ঢাকার কেরানীগঞ্জের খেজুরবাগান এলাকার ২০ বছরের স্মৃতি রানী (ছদ্মনাম) গৃহকর্মীর কাজ করতেন সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের একটি বাসায়। গৃহকর্তার ছেলে পলাশ কুমারের (ছদ্মনাম) সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে ২০০৩ সালে মন্দিরে মালাবদল ও আদালতে হলফনামা দিয়ে বিয়ে করেন দুজনে। তবে পলাশের পরিবার এ বিয়ে মেনে নেয়নি। ২০০৪ সালে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে অস্বীকার করেন পলাশ। স্ত্রীর মর্যাদা পেতে নানা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হতাশ স্মৃতি বিচ্ছেদ চান। কিন্তু হিন্দু আইনে স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা না হলে আলাদা থাকার সুযোগ থাকলেও বিচ্ছেদের সুযোগ নেই। একপর্যায়ে একটি মানবাধিকার সংগঠনের হস্তক্ষেপে দুজনে আলাদা থাকতে শুরু করেন। সেই থেকে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেয়েকে নিয়ে স্মৃতি সূত্রাপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন। পলাশের কাছ থেকে ভরণপোষণ হিসেবে প্রতি মাসে পান ৯ হাজার টাকা।
সাভারের আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকার যুবক প্রহল্লাদ পালের সঙ্গে পারিবারিকভাবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হয় শেরপুরের নালিতাবাড়ীর স্বর্ণালী পালের (২১)। সাভার ইপিজেডে একটি কোম্পানির সহকারী স্টোরকিপার প্রহল্লাদ গত বছর সেপ্টেম্বরে মারা যান। স্বর্ণালী জানতে পারেন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, বেতনভাতা মিলিয়ে কোম্পানির কাছে প্রহল্লাদের পাওনা ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। কিন্তু বিয়ের তথ্যপ্রমাণ না থাকা ও স্বামীর পরিবারের অসহযোগিতায় সেই অর্থ এখনো বুঝে পাননি তিনি। মৃত স্বামীর পরিবারে একপ্রকার অচ্ছুত স্বর্ণালী এখন রাজধানীর তেঁজতুরী বাজারে বাবার সঙ্গে থাকেন। ঢাকার একটি কলেজে স্নাতক পড়ছেন।
স্মৃতি ও স্বর্ণালীর মতোই নানা বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য হিন্দু নারী। স্বামী দুশ্চরিত্র, লম্পট, নির্যাতনকারী, কিংবা নিরুদ্দেশ যাই হোন স্ত্রীর বিয়ে বিচ্ছেদের কোনো অধিকার বা সুযোগ নেই। এ নিয়ে কোনো আইনও নেই। এমনকি স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকের হাতে নির্যাতন-লাঞ্ছনার স্বীকার হলেও কিছুই করার নেই তার। আইন অনুযায়ী, আলাদা থাকার সুযোগ থাকলেও লোকলজ্জার ভয়ে অনেক নারীই দিনের পর দিন মুখ বুঝে পড়ে থাকেন স্বামীর সংসারে। অন্যদিকে হিন্দু পুরুষের স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই একাধিক বিয়ে করার সুযোগ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্বামীর সম্পত্তির ভাগ পান না। জীবনস্বত্বে তা শুধু ভোগ করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে বিধবাদের অনেকটা আশ্রিতের মতো বাস করতে হয় মৃত স্বামীর বাড়িতে। এছাড়া বাবার সংসারেও মেয়েরা সম্পত্তির ভাগ পান না।
মানবাধিকার কর্মী, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, আইনি অধিকার ও সমতার প্রশ্নে এর সুরাহা হওয়া উচিত। হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার ও বিয়ে বিচ্ছেদসহ অন্যান্য ব্যাপারে হিন্দু আইনের সংস্কার ও প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৭০ বছরে হিন্দু আইনের কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু যুগের প্রয়োজনে, আন্তর্জাতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আইন প্রণয়ন ও পরিবর্তন করতে হয়। এখানে শাস্ত্র ও প্রথার দোহাই দেওয়া হয়। যদি হিন্দু নারীদের অধিকারের প্রশ্নে, উত্তরাধিকারের প্রশ্নে ভারতে, নেপালে আইন প্রণয়ন হতে পারে তাহলে আমাদের দেশে তা করতে বাধা কোথায়?’