মিসরের পিরামিডের দিকে যখন তাকাই তখন বিস্মিত হয়ে যাই। মাটি থেকে পিরামিডের সুউচ্চ চূড়ায় যখন দৃষ্টি যায়, নিজেকে তখন অনেক বেশি ক্ষুদ্র মনে হয়। বিস্ময়ে ভাবি, প্রকৌশল জ্ঞান অর্জনের তেমন উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি তখন ছিল! কেমন করে সত্তর মণ থেকে চারশ চল্লিশ মণ ওজনের পাথর অত ওপরে তুলেছে। কীভাবেই বা ত্রিকোণ জ্যামিতিক ভিত্তিতে ভারসাম্য ঠিক রেখে সঠিক পরিমাপে ওপরে নিয়ে গেছে। কত নৈপুণ্যে উজ্জ্বল বর্ণে দেয়াল চিত্র এঁকেছে। এখনকার প্রকৌশলীদের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির কতটুকু ছিল চার-পাঁচ হাজার বছর আগের প্রকৌশলীদের হতে। এসব দেখে নিজেদের ক্ষুদ্র ভাবতে ভাবতে একসময় বলতে ইচ্ছে হয় আমরা কতটুকু এগোলাম! প্রায় চার দশক আগে আগ্রায় তাজমহল দেখতে গিয়েছিলাম। মর্মর পাথরের গায়ে উজ্জ্বল লতাপাতা ও ফুলের অলংকরণ। দেখে মনে হলো সম্প্রতি হয়তো সংস্কার করেছে। স্পর্শ করলেই আঙুলে কাঁচা রং লেগে যাবে। জানলাম পাথরে মিনা করা এই ফুল-অলংকরণ অবিকল রয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ বছর ধরে। তখনো মনে হয়েছিল আমরা কতটা এগোলাম!
শিক্ষা নিয়ে নিরীক্ষা তো কম হলো না। ইংরেজি বাংলা নানা মাধ্যমের স্কুলের ছড়াছড়ি। ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য লাইন দিতে হয় অভিভাবকদের। অনেকে রসিকতা করে বলেন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বাবা-মায়েরা কিউ দেন স্কুলে ভর্তির জন্য। প্লে-গ্রুপে শিশুটির যাত্রা শুরু হয় সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই। পরিচিত জন হলে বলি আহা! এই বয়সেই বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন কেন? মা হয়তো হেসে বলেন, পড়া তো নয় প্লে-গ্রুপে যাচ্ছে। স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস তৈরি হোক। তবুও তো শিশুটি ওই বয়সেই বাঁধা পড়ে গেল নিয়মের শৃঙ্খলে। সংকুচিত হয়ে গেল ওর স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ। শিশুশিক্ষা নিয়ে সফল দেশগুলোর দিকে যদি তাকাই বা বিজ্ঞানমনস্ক ব্যাখ্যা শুনি সেখানে বলা হয়, সাড়ে চার বছরের আগে কোনো নামেই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করা যাবে না। প্রায় ছয়শ বছর আগের বাংলার দিকে দৃষ্টি দিই। সুলতান ও সুফিসাধকদের তত্ত্বাবধানে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়। মুসলমান সমাজে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল অনেকটা বাধ্যতামূলক। প্রচলিত ফর্মুলা ছিল সন্তানের বয়স ‘চার বছর চার মাস চার দিন’ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে মৌলবি সাহেব এসে শিশুর শিক্ষার সূচনা করবেন। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘বিসমিল্লাহখানি’। পরবর্তী সময়ে হিন্দু সমাজ এরই অনুকরণে ‘হাতেখড়ি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। ইতিহাসের খেরোখাতায় এসব পড়ে আর আমাদের চারপাশটা দেখে আবারও আমার বলতে ইচ্ছে হলো আমরা কতটা এগোলাম!
