাইদুল হককে ফোন করলে তিনি অভিযোগ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেন। পরে গৃহবধূর অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না করে থানায় অভিযুক্ত এক ধর্ষক রাসেলের সঙ্গে ওই নারীকে জোর করে বিয়ে দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা চেষ্টার অভিযোগ ওঠে ওসির বিরুদ্ধে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় গতকাল ওসিকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসে সংযুক্ত করা হয়।

ঘন্টু ও ওসি ওবাইদুলের মধ্যে সখ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল ক্ষমতায় আসার পর ঘন্টু গত চার-পাঁচ বছর আগে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। পরে অল্প দিনের মধ্যেই নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। কেউ ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই তাকে ওসির মাধ্যমে মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হতো। আমরা বলেও তাকে (ঘন্টু) সংশোধন করতে পারিনি।’

সরেজমিনে দাপুনিয়া এলাকা ঘুরে ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের সত্যতাও পেয়েছে দেশ রূপান্তর। ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য না দিলেও ওসির সঙ্গে ঘন্টুর বিশেষ সম্পর্কের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে শুধু ঘন্টুই নয়, সদর থানার বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি ও মাদক কারবারিদের সঙ্গেও সখ্য ছিল ওসির। এসব সন্ত্রাসী নিয়মিত তাদের ফেইসবুক পেজে ওসির সঙ্গে আন্তরিক মুহূর্তের ছবিও পোস্ট করত। থানায় বিয়ের ঘটনায় বেকায়দায় পড়লে ওসিকে নির্দোষ দাবি করে তারা ফেইসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেয়। এদের অনেকে আবার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের ফোন দিয়ে ওসির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ না করতে ভয়ভীতিও দেখায়।

অঢেল সম্পদের মালিক ওসি ওবাইদুল : পাবনায় কর্মরত একটি বাহিনীর গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, অনুসন্ধানে ওসি ওবাইদুলের বিপুল ধন-সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আর এর সবই তিনি গড়েছেন তার অবৈধ উপার্জন থেকে। পাবনার ১৪টি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে তাদের অননুমোদিত খাদ্যপণ্য উৎপাদনের বখরা হিসেবে মাহবুব ও আতিক নামে দুই ব্যক্তির মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা করে মাসোহারা নিতেন ওসি। এছাড়াও সদর উপজেলার একটি বালুমহাল নিয়ন্ত্রক এক ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা এবং মহেন্দ্রপুর এলাকার মাদক সম্রাটসহ বিভিন্ন মাদক কারবারির কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা তুলতেন।

রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকায় ওসি ওবাইদুলের ছয়তলা বিলাসবহুল একটি বাড়ি রয়েছে জানিয়ে এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্প্রতি ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি প্রাইভেট কার কিনেছেন ওসি। তিনি ৮৪ হাজার টাকা দামের হাতঘড়ি এবং ৪২ হাজার টাকা মূল্যের চশমার ফ্রেমও ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত স্মার্টনেসের দম্ভ প্রকাশ করতে এসব নিয়ে বাহাদুরিও দেখাতেন তিনি।

এদিকে ওসির সব অপকর্মের বিষয়ে তদন্ত চলছে জানিয়ে পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওসি ওবাইদুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান। আপাতত তাকে পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’