২০১২ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম স্থানে গিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন বিশ্বখ্যাত চিত্রপরিচালক জেমস ক্যামরন। তবে মাত্র চার মিটারের জন্য তিনি সবচেয়ে গভীরে যাওয়ার রেকর্ড ভাঙতে পারেননি। ১৯৬০ সালে দুই মার্কিন নাবিকের গড়া রেকর্ডও এবার ভেঙে দিয়েছেন ভিক্টর ভেসকোভো। গত ২৪ আগস্ট পাঁচ মহাসাগরের পাঁচটি গভীরতম স্থানে পৌঁছানোর মিশন শেষ করেছেন তিনি। একটি সাবমেরিন নিয়ে সব মিশনেই তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা। লিখেছেন পরাগ মাঝি
ফাইভ ডিপস এক্সপেডিশন
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে বসবাসকারী ভিক্টর ভেসকোভোর সর্বশেষ এবং পঞ্চম অভিযানটি ছিল আর্কটিকের মলয় ট্রেঞ্চ। একটি সাবমেরিন নিয়ে সমুদ্রের প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার (৩.৪ মাইল) গভীরে ডুব দিয়েছিলেন তিনি। এর আগের দশ মাসে তিনি প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর এবং এন্টার্কটিকা মহাসাগরের গভীরতম তল ছুঁয়েছেন। এই অভিযানগুলোর মধ্য দিয়ে পাঁচ মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম পাঁচটি স্থান বিজয়ী হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম উঠে গেছে ভেসকোভোর। সমুদ্রের গভীরে ডুবে থাকা টাইটানিক জাহাজও পরিদর্শন করেছেন তিনি।
ভেসকোভোর সব অভিযানেই ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষভাবে তৈরি একটি সাবমেরিন। ‘ট্রিটন’ নামের এই সাবমেরিনটির ওজন প্রায় ১২ টন।
‘ফাইভ ডিপস এক্সপেডিশন’ নামে ভিক্টর ভেসকোভোর ধারাবাহিক অভিযানের পঞ্চম ও সর্বশেষ পরীক্ষাটি ছিল মলয় ট্রেঞ্চ। এটি আর্কটিক মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থান। নরওয়ের সালবার্ড দ্বীপমালা থেকে ২৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মলয় ট্রেঞ্চ। ভেসকোভোর আগে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযাত্রী সামুদ্রিক এই খাদে পৌঁছাতে পারেননি। তাই তিনিই প্রথম এবং একমাত্র মানুষ, যিনি মলয় ট্রেঞ্চের গভীরতম তলদেশ স্বচক্ষে দেখে এসেছেন। এই অভিযাত্রায় তিনি প্রায় ৫ হাজার ৫৫০ মিটার গভীরে গিয়ে সমুদ্রের তলদেশ খুঁজে পান। ‘ফাইভ ডিপস এক্সপেডিশন’-এর সর্বশেষ অভিযান শেষে দলের সদস্যদের নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন ভিক্টর ভেসকোভো।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভেসকোভো বলেন, ‘এ ধরনের অভিযানের প্রয়োজন রয়েছে। শুধু টিকে থাকার পরীক্ষা কিংবা আত্মপ্রসাদে ভুগতে নয়, আমার দর্শন হলো অভিযানের মধ্য দিয়ে মানব সম্প্রদায়কে এগিয়ে নেওয়া।’
সত্যিকারের এক অভিযাত্রী
অজেয়কে জয় আর নতুন কিছু আবিষ্কার করা মানুষের আদিম নেশা। এ নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন ভিক্টর ভেসকোভো। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক এই সদস্যকে একজন ধনকুবেরও বলা যায়। নিজের খরচেই তিনি তার অভিযানগুলো পরিচালনা করেন। এমনকি, পাঁচটি মহাসাগরের গভীরতম স্থানে পৌঁছানোর জন্য যে ব্যয়বহুল অভিযান পরিচালনা করেছেন, তা নিজ খরচেই। তবে এই অভিযান তাকে খরচের চেয়ে লাভ এনে দেবে বেশি। কারণ এসব অভিযানের মাধ্যমে তিনি বেশ কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। এই তথ্যচিত্রগুলো এখন মহামূল্যবান সম্পদ। এগুলো নির্মাণে তিনি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল’-এর সহযোগিতা পেয়েছেন।
মহাসাগরের তলদেশ বিজয়ের আগে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে অভিযান পরিচালনা করেছেন ভিক্টর ভেসকোভো। শুধু তাই নয়, তিনি মাউন্ট এভারেস্টসহ সব মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোও জয় করেছেন। অভিযান পরিচালনায় ভেসকোভোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিজ্ঞানের সহায়তা গ্রহণ করা এবং বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়া।
বৈজ্ঞানিক অবদান
পাঁচ মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম তলগুলো ছোঁয়ার মিশনে ভেসকোভোর সঙ্গে কাজ করা এবং তার অভিযাত্রাকে পর্যবেক্ষণ করা বিজ্ঞানীরা চল্লিশের অধিক নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। এ ছাড়াও তারা ওই সব গভীরতম অঞ্চলের পানি সংগ্রহ করেছেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য।