মনে করতে পারি একবার এসব চিন্তা বা দুশ্চিন্তা মাথায় ভর করেছিল ৬-৭ বছর আগে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে। প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘পরীক্ষায় পাস নম্বর ৪০ হচ্ছে।’ হেডিং দেখেই নড়েচড়ে বসেছিলাম। যেহেতু শিক্ষকতা আমার পেশা। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। গবেষণায় যুক্ত থাকছি। এনসিটিবি ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের কারিকুলাম প্রণয়ন ও গ্রন্থ রচনার সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। এসব কারণে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতারও সঞ্চয় হয়েছিল। তাই খুব আগ্রহ নিয়েই রিপোর্টটি পড়েছিলাম। পড়ে জীবনান্দের ‘হালভাঙ্গা নাবিকের মত’ হতাশা পেয়ে বসেছিল আমাকে। বুঝেছিলাম সে সময়ে শিক্ষার মান নিয়ে যে কথা উঠেছিল তার মোকাবিলাতে অমন ‘সংস্কার’ প্রয়োজন হয়েছে। বিশেষ করে এসএসসি, এইচএসসির ‘মেধা বিস্ফোরণের’ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিশাল হোঁচট খাওয়াকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গৎবাঁধা বক্তব্য দিয়ে যখন সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, তখন তারা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন যে স্কুল পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। তাই ওদের ‘বেশিক্ষণ পড়ার টেবিলে আটকে রাখতে আগের ৩৩-এর বদলে পাস নম্বর করা হবে ৪০। এইটুকু পড়ে আমার অনুর্বর মাথায় স্পষ্ট হচ্ছিল না পাস নম্বর ৪০ করলেই পড়ার টেবিলে আটকে থাকবে কোন যুক্তিতে। বিশেষ করে বর্তমান বাস্তবতায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের তাবৎ মানুষকে বোকা ভেবে যতই অস্বীকার করুক, দেশের সকল স্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা তখন জানতেন তাদের ওপর অলিখিত আদেশ রয়েছে, খাতায় লেখার গুণগত মান বিচারে নয় দয়া করে পরীক্ষায় বসেছে এবং কিছু লেখার চেষ্টা করেছে, এই কৃতিত্বের কারণেই হাত খুলে নম্বর দিতে হবে। মোটামুটি লাইন মতো উত্তর লিখলে বাটি ভরে নয় ধামা ভরে নম্বর দিতে হবে। কোন সরকারের সময় কত বেশি মেধার বিস্ফোরণ হয়েছে সেটিই ছিল বিচার্য বিষয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাফল্যও নির্ধারিত হবে এই মানদন্ডে। এখন অবশ্য আত্মচৈতন্যে ফিরে এসেছে। ধামাভরা নম্বর দেওয়ার অপতৎপরতা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন বিজ্ঞজনেরা। সে সময় মনে হয়েছিল পাস নম্বর ৩৩ হওয়া আর ৬৬ হওয়ার মধ্যে তফাৎ কি! তাছাড়া চলছে গ্রেডিং পদ্ধতির যুগ। সনাতন পদ্ধতিতে ৬০ ভাগ নম্বর ছিল প্রথম শ্রেণি পাওয়ার যোগ্যতা। এখন ‘এ+’ হচ্ছে ধরে নেওয়া যায় প্রথম শ্রেণি তুল্য। ফলে যেমন মানের লেখায় শিক্ষক ৬০ নম্বর দিতেন একই মানের লেখায় দিচ্ছেন ৮০। তাহলে ৮০ পেতে হবে বলে কি শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত সময় পড়ার টেবিলে বসে থাকতে হয়! মানগত উন্নয়নের কথা না ভেবে পাস নম্বর ৪০ হলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক ৩৩ নম্বর পাওয়ার মতো সমতুল্য লেখাতেই ৪০ দেবেন। পত্রিকার রিপোর্টটির আধাআধি পড়ে অমন সিদ্ধান্তের হেতু নিয়ে ভেবেছিলাম। উত্তর মিলেছিল রিপোর্টটির শেষে এসে। এর কিছুটা আগে শ্রীলঙ্কা ঘুরে এসেছিলেন কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি। দেখে এসেছেন সেখানে পাস নম্বর ৪০। এ কথা জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। ‘বিদেশি মডেল’! সুতরাং লুফে নিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ তথ্যটি জানার পর আমার মনের ফটোপ্লেটে ভেসে উঠল প্রায় ৪০ বছর আগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবেরুনি হলের কথা। আমি ওই হলের ছাত্র ছিলাম। সিরামিক ইটে তৈরি সে সময়ের দৃষ্টিনন্দন হল। কিন্তু সংকটে পড়তাম বর্ষা মৌসুমে। টানা বৃষ্টি হলে চিলেকোঠা দিয়ে পানির ঢল নামত নিচে। কারণ পুরো ছাদ থৈ থৈ পুকুর হয়ে যেত। আমাদের এক শিক্ষক জানিয়েছিলেন এটি নাকি নির্মাণত্রুটি। ছিল শুষ্ক অঞ্চলের শৈলীতে করা ইমারতের নকশা। পছন্দ হওয়ায় এর আদলে নকশা করা হয়েছে। বর্ষাপ্রধান অঞ্চল বিবেচনায় নকশাতে পরিবর্তন আনা হয়নি। তাই ছাদের পানি নেমে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। বিপত্তি হয়েছে এখানেই।
