বিদেশি বিদ্বেষ দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন সংকট

দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু এ মাসের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্যিক রাজধানী জোহানেসবার্গের মতো বড় শহরে অভিবাসীদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর যানবাহনের ওপর যে মাত্রায় তাণ্ডব চলেছে, তা সম্ভবত নজিরবিহীন। বিদেশিদের দোকানপাটে হামলা, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগ করে একশ্রেণির স্থানীয় মানুষ আক্ষরিক অর্থেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মহাসড়কেও পুড়িয়ে দেওয়া হয় বিদেশি চালকদের চালানো বহু মালবাহী ট্রাক। সহিংসতায় প্রাণ গেছে সব মিলিয়ে অন্তত ১২ জনের। এর আগে গত মার্চেই ডারবানে বিদেশি মালিকানাধীন কিছু ছোট খাবারের দোকানে শ-খানেক লোক হামলা করলে তিনজন নিহত হন। প্রশ্ন উঠেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশি বিদ্বেষ কি তবে বেড়ে চলেছে? পুলিশ এবং রাজনীতিক আর সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অবশ্য এগুলোকে বিদেশি বিদ্বেষের বদলে সাধারণ অপরাধের ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলেছেন, এ দাবির অর্থ তারা পরিস্থিতির কারণে সত্যিই বিব্রত। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বিদেশিদের ওপর যেসব হামলা হয়েছে, তার মূল কারণ যেটিই থাক, দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজে যে বাস্তব কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে অনেকেই একমত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতিই।

দক্ষিণ আফ্রিকার এবারের বিদেশিবিরোধী সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নাড়া দিয়েছে বেশ। বলা হচ্ছে, আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে অগ্রসর আর বড় অর্থনীতির দেশটির ভাবমূর্তিতে বড় একটা দাগ লেগেছে। সব মিলিয়ে আত্ম-অনুসন্ধানের একটা তাগিদও উঠেছে দেশটির কোনো কোনো মহলে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক এমপুমিলেলো এমখাবেলা লিখেছেন, ‘সাংবিধানিক অধিকার আর দায়দায়িত্ব উপলব্ধি করার মতো পরিপূর্ণ রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেনি’ এমন জাতিগোষ্ঠীর মানুষই কেবল স্বদেশি বা বিদেশিদের বিরুদ্ধে এহেন হামলা করতে পারে। তার মতে, বিদেশি বিদ্বেষ দক্ষিণ আফ্রিকার জাতিগঠন প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধাস্বরূপ। বিদেশি ড্রাইভার নিয়োগের প্রতিবাদে স্থানীয় ট্রাকচালকরা ১ সেপ্টেম্বর ধর্মঘট শুরু করার পরের দিন বিদেশিদের দোকানপাটের ওপর হামলা শুরু হয়। স্থানীয় ট্রাকচালকরা মহাসড়ক আটকে দিয়ে বিদেশিদের চালানো অনেক গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কাওয়াজুলু নাটাল প্রদেশে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। প্রসঙ্গত, যে বিদেশিদের ওপর হামলা হয়েছে, তারা মূলত আফ্রিকারই অন্যান্য দেশ থেকে বৈধভাবে কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে আসা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ ইউরোপ-আমেরিকা বা এশিয়ার মানুষ নয়। স্থানীয়দের একটি অভিযোগ, বিদেশিরা তাদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে। সে কথার পেছনে যুক্তি থাকতেও পারে, কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় বেকারত্বের হার এখন প্রায় ২৮ শতাংশ। ১১ বছর আগে শ্রমশক্তির ওপর জরিপ শুরু হওয়ার পর থেকে এটাই বেকারির সর্বোচ্চ হার। দেশটির অর্থনীতির অবস্থা সাম্প্রতিককালে খুব ভালো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিদেশিরা এসে কাজ বাগিয়ে নেবে হোক তারা আফ্রিকারই অন্য দেশের কালো মানুষ তা বেকারত্বের যন্ত্রণায়ক্লিষ্ট সবার ভালো না-ও লাগতে পারে। তবে তার প্রকাশ এই মাত্রার হবে কি না সে অন্য প্রশ্ন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় খুনের হার বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানে। দোকানপাটসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজ বা ডাকাতদের হামলায় ভাগ্যান্বেষণে সে দেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার খবরও মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। সেখানে যে শুধু বাংলাদেশিরাই হামলার শিকার হয় তা নয় নিশ্চয়ই। কিন্তু সংগত কারণেই বাংলাদেশিদের আক্রান্ত হওয়ার খবরই আমরা স্থানীয় গণমাধ্যমে বেশি পাই। সাধারণ পরিস্থিতিতেই খুনের উঁচু হার আফ্রিকার সবচেয়ে উন্নত দেশটির জন্য একটি বড় মাথাব্যথার বিষয়। সেখানে বিদেশিদের ওপর সংগঠিতভাবে বারবার দাঙ্গা কায়দায় আক্রমণ সমস্যার শেকড় যে অনেক গভীরে, সেদিকেই ইঙ্গিত করে। বেকারত্বের সঙ্গে ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত মেলে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি মহল থেকেও। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসকারী বিদেশিদের প্রায় ৭০ শতাংশই প্রতিবেশী জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক ও লেসোথো থেকে আসা। বাকি ৩০ শতাংশ হচ্ছে মালাউয়ি, যুক্তরাজ্য, নামিবিয়া, ইসোয়াতিনি (আগের নাম সোয়াজিল্যান্ড) ভারত ও অন্যান্য দেশের। দক্ষিণ আফ্রিকার মোট জনসংখ্যা পাঁচ কোটির ওপরে। তার মধ্যে অভিবাসীর সংখ্যা ৩৬ লাখের মতো। দেশটির সরকার সুনির্দিষ্টভাবে বিদেশিদের ওপর হামলা বা হুমকির তথ্য সংকলন করে না। তবে আফ্রিকান সেন্টার ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড সোসাইটি (এসিএমএস) নামে একটি বেসরকারি সংস্থা ১৯৯৪ সাল থেকে এ ধরনের হামলার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি পত্রপত্রিকার খবর, আন্দোলনকর্মী, ঘটনার শিকার মানুষ এবং পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। তাদের সংকলিত তথ্য বলছে, সহিংস হামলা সবচেয়ে বেশি হয়েছিল ২০০৮ সালে এবং তারপর ২০১৫ সালে। ২০০৮ সালে দেশজুড়ে শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে হামলার হিড়িক চলে। সেটাই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক সহিংসতা। সেবার ৬০ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছিল। বেশ কয়েক হাজার মানুষ হয় বাস্তুচ্যুত। ২০১৫ সালে বিদেশিদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা বেশির ভাগই ঘটে ডারবান আর জোহানেসবার্গে। হাঙ্গামা থামাতে সেনাবাহিনী পর্যন্ত মোতায়েন করতে হয়েছিল সেবার। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাসহ নেতারা বিদেশিদের ওপর এবারের হামলার কঠোর নিন্দা করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসন বিদায় নেওয়ার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গ প্রাধান্যের অবসানের পর কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে একটি নব্যধনিক শ্রেণি। কিন্তু নানা কারণেই সবার কাছে নতুন করে পাওয়া ‘স্বাধীনতার’ সুফল পৌঁছায়নি। নিম্নবিত্ত বহু নাগরিকের মনে তাই বঞ্চনাজনিত ক্ষোভের ধিকিধিকি আগুন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত মার্চে সরকার বিদেশি অভিবাসীদের নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির এক কর্মসূচি নেয়। বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি দাবি তুলছে সরকার যেন বিদেশিদের বিরুদ্ধে হামলাগুলো যে বিদ্বেষপ্রসূত, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে।