মহাসাগরে পরিচালিত অভিযানগুলোতে ভেসকোভোর দলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হলেন যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ের গবেষক ডক্টর অ্যালান জ্যামিয়েসন। তিনি সংগৃহীত পানির লবণাক্ততা, গভীরতম স্থানগুলোর তাপমাত্রাসহ বেশকিছু বিষয়ে তীক্ষè নজর রাখেন। গভীরতম অঞ্চলগুলোর প্রায় ৫০০ ঘণ্টার ভিডিও আছে এখন বৈজ্ঞানিক দলটির কাছে। এ ছাড়াও প্রায় চার লাখ জীববৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে অভিযানগুলোতে। তাদের কাছে এখন ১৫ লাখ মিটার পানির তথ্য ও পরিসংখ্যানও রয়েছে।
জ্যামিয়েসন বলেন, ‘গভীর সমুদ্র বিশেষ করে ছয় কিলোমিটারের অধিক গভীরতা সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমাদের বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না।’
যেভাবে তৈরি হলো ‘ট্রিটন’
সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভেসকোভোর অভিযান। এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে পৌঁছানোর প্রযুক্তিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে মানব সম্প্রদায়। এটি নিশ্চিতভাবেই বলে দেওয়া সম্ভব যে, ভেসকোভোর সাবমেরিন এ ধরনের আরও অভিযান পরিচালনার জন্য পথিকৃত হয়ে থাকবে এবং এ ধরনের আরও সমুদ্রযান তৈরি হবে।
বিশেষ এই সাবমেরিনটি তৈরি করেছে আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে সমুদ্রের যেকোনো গভীরতায় যাওয়ার উপযোগী সাবমেরিন তৈরির দাবি করা হয়েছিল। পরে ভেসকোভো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
প্যাট্রিক লাহির অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে সাবমেরিন ‘ট্রিটন’। লাহি প্রায় এক দশক ধরেই এ ধরনের একটি সাবমেরিন তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তা পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ এটি বানাতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা কিছুতেই জোগাড় করতে পারছিলেন না তিনি। অবশেষে তার অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় ২০১৫ সালে, যখন ভেসকোভোর কাছ থেকে সাবমেরিনটি তৈরির প্রস্তাব করা হয়। সাবমেরিন ‘ট্রিটন’ তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। এই সাবমেরিন পানির ১১ কিলোমিটার গভীরে যেতে সক্ষম! এত গভীরে পৌঁছানোর জন্য একমাত্র সাবমেরিন এখন ‘ট্রিটন’। সাধারণত যেসব সাবমেরিন দেখা যায়, তার বেশিরভাগেরই সাড়ে তিন কিলোমিটারের বেশি গভীরে যাওয়ার সক্ষমতা নেই। ‘ট্রিটন’ ছাড়া বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র চারটি সাবমেরিন রয়েছে যেগুলো ছয় কিলোমিটারের বেশি গভীরে যেতে সক্ষম। তবে এগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের মালিকানাধীন। সম্প্রতি ‘ঝিয়াওলং’ নামে চীনারা একটি সাবমেরিন তৈরি করেছে, যা সাত কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে যেতে সক্ষম। এর আগে প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে যেতে চিত্রপরিচালক জেমস ক্যামরন ‘ডিপ সি চ্যালেঞ্জার’ নামে একটি সাবমেরিন ব্যবহার করেছিলেন, যা ১০ হাজার ৯০৮ মিটার গভীরে পৌঁছেছিল। ডিপ সি চ্যালেঞ্জারও বিশেষভাবে তৈরি একটি জলযান। সমুদ্রের যত গভীরে যাওয়া হয়, পানির চাপ তত বাড়তে থাকে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের মতো গভীর কোনো তলদেশে কোনো জাহাজ ডুবে গেলে প্রচ- চাপে তা কাগজের মতো দুমড়েমুচড়ে যাবে।
ট্রিটন নির্মাণের ক্ষেত্রে এর নকশাকার জন রামসি এবং নির্মাতা লাহি প্রথম থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাদের নির্মিত দুই আসনের সাবমেরিনটি ১৫ ফুট দীর্ঘ এবং ৬.২ ফুট প্রশস্ত। এটি ৩.৫ ইঞ্চি ঘনত্বের শক্তিশালী বিশেষ ইস্পাত দিয়ে তৈরি, যা পানির ১১ কিলোমটার নিচেও প্রচ- চাপে ভচকে যাবে না। এর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভেসকোভোর অভিযান সম্পর্কে লাহি বলেন, ‘আমি মনে করি, ভিক্টরের অভিযান একটি মাইলফলক এবং তিনি যা শুরু করে দিয়েছেন, তাতে আরও অনেকে নিশ্চিতভাবেই অংশ নেবে। ওই সব দুর্গম অঞ্চলে মানুষ আরও বেশি সময় কাটাতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।’