আমরা শ্রীলঙ্কার ৪০ নম্বর দেখলাম পাশাপাশি আমরা শ্রীলঙ্কার শিক্ষা এবং পরীক্ষা পদ্ধতি বিবেচনা করেছিলাম কি না জানা হলো না। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক মান, বেতন কাঠামো, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এসব অনিবার্য বিষয়গুলো সুপারিশে রাখা হয়েছিল কি না তা লেখা হয়নি রিপোর্টটিতে। আরও একটি সিদ্ধান্তের কথা লেখা ছিল রিপোর্টে। বোঝা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে দুজন মাত্র পাস করায় নতুন বোধোদয় হয়েছে। বোঝা গেল সাধারণ ধারার শিক্ষাপদ্ধতিতে শিশুরা ইংরেজিতে কথা না বলতে পারলে এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আরবিতে কথা বলতে না পারলে বিশ্ব চরাচরে অচল হয়ে পড়বে। তাই সাধারণ ধারার স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ নম্বর রাখা হবে ‘স্পোকেন’ ইংরেজির দক্ষতার জন্য আর মাদ্রাসায় ‘স্পোকেন’ আরবির দক্ষতার জন্য। এটি পড়তে পড়তে এরও প্রায় দেড় দশক আগে বেহেশতবাসী আমার এক আত্মীয়ের কথা মনে পড়ল। একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন হেডমাস্টার ছিলেন তিনি। তিনি বলতেন ইংরেজি ভালো না জানলে তাকে তিনি শিক্ষিত বিবেচনা করেন না। আমার মনে দাগ কেটেছিল। পরে যখন জানার ও বোঝার সুযোগ হলো তখন প্রশ্ন দাঁড়াল চীনা, জাপানি, ফরাসি, জার্মান ওরা কি শিক্ষিত নয়। জ্ঞানবিজ্ঞানে কোনো অবদান রাখেনি? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাশিক্ষা কেন্দ্রে জাপানি ভাষা শেখানোর জন্য জাইকা একজন জাপানি তরুণী পাঠিয়েছিল। ও টিএসসির গেস্ট হাউজে থাকত। ভাঙা ভাঙা বাংলা শিখেছিল। ওর ভাষা শেখানোর কাজ এ দিয়েই হয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটি মাঝেমাঝে গল্প করতে আসে আমাদের সঙ্গে। ভাঙা ভাঙা বাংলায় ওর সঙ্গে কথা বলতে হয়। কারণ আমি জাপানি জানি না, আর ও ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। তবে মানছি ইংরেজি জানা এবং ইংরেজিতে কথা বলতে পারা একটি ভালো দিক। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্কুলগুলোতে এই স্পোকেন ইংরেজি শিক্ষার্থীকে শেখাবে কে? সে সময়ের বেতন কাঠামোতে কজন মানসম্মত শিক্ষক আমরা নিয়োগ দিতে পারতাম? একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সাকুল্যে ৬-৭ হাজার টাকা বেতন পেতেন। শহরাঞ্চল বাদ দিলাম মফস্বল শহরেও দুই কক্ষের একটি বেড়ার ঘর ভাড়া নিলেও ৩ হাজার টাকা বেরিয়ে যেত। আর বাকি ৩-৪ হাজার টাকায় সংসার নির্বাহ, বাচ্চাদের স্কুল, পোশাক, চিকিৎসা। সে সময়ের বাজারে একি মানবেতর জীবন নয়! তাহলে কোন মেধাবী কোন আকর্ষণে শিক্ষকতায় আসবেন? বেতন বাড়ার পরও কি বর্তমান বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন এসেছে?
শ্রীলঙ্কার শিক্ষা সম্পর্কিত জ্ঞান নিয়ে যারা এসেছেন বা অন্তত পশ্চিমবঙ্গের খবর যারা রাখেন, নিশ্চয়ই জানেন শুধু মেধাবী ডিগ্রিধারী নন প্রাইমারি স্কুলেও অনেক পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক রয়েছেন সেখানে। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা এতটাই আকর্ষণীয় যে চাকরিটি প্রাইমারি স্কুলে না কলেজে এ নিয়ে খুব একটা ভাবনার অবকাশ নেই কারও। তবু ভালো, এসব উদ্ভট নিরীক্ষা খুব বেশি এগোতে পারেনি। তবে এখনো শিক্ষার মান বৃদ্ধি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সুধীজনরা কথা বলেন। কোনো একটা সংকট তৈরি হলেই আমরা টোটকা দাওয়াই দিতে তৎপর থাকি। গভীর থেকে সংকটটি বোঝার চেষ্টা করি না। সেই মতো প্রতিষেধকের কথাও ভাবতে পারি না। ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে দুদিন পরপরই এক একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকি। এসব পরীক্ষা খুব একটা ফল দেয় না। কারণ অধিকাংশ নিরীক্ষার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে। আমরা বিধায়কদের দয়া করে বাস্তবের উঠোনে নামতে অনুরোধ করব। শিক্ষার মানগত দিকে যে অবক্ষয় হচ্ছে এই সত্যটি মানতে হবে। আমি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই বলব এক কঠিন ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পর যারা ভর্তি হয় তাদের বড় সংখ্যকের শিক্ষাসংক্রান্ত পুঁজি দেখে চমকে যাই। এক দেড় দশক থেকে এই স্খলন স্পষ্ট হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা যে মেধাবী নয় তেমনটি না। স্পষ্ট বোঝা যায় শিক্ষাপদ্ধতি এবং স্কুল ও কলেজের পরিচর্যায় দারুণ ঘাটতি রয়েছে। এই জায়গাগুলো সংশোধন ও পরিমার্জন না করে অন্যসব টোটকা ওষুধ শুধু সংকটই বাড়াবে।
লেখক
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com