সাইলো নির্মাণ প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত থাকুক

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সারা দেশে ২০০টি সাইলো (ছোট গুদাম) নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে এই সাইলোতে সংরক্ষণ করা হবে। প্রতিটি সাইলোতে ৫০০০ টন ধান ২-৩ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। দেশ রূপান্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সাইলো নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সরকারের শতাধিক সাবেক কর্মকর্তা। পিডি হওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারা ধরনা দিচ্ছেন।

 

এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৩ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। ৬১টি জেলার ১৯০টি উপজেলায় এসব গুদাম নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১০টি কাজ করা হবে। এগুলো হচ্ছে প্রতিটি গুদামে ঘণ্টায় ১০ টন ধান শুকানোর প্ল্যান্ট স্থাপন, ৬০ টন ওজন ক্ষমতার ট্রাক স্কেল স্থাপন করা হবে, কনভেয়িং সিস্টেম, বাকেট এলিভেটর ও বাল্ক ওজন যন্ত্র স্থাপন করা হবে, সংযোগ সড়ক, অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ট্রাক ইয়ার্ড এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে। ফায়ার ফাইটিং, পানি সরবরাহ ও পাম্প স্থাপন করা হবে। একটি করে অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। ২০০ গুদামের মধ্যে ৬২টি গুদামের জন্য ২২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে।

 

বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তর ধান, চাল ও গম সংগ্রহ করে বিভিন্ন গুদামে রাখে। খাদ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ৭টি সাইলো, ১২টি সিএসডি, ৬৩২টি এলএসডি গুদাম রয়েছে। এসব গুদামের ধারণক্ষমতা ২১ লাখ ৪৮ হাজার টন। এর সঙ্গে যদি ২০০টি সাইলো নির্মাণ করা যায় তাহলে আরও ১০ লাখ টন ধারণক্ষমতাযুক্ত হবে।

 

চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদন খরচের চেয়ে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসানে ধান বেচতে হয়েছে কৃষকদের। দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি জোগাড় করতে হয়েছে। ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাজপথে নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই বোরো মৌসুমের সময়েই আত্মহত্যা করেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক কুঞ্জমোহন। তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের যেটা বিবেচনায় নিতে হবে, সেটা হলো বিভিন্ন এনজিও ও সমবায় সমিতি থেকে তিনি ঋণ নিয়েছিলেন। ধানের দাম না পাওয়ায় তার ঋণ শোধের সামর্থ্য ছিল না।

 

অভিযোগ রয়েছে, সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল না কিনে চালকলের মালিকদের কাছ থেকে কিনে থাকে। এতে ফড়িয়া-দালাল ও চালকলের মালিকদের পোয়াবারো হলেও বিপদে পড়েন কৃষকরা। সরকার-নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার কথা থাকলেও সরকারের খাদ্য বিভাগ সেটি চালকলের মালিকদের কাছ থেকে কিনে থাকে এই অজুহাতে যে, কৃষকের দেওয়া ধান যথেষ্ট শুকানো থাকে না। ফলে এসব ধান গুদামজাত করা যায় না। এখন কৃষকের ধান সংরক্ষণের জন্য ২০০ সাইলো নির্মিত হলে পরিস্থিতির উন্নয়ন যে ঘটবে সেটা সহজেই বোধগম্য হয়। কিন্তু এই প্রকল্পকে দুর্নীতিমুক্ত না করতে পারলে তা হবে খুবই দুঃখজনক।

 

সরকার এ প্রকল্প হাতে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকের কাছ থেকে বেশি ধান কিনতে পারা। এখন এ প্রকল্প ঘিরে এত সাবেক সরকারি কর্মকর্তার আগ্রহের একটা অন্যতম কারণ হতে পারে, প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ। যদি সরকারের এ প্রকল্পে দুর্নীতিই হয়ে থাকবে, তাহলে কৃষকরা তো লাভবান হবেন না। এসব কর্মকর্তা যে দুর্নীতির সুযোগ পেতে প্রকল্পের পরিচালক হতে চাইছেন, তার একটা ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যায় অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি প্রকল্পের একজন পরিচালকের আবেদন করার উদাহরণ থেকে। আমরা মনে করি, এই প্রকল্প ঘিরে যেন দুর্নীতির মচ্ছব না ঘটে। প্রকল্পের পরিচালক নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে যেন সততার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি, দক্ষতার বিষয়টিও বিবেচ্য হওয়া জরুরি। প্রয়োজনে, বেসরকারি খাতে যারা ফুড ম্যানেজমেন্ট সাপ্লাইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদেরও পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ প্রকল্পে যেন কোনোরকম দুর্নীতি না ঘটে এবং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য যাতে পূরণ হয়Ñ সেটা নিশ্চিত করতে হবে।