বাজারে পেঁয়াজ-মরিচ-তেল-নুনের দাম ওঠানামার সঙ্গে সাধারণ মানুষের উনুনে হাঁড়ি ওঠানামার একটা প্রত্যক্ষ সম্পর্ক সব সময়ই থাকে। এসব এমন ভোগ্যপণ্য যা প্রতিদিন প্রতিবেলাতেই লাগে। যাদের হাঁড়িতে সহসা মাছ-মাংস ওঠে না, তাদেরও কড়াই কি পাতে দুটো ভর্তা-ভাজিতে পেঁয়াজ-মরিচ-তেল-নুন তো লাগেই। বাজারদরে দু-চার টাকা বাড়লে না হয় দুয়েক বেলায় দু-চারটে পেঁয়াজ কম কাটলেও গরিবের চলে যায়। কিন্তু সাত দিন আগে যে পেঁয়াজের দর ছিল কেজিতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, তা যদি একলাফে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় উঠে যায় তাহলে গরিবের আর উপায় থাকে না। ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি দর প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের বাজারে পেঁয়াজের দামে আগুন ছড়িয়েছে প্রায় রাতারাতি। পাইকারি বাজার থেকে খোলাবাজার কি পাড়ার দোকান সবখানেই একই দশা। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে পেঁয়াজ কাটার ঝাঁজে না, দামের আগুনেই চোখে পানি আসবে কম আয়ের মানুষদের।
ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের দর বাড়ার প্রেক্ষাপটে দেশটির সরকার শুক্রবার পেঁয়াজ রপ্তানির সর্বনি¤œ মূল্য টনপ্রতি ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করার পরই বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারে এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকে পেঁয়াজ উৎপাদন কম হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম ঠিক রাখতে ভারত এ সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নতুন রপ্তানি মূল্য নির্ধারণের আগে, কম দরে খোলা এলসির (ঋণপত্র) বিপরীতে পেঁয়াজ সরবরাহও বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। এদিকে এক দিনের ব্যবধানে শনিবার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের পাইকারি দর কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই দিনে ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তগুলোতে পাইকারি দর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি হওয়া দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে শনিবার ‘ট্রাকসেল’ বা পাইকারদের কাছে আমদানিকারকদের বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকায়। কিন্তু ভারতের নির্ধারিত দরে আমদানি করা পেঁয়াজ এখনো বাজারে না পৌঁছালেও আগের কেনা কম দামের পেঁয়াজেরও দর বাড়িয়ে দিয়েছেন সারা দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের এই অসাধুতা বন্ধ করে বাজার নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আকস্মিক দর বৃদ্ধি ও দেশে পেঁয়াজ সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় শনিবার জরুরি সভা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সভায় দেশের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে টিসিবির মাধ্যমে দ্রুত মিয়ানমার, তুরস্ক, মিসরসহ অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে সোমবার থেকে টিসিবির ন্যায্যমূল্যে ট্রাকসেলের মাধ্যমে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করার কথা। এ ছাড়া পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার হ্রাসে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরে আমদানিকৃত পেঁয়াজের খালাস প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা এবং পরিবহন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংকট মোকাবিলায় সরকারের এমন পদক্ষেপ ইতিবাচক।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের নির্ধারিত দরে পেঁয়াজ আমদানি করলে প্রতিকেজির আমদানি মূল্যই পড়বে ৭২-৭৩ টাকা। এত বেশি দরে আমদানির পর তা বিক্রি করা যাবে কি না, তা নিয়েও আমদানিকারকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ফলে পেঁয়াজ আমদানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণে বিকল্প উৎস থেকে ত্বরিত গতিতে পেঁয়াজ আমদানি করার পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমে বাজারে সরাসরি পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ যথাযথভাবে নিষ্পন্ন করা জরুরি। তবে, এভাবে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ নিশ্চিত করার সম্ভাবনা থাকলেও দাম কমার সম্ভাবনা নেই। এক্ষেত্রে আকস্মিক এই সংকট মোকাবিলায় সরকার পেঁয়াজে সাময়িক ভর্তুকি দিয়ে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে পারে। নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ বা গরিব মানুষেরা এতে সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং আমদানির বিকল্প উৎস নিয়েও মনোযোগী হতে হবে সরকারকে।