ছাত্ররাজনীতি আমরাও করেছি। ছাত্রদল, ছাত্রলীগের রাজনীতি কাছ থেকে দেখেছি। আমরা যেই সময়ে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম, সেই সময়ে (১৯৮৫-১৯৯৫) বড় বড় ‘ক্যাডার’রা ছাড়া কেউ গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন না। ছাত্রনেতারা হলে থাকতেন, ক্যান্টিনে খেতেন। হল, মধুর ক্যান্টিন, টিএসসসিতে আড্ডা দিতেন। বিকেলে পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশায় সংগঠনের অফিসে যেতেন। কারও চেহারা কিংবা আচরণ দেখে বোঝা যেত না যে ইনি নেতা। নেতাদের হামবড়াই কোনো ভাব ছিল না। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মুশতাক হোসেন ছিলেন ডাকসুর ভিপি-জিএস। কিন্তু তাদের কোনো দামি গাড়ি ছিল না। তারা হেঁটে কিংবা রিকশায় চলাচল করতেন। তবে আমান-খোকনদের আমল থেকে ছাত্রদল নেতাদের কিছু পরিবর্তন আসে। ছাত্রদলের অনেক নেতাই (যারা ছিলেন একইসঙ্গে লিডার এবং ক্যাডার) মোটরসাইকেল, কার, এমনকি মাইক্রোবাসে যাতায়াত শুরু করেন। সেটা ছিল ব্যতিক্রম মাত্র। ছাত্রদলের আগের ব্যাচের নেতা দুদু-রিপনরা ক্যাম্পাসে পায়ে হেঁটে এবং রিকশাতেই ঘুরে বেড়াতেন।
আমাদের সময়ে এমনটাও দেখেছি, বড় সংগঠনের নেতারা কর্মীদের টাকায় চা খেতেন। রিকশাভাড়া নিতেন। এর সংগত কারণও ছিল। তারা নেতা হওয়ার জন্য বাড়তি কোনো টাকা কোথাও থেকে পেতেন না। তখন ছাত্রনেতারা ‘চাঁদাবাজি’ করতেন না। উল্টো সংগঠনের কাজে এখানে-ওখানে যেতে হতো। এতে ব্যয় হতো। ব্যক্তিগত টাকায় সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহ করার কারণে তাদের সব সময় টানাটানির মধ্য দিয়ে যেতে হতো। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, যে যত বড় পদে যেত, সে তত গরিব হয়ে পড়ত। দুয়েকজন বড় ছাত্রনেতাকে চিনতাম, যারা বিভিন্ন বড়লোক বন্ধু বা সংগঠনের সাবেক নেতাদের কাছে রাতের বেলায় ধরনা দিতেন টাকার জন্য। কিন্তু কাজটা করতেন খুব গোপনে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতাও কাজ করত। তবে অনেক প্রাক্তনকে দেখেছি, যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছাত্রনেতাদের পকেটে টাকা গুঁজে দিতেন। সে দেওয়া ছিল একেবারেই নিঃস্বার্থ উপহার, ভালোবাসা, প্রীতি আর শ্রদ্ধার লেনদেন।
সব কিছু পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির ধারাও পাল্টে গেছে। রাজনীতি এবং দেশ থেকে ক্রমেই আদর্শ বিদায় নিতে শুরু করেছে। ছাত্ররাজনীতিও আদর্শহীনতার চর্চায় পরিণত হয়েছে। কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে এখন আর কেউ এসব ছাত্রসংগঠনে নাম লেখান না। কেউ কেউ ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন সিটের জন্য। আর বেশিরভাগ অংশ যুক্ত হন নগদ-নারায়ণের লোভে। ছাত্ররাজনীতি এখন স্রেফ মালপানি কামাবার একটা ব্যবস্থা। আর মালপানি এমনি এমনি আসে না, আনতে হয়। এর উৎস হচ্ছে চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি। এগুলো করতে হলে ক্ষমতা এবং প্রভাব লাগে। এর জন্য চাই ক্ষমতাসীন দলে নাম লেখানো। ক্ষমতাসীন দলে নাম লেখালে যে কেউ চাঁদা দিতে বাধ্য। কোনো বিনিয়োগ ছাড়া উপার্জনের এমন সুন্দর ব্যবস্থা ছেলেমেয়েরা ছাড়বে কেন? তাই অন্য সব সংগঠনের মিছিল ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হলেও ছাত্রলীগের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এর কারণ টাকা। সবাই ছাত্রলীগ করতে চায় কেন? ছাত্রলীগে এত কোন্দল কেন? ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত সংবাদ শিরোনাম হচ্ছেন কেন? অল্পকিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সবাই গাড়ি-বাড়ি ব্যাংক ব্যালান্স করছেন কীভাবে? ছাত্রলীগের নেতা হেলিকপ্টার ভাড়া করে ট্যুরে যান কীভাবে? বিলাসী জীবনযাপন করেন কীভাবে? এর একমাত্র কারণ টাকা। নগদ অর্থ ছাত্রলীগকে এবং একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতিকে গ্রাস করেছে।
বাঘ নাকি একবার নরমাংসের স্বাদ পেলে নরখাদক হয়ে যায়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও টাকার স্বাদ পেয়ে এখন টাকাখেকো হয়ে গেছেন। তাদের অন্তরে এখন টাকা ছাড়া কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী কেবলই ঢাল, আসল মোহ টাকা। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে ছাত্র-অধিকারের কোনো ইস্যু নেই। নেই কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যু। এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ছাত্রলীগে নাম লেখান পদ-পদবির আশায়। এরা এক ধরনের সিন্ডিকেট রাজনীতি করেন। সিন্ডিকেট রাজনীতি হলো ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে অর্থ, সম্পদ, বিত্ত, বৈভব বানানো। তারা ছাত্ররাজনীতির চরিত্রই বদলে দিয়েছেন। এখন ছাত্রনেতারা অনেকেই নিজস্ব গাড়িতে চলাফেরা করেন। এই গাড়ি কেনা বা রক্ষণাবেক্ষণের টাকা তারা কোথায় পান, সে প্রশ্ন কেউ জিজ্ঞেস করেন না। ছাত্রনেতাদের বেশিরভাগেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। এখন