গত ১৮ বছরের প্রচলিত ধারণা ও তথ্য-উপাত্ত ভেঙে এ বছর ডেঙ্গু নানা দিক থেকেই নতুন রেকর্ড করেছে। একদিকে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে; তেমনি ব্যতিক্রম হয়েছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময়েরও (পিক টাইম); বিশেষ করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেওয়া গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবার ‘পিক টাইম’ ‘জুন-আগস্টে’র পর ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বেড়েছে। এ মাসে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯ হাজার ৪৭০ জন। গত বছর এ সময় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৭।
আগের বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা গেছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে। এবার সেখানে এ বছর সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে আগস্টে ৫২ হাজার ৬৩৬ জন। এ মাসে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও তাতে সন্তুষ্ট নন কীটতত্ত্ববিদরা। তাদের মতে, বছরের মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। তবে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার একেবারেই কম থাকে। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে বলে বোঝা যাচ্ছে। তার পর থেকে এর প্রকোপ কমতে পারে।
এমনকি এবারই প্রথম ঢাকার বাইরে সবগুলো জেলায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এত দিন মনে করা হতো ডেঙ্গু আক্রান্তদের মাধ্যমে ঢাকার বাইরে রোগটি ছড়াচ্ছে। এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ বলছে, এডিস ইজিপটাই মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ মূলত ঢাকা শহরে হলেও এবার তা গ্রামগঞ্জে ছড়িয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মোট রোগীর অর্ধেকই ঢাকার বাইরে। সেখানে ডেঙ্গুর আরেক ধরনের মশা এডিস এলবোপিক্টাসের লার্ভা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এই মশার বংশবিস্তারের সবগুলো উপাদানই সেখানে রয়েছে।
ডেঙ্গুর এসব লক্ষণ ও ধরন দেখে রোগতত্ত্ব ও কীটতত্ত্ববিদরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এখন থেকে ডেঙ্গুকে আর কেবল মৌসুমভিত্তিক রোগ বলা যাবে না। আগামীতে বছরজুড়েই দেশে ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে; বিশেষ করে ঢাকার বাইরে রোগটির বিস্তার আগামীতে আরও বাড়তে পারে। এমনকি তারা ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৪’-এর ঝুঁকিপূর্ণ প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কাও করছেন।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে থেকেই ডেঙ্গুর প্রকাপ বছরজুড়েই ছিল। মৌসুমের সময় রোগী বাড়ত। এবার ব্যতিক্রম হয়েছে। রোগী যেমন বেড়েছে, তেমনি রোগটির ধরন-ধারণও পাল্টেছে। ফলে আগামীতে বছরজুড়েই হতে পারে। হয়তো প্রকোপ এবারের মতো হবে না, তবে রোগটি থাকবে। কারণ এডিস মশার প্রকোপ ব্যাপক হারে বেড়েছে। গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে।
এই রোগতত্ত্ববিদ আগামীতে ডেঙ্গুর নতুন ধরনের ব্যাপারেও সতর্ক করে দেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, এখন পর্যন্ত তিন টাইপের ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এগুলোতে খুব কমসংখ্যক মানুষই আক্রান্ত হতে পারে। তবে ভবিষ্যতে আমরা ডেঙ্গুর নতুন ধরন ‘ডেন-৪’ নিয়ে শঙ্কায় আছি।
এবারের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপরও আগামীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঠিক কতটা ও কেমন হবে, তা নির্ভর করছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমেছে। তবে পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই পুরোপুরি আশঙ্কামুক্তও হওয়া যাচ্ছে না। অনেকটা মাঝারি মানের নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এই সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে হবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।
একইভাবে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, নতুন করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে। এরপরও প্রতিদিন যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই। এ সংখ্যা জিরোতে নামিয়ে আনতে হবে। নতুবা আগামীতে প্রকোপের ঝুঁকি রয়েই যাবে।