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই হয় তো শাস্ত্র এবং প্রথার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবেন। কিন্তু যেখানে যেখানে সার্বজনীন মানবাধিকার ও সাম্যতার প্রশ্ন এসেছে সেখানেই আইনের প্রণয়ন কিংবা সংশোধন হয়েছে। তাই শাস্ত্র শাস্ত্রের জায়গায় থাকুক। আইন করে হিন্দু নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে তো কোনো সমস্যা নেই।’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রে (আসক) নির্যাতনের শিকার হিন্দু নারীদের অভিযোগের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। আসকের উপপরিচালক নীনা গোস্বামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বামী কর্র্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বীকৃতি না দেওয়াসহ স্বামীর সম্পত্তি ভোগ-দখলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে অনেক হিন্দু নারী প্রতিনিয়তই আমাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বামী-স্ত্রীর বিয়ে বিচ্ছেদের কোনো সুযোগ নেই। অথচ হিন্দু আইনে পুরুষকে একাধিক বিয়ে করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর প্রথা অনুযায়ী কিংবা আইন না থাকায় এই ধর্মে মৃত স্বামীর সম্পত্তি বিধবা নারী ভোগ করতে পারলেও সম্পত্তিতে তার কোনো অধিকার নেই।’
তিনি জানান, হিন্দু নারীর আলাদা বসবাস ও ভরণপোষণ নামে ১৯৪৭ সালের একটি আইন রয়েছে। যেসব স্ত্রী সামাজিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হন সালিশির মাধ্যমে তাদের ভরণপোষণের চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে স্বীকৃতি কিংবা বিচ্ছেদের বিষয়ে কিছুই করার থাকে না। আর হিন্দু স্বামী-স্ত্রীর বিয়ের জন্য নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকলেও সেটি বাধ্যতামূলক না হওয়ায় জটিলতা আরও বাড়ছে।
হিন্দু আইন সংস্কারের লক্ষ্যে ২০১২ সালে অন্তত ৫০টি নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে একটি খসড়া সুপারিশমালা তৈরি করে তা আইন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ছিল সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার, সুনির্দিষ্ট কারণ সাপেক্ষে আদালতের মাধ্যমে হিন্দু নারী-পুরুষের বিয়ে বিচ্ছেদ ও পুনঃবিবাহ, হিন্দু নর-নারীর বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং দত্তক নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়। কিন্তু পরে বিষয়টি আর বেশিদূর এগোয়নি।
বিয়ে বিচ্ছেদ কিংবা তালাকের ক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, নারীরা নিকাহনামার ১৮ নম্বর কলামের শর্তসাপেক্ষে স্বামীকে তালাকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। কিন্তু হিন্দু নারীর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো আইন বা বিয়ের দলিল নেই। হিন্দু বিয়ে নিবন্ধন করতে সরকার ২০১৩ সালে একটি আইন করলেও সেটি বাধ্যতামূলক নয়, ঐচ্ছিক।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুসলিম আইনে বাবার সম্পত্তি ও বিয়ে বিচ্ছেদের বিষয়ে তা-ও তো নারীদের অধিকার রয়েছে। কিন্তু হিন্দু নারীদের এর কিছুই নেই। নারী-পুরুষের সমতা, সংবিধান ও আইনের আলোকে হিন্দু নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।’
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘হিন্দু নারীদের সম্পত্তি বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার না থাকা বৈষম্য তো বটেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে হিন্দু নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন হয়েছে। সমানাধিকারের প্রশ্নে আমাদের দেশেও এ ধরনের আইন প্রণয়ন হওয়া উচিত।’