আফ্রিকার যেসব দেশের নাগরিকদের ব্যবসা-বাণিজ্য আক্রান্ত হয়েছে, তার বড় একটি অংশ হচ্ছে নাইজেরিয়ার। আবার আফ্রিকার কয়েকটি দেশে দক্ষিণ আফ্রিকানদের বিরুদ্ধেও পাল্টা হামলা হয়। এসব ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। সে দেশে প্রতিবেশীদের সফর বাতিল আর ভ্রমণ সতর্কতা জারির ঘটনাও ঘটে কয়েকটি। নাইজেরিয়ার এক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আর জাম্বিয়ার ফুটবল দল সফর বাতিল করে। কেপটাউনে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠক বয়কট করে নাইজেরিয়ার সরকার। আঞ্চলিক বৈঠকটিতে সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়েমি ওসিনবাজোর যোগ দেওয়ার কথা ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণের ব্যাপারেও নাগরিকদের সতর্ক করে দেয় নাইজেরিয়া। নাইজেরিয়ার প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক আদাওবি ত্রিসিয়া নোয়াবানিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে তার ভাষায় ‘আফ্রিকার উজ্জ্বল তারকা’ দেশটির জাতিগত সম্প্রীতির ওপর এই কালো ছায়া। সারা আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে অন্যরকম দক্ষিণ আফ্রিকা অনেক দিক থেকেই এগিয়ে ছিল মন্তব্য করে নোয়াবানি এক কলামে লিখেছেন, ‘কিছু দক্ষিণ আফ্রিকান যেন বোকো হারাম আর আল শাবাবকে মিডিয়ার শিরোনাম থেকে সরিয়ে নিজেরা জায়গা করে নেওয়ার পাল্লায় নেমেছে। ...দক্ষিণ আফ্রিকার ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে, তা ঠিক করতে অনেক সময় লাগবে। দক্ষিণ আফ্রিকার ভাই ও বোনরা! আফ্রিকায় স্বাগতম। এখন থেকে আপনারা আমাদেরই মতো।’ ঔপন্যাসিক আদাওবি নোয়াবানিকে ভুল প্রমাণ করাটা দক্ষিণ আফ্রিকানদেরই দায়িত্ব। তবে কাজটা নিঃসন্দেহে সহজ হবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক লেখক