বিশেষ করে আগামীতে ডেঙ্গুর নতুন ধরন নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো একটি সোরোটাইপ (ধরন) কাউকে আক্রান্ত করলে তা পরবর্তী সময়ে ওই মানুষের দেহে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। একই ধরনের ডেঙ্গু আবার একই মানুষের দেহে প্রবেশ করলে তার আর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। যেমন চলতি বছর বেশির ভাগ ডেঙ্গু রোগী ডেন-৩ সোরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেন-৩ সোরোটাইপ বহন করছে এমন মশা ভবিষ্যতে একই মানুষকে কামড়ালে তার আর ডেঙ্গুজ্বর হবে না যদি না অন্য কোনো সোরোটাইপ তার দেহে প্রবেশ করে।
এই রোগতত্ত্ববিদ আরও বলেন, এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর সোরোটাইপ ‘ডেন-৪’ এখন পর্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়নি। ২০১৭ সাল থেকে ‘ডেন-৩’ পাচ্ছি। এ বছর বেশি। সুতরাং আগামীতে নতুন ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে। তবে আমরা সব সময়ই ডেঙ্গুর ধরন পরীক্ষা করি।
সে ক্ষেত্রে বছরজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এবার দেখা গেছে দেশে এডিস ও সাধারণ মশার বিস্তার বেড়েছে। তা ছাড়া কেবল বৃষ্টির পানিতেই ডেঙ্গুর ডিম থেকে লার্ভা ও লার্ভা থেকে বাচ্চা হয়, তা নয়। কৃত্রিম পানিতেও হতে পারে। যেমন এসির পানি বা ফুলের টবের পানি। সুতরাং এসব উপাদান কিন্তু রয়েছে। তাই এখন থেকে বছরজুড়েই মশা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে; বিশেষ করে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগে অর্থাৎ প্রাক-বর্ষায় মার্চ-এপ্রিলে ব্যাপকহারে মশা নিধনের কাজ করতে হবে। মশা কমে এলে ডিমও কম হবে। বর্ষা বা শীত মৌসুমে এডিস বাড়বে না।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী বছর হয়তো ব্যাপক হারে হবে না, তবে ডেঙ্গু থাকবে মনে হচ্ছে। হয়তো অন্য সোরোটাইপ দেখা দেবে। সে ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। নতুবা ঝুঁকি বাড়তে পারে। তা ছাড়া এবার ঢাকায় খুব বেশি হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও এডিস পাওয়া গেছে। লার্ভাও মিলেছে। সুতরাং ভবিষ্যতে গ্রামের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। না হলে ২০১৯ সালে যা ঘটছে, ভবিষ্যতে এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন মহানগর থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানালেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। শুধু নভেম্বর-ডিসেম্বর নয় এখন সারা বছরই কাজ করা হবে। আমরা গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মশা নিধনে কাজ করব।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের দুই সংস্থা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা বছর থাকলেও এপ্রিল থেকে বেশি দেখা দেয়। আগামীতে ডেঙ্গু থাকবে বা দেখা দেবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর। এবার বৃষ্টি অনিয়মিত হয়েছে। তাপমাত্রা বেশি ছিল। এর আগে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বেশি হতো। এবার আগস্টেই বেশি হয়েছে। সুতরাং ‘পিক টাইম’ চলে গেছে মনে হচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ আর বাড়বে বলে মনে হয় না। তবে মশা নিধন কার্যক্রম বছরজুড়েই রাখতে হবে।
‘আমরা চিকিৎসার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি’ উল্লেখ করে এই মহাপরিচালক বলেন, নতুন করে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। সব হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখছি। রোগীরা যেকোনো সময় এলেই চিকিৎসা পাবেন।
প্রস্তুতির ব্যাপারে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মশার সার্ভিলেন্স করছি। এটা নিয়মিত করব। নতুন ধরনের ডেঙ্গু দেখা দিলে বলতে পারব। ফলে সমস্যা হবে না। তবে মশা নিধনটা বছরজুড়েই রাখতে হবে। নতুবা এবারের মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বছরব্যাপী কার্যক্রম রয়েছে বলে জানান অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা। তিনি বলেন, এবার বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপের কথা জানিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে আগেভাগেই সতর্ক করা হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে চিকিৎসকদের সতর্ক করা হয়েছিল, যাতে তারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রস্তুতি নিতে পারেন। এরপর মার্চে ঢাকায় এডিস মশার বিষয়ে জরিপ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তখনই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রাণঘাতী এই রোগ ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে সে কথাও জানানো হয়েছিল। এই আশঙ্কা থেকেই আমরা গাইডলাইন আপডেট করেছি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের একটি টেকনিক্যাল কমিটি রয়েছে। তারপরও পরিস্থিতি কী হয়েছে তা সবাই জানেন। সুতরাং এগুলো মাথায় রেখে সবাইকে কাজ করতে হবে।