হয় তাদের নিজস্ব বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থাকে নয়তো এ ধরনের কোনো বাসায় তারা ভাড়া থাকেন। খালেদা জিয়া ক্ষমতা গ্রহণের পর (১৯৯১ সালে) ব্যাপকভাবে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তারপর থেকেই মূলত ছাত্ররাজনীতি থেকে আদর্শ বিদায় নিতে থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় পুরো দৃশ্যপটেই ছিল ছাত্রদলের টাকা কামানো এবং এর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে হানাহানি। এরপর সেই জায়গাটি নিয়েছে ছাত্রলীগ। সংগঠন দুটির নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে বেআইনি পন্থায় অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নেতাদের বিলাসী জীবন নিয়ে এখন সংগঠনগুলোর ভেতর থেকেই প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে। ছাত্রলীগেরই কিছু কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা তাদের সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। ছাত্রলীগ সভাপতি প্রতি মাসে ৫৫ হাজার টাকা বাসাভাড়া দেন। এ তথ্য যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা একজন ছাত্রলীগ কর্মীর। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের নেতারা নানা জায়গা থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন বলেও অভিযোগ আছে। এই টাকাপয়সার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘাতও বেধে যায়। যখন আদর্শের রাজনীতির জায়গাটি ক্ষমতা ও অর্থের রাজনীতি দখল করে নেয় তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। ছাত্ররাজনীতি থেকে এখন আদর্শ হারিয়ে গেছে। সবাই টাকা আয়ে ব্যস্ত। টাকার জন্যই তারা নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়ায়। সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ ছাত্ররাজনীতিকে পুরোপুরিই গ্রাস করেছে। ষাটের দশকে দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার জন্যই ছাত্ররা রাজনীতিতে আসতেন। আশির দশকেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এখনকার ছাত্রনেতারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতেই রাজনীতিতে জড়ান।
২০০৯ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আর এই সময়ে সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যেসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্ম দিয়েছেন তা সংগঠনটির অতীত গৌরব এবং অর্জনের ওপর কালিমা ফেলেছে। এ সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছেন; জড়িয়েছেন চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে। অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজেও লিপ্ত হয়েছেন তারা। বিরোধীদের হল ও ক্যাম্পাস থেকে বের করে তো দিচ্ছেনই এমনকি শিক্ষকদের ওপরও হামলা করতে ছাড়েননি এই সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। কোথাও কোনো বাধা নেই, প্রতিকার নেই। নেই সাংগঠনিক কোনো উদ্যোগ, প্রশাসনিক কোনো ব্যবস্থা। তবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ছাত্রলীগের সর্বশেষ (শোভন-রাব্বানী) কমিটির মেয়াদে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ছাত্রলীগের এই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ চাঁদাবাজি নিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির তথ্য এখন ফাঁস হয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সেক্রেটারি তার সঙ্গে দেখা করে বরাদ্দের ৪-৬ শতাংশ ঘুষ চেয়েছেন, প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ধমকও দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এসব জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সব শুনে দুঃখ পেয়ে শোভন-রব্বানীকে পদ থেকে অপসারণ করলেন।
পিঠ বাঁচাতে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলাচিঠি লিখেছেন! বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে রাব্বানী দাবি করেছেন, তারা চাঁদা চাননি, বরং উপাচার্য জাবি ছাত্রলীগকে দেড় কোটি ঘুষ দিয়েছেন। রাব্বানীর ভাষ্য মতে, ওই ঘটনা প্রকাশিত হয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য তাদের স্মরণ করেন। তারা দেখা করে তাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। উক্ত পরিস্থিতিতে তারা কিছু কথা বলেন যা সমীচীন হয়নি বলে রাব্বানী চিঠিতে লিখেছেন। এমন ঘুষ এবং চাঁদাবাজির ঘটনা স্বীকার করার পরও ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্ট নেতারা জেলখানার বাইরে থাকেন কীভাবে? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন চাঁদাবাজির পরও সরকার, দুদক, ইউজিসি সবাই চুপচাপ রয়েছে কেন? ছাত্রলীগের এই চাঁদাবাজি আর সিন্ডিকেটের রাজনীতি বন্ধ না করতে পারলে দেশের ছাত্ররাজনীতি কি আর কখনো সুষ্ঠু ধারায় ফিরতে পারবে? লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com