মহাসাগরের তলদেশে যে অভিজ্ঞতা হলো
প্রথম অভিযানের জন্য আটলান্টিক মহাসাগরকেই বেছে নেন ভিক্টর ভেসকোভো। এই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থান হলো ‘পুয়ের্তো রিকো ট্রেঞ্চ’। মূলত গভীরতম এই অঞ্চলটি ক্যারিবিয়ান সাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগরের সীমানায় অবস্থিত। প্রতিধ্বনি প্রযুক্তির সাহায্যে ১৮৭৬ সালে এই অঞ্চলটির গভীরতা পরিমাপ করেছিলেন একজন ব্রিটিশ নাবিক। সে সময় এর গভীরতা অনুমান করা হয়েছিল প্রায় সাত কিলোমিটার। দুটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থল এই ট্রেঞ্চ বা খাদ।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে গভীরতম এই স্থানের তলদেশ ছুঁয়ে দেখতে অভিযান পরিচালনা করেন ভেসকোভো। তার আগে ১৯৬৪ সালে একটি ফরাসী সাবমেরিন ওই খাদে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সমুদ্রের গভীরে যাওয়া লক্ষ্য ছিল না ওই সাবমেরিনে থাকা নাবিকদের। দুর্ঘটনাবশত তারা ৭.৩ কিলোমিটার গভীর খাদে চলে গিয়েছিল। ভেসকোভো এই খাদের ৮ হাজার ৩৭৬ মিটার গভীরে গিয়ে মাটির সন্ধান পান।
ভেসকোভোর দ্বিতীয় অভিযানটি অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। এবার তার লক্ষ্য ছিল সাউদার্ন ওশান বা এন্টার্কটিকা মহাসাগর। এই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থান হলো স্যান্ডউইচ ট্রেঞ্চ। ভেসকোভোই প্রথম মানুষ যিনি স্যান্ডউইচ ট্রেঞ্চের ৭ হাজার ৪৩৪ মিটার গভীরের তলদেশ ঘুরে এসেছেন। এই অভিযানের মধ্য দিয়ে স্যান্ডউইচ ট্রেঞ্চের গভীরতম স্থানটিকে নতুন করে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় চার হাজার মিটার উঁচু একটি পর্বতও।
ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থানের তলদেশেও প্রথম মানুষ হিসেবে গিয়ে হাজির হয়েছেন ভেসকোভো। চলতি বছরের এপ্রিলে সুমাত্রার কাছাকাছি জাভা ট্রেঞ্চে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। এখানে অস্ট্রেলিয়ান-ক্যাপ্রিকর্ন প্লেট ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে চাপা পড়েছে। গভীরতম এই অঞ্চলের তল খুঁজে পেতে ভেসকোভোকে ৭ হাজার ১৯২ মিটার গভীরে যেতে হয়েছে। সবচেয়ে গভীরতম স্থানটির ভিডিও ফুটেজে কিছু নতুন প্রজাতির স্নেইলফিশের সন্ধান পাওয়া গেছে।
ভেসকোভোর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিযানটি ছিল চলতি বছরের মে মাসে। কারণ এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম প্রশান্ত মহাসাগরে। এই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশ ছুঁয়ে ১৯৬০ সালে গড়া মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্য ডন ওয়ালশ এবং জ্যাক পিচার্ডের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন ভেসকোভো। এই অভিযানের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম স্থানে যাওয়া মানুষ এখন ভেসকোভো। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ১০ হাজার ৯২৮ মিটার গভীরে পৌঁছেন তিনি। ওয়ালশ এবং পিচার্ডের তুলনায় যা অন্তত ১৬ মিটার বেশি। এই অভিযানে একবার বিপদের মুখোমুখিও হয়েছেন ভেসকোভো। কারণ পানির গভীরে সাড়ে চার কিলোমিটার যাওয়ার পরই উপরে জাহাজে অবস্থান করা তার দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। প্রচ- শীতল পানির কারণেই এমনটি হয়েছিল। উপরে অবস্থান করা দলটি ভেসকোভোর কথা শুনতে পেলেও ভেসকোভো তাদের কথা শুনতে পারছিলেন না। ভেসকোভো বলেন, ‘আমি আমার যাত্রা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ আমি অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছিলাম।’
এই অভিযানে তিনটি নতুন সামুদ্রিক প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। সমুদ্রের এত গভীরে প্রাণের অস্তিত্ব এক বিস্ময়ই বটে! মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর চ্যালেঞ্জার ডিপ-এ পৌঁছানোর অনুভূতিকে এভারেস্ট বিজয়ের মতো বলেছেন ভেসকোভো। তিনি বলেন, ‘সেখানে পৌঁছে আমি ভাবছিলামÑ ওহ! ঈশ্বর, কী দারুণ এক ঐতিহাসিক ঘটনা এটি। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম স্থানে, এই সাবমেরিনে আমি বসে আছি একা! কী দারুণ এক ব্যাপার, তাই না?’
মারিয়ানা ট্রেঞ্চে পর পর চারটি অভিযান পরিচালনা করেন ভেসকোভো। উদ্দেশ্য ছিল অজানা জল-জীবনকে জানা এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা পাথরের নমুনা সংগ্রহ করা। চারবারের চেষ্টায় তিনি পৌঁছেন সমুদ্রের প্রায় ১০,৯২৮ মিটার গভীরে। ভেসকোভোর দাবি, যেখানে এখনো মানুষের পা পড়েনি, সেখানেও পৌঁছে গেছে প্লাস্টিক। চারবারের অভিযানে একবার টানা চার ঘণ্টা মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে কাটান তিনি। জানান, সেবার লম্বা লম্বা পায়ের চিংড়ি জাতীয় এক ধরনের অদ্ভুত প্রাণী দেখেছেন। প্রায় স্বচ্ছ দেখতে সমুদ্র শসা জাতীয় প্রাণীও দেখেছেন। আরও বেশ কয়েকটি অদ্ভুত প্রাণী নজরে এসেছে তার। তবে তাকে বিষণœ করেছে, এত গভীরতায় ভাঙা ধাতব খণ্ড আর প্লাস্টিকের টুকরোর উপস্থিতি।
ভেসকোভোর সর্বশেষ অভিযানটি ছিল আর্কটিক মহাসাগরে। ২৪ আগস্ট পরিচালিত এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ‘ফাইভ ডিপস এক্সপেডিশন’ মিশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তী গন্তব্য কোথায়
সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, পাঁচ মহাসাগরের গভীরতম স্থান বিজয়ের পর এবার ভিক্টর ভেসকোভোর অভিযান কোথায় পরিচালিত হবে?
এমন প্রশ্নের উত্তর যদি হয়Ñ ‘মহাকাশ’, তবে তা মোটেও অবিশ্বাস্য কোনো ব্যাপার নয়। বলে রাখা ভালো, এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য ভেসকোভো ইতিমধ্যেই পথ হাঁটতে শুরু করেছেন। তিনি বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগও করছেন। সাফল্যের খবরে শুভেচ্ছা জানিয়ে জেমস ক্যামরন তার উদ্দেশে মজা করে বলেছেন, ‘এবার জীবনের আশা বাদ দিয়ে একটা চন্দ্রাভিযান হয়ে যাক।’
মহাকাশ অভিযান সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভেসকোভো বলেন, ‘নাসা সাধারণ মানুষের মহাকাশ ভ্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে, তবে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের দিকে আমার নজর রয়েছে।’
তবে মহাকাশে অভিযান পরিচালনার আগে আগামী বছর সবচেয়ে গভীরতম প্রশান্ত মহাসাগরে আরও বেশ কয়েকটি অভিযান চালাবেন ভেসকোভো। এই অভিযানগুলো মূলত গবেষণা ও জরিপ কাজের জন্য পরিচালিত হবে। পাঁচটি গভীরতম স্থানে ভ্রমণ ছাড়াও তার সাবমেরিনটি ইতিমধ্যেই চল্লিশবার সমুদ্রে ডুব দিয়েছে। জানা গেছে, এই সাবমেরিনটি আরও অন্তত হাজারখানেক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম।