বাংলাদেশ বেতারের জন্য ২ কোটি ৩৭ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৩ টাকায় কেনা একটি জেনারেটর ‘খুব অল্প সময়েই’ বিকল হওয়ার সত্যতা পেয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। তদন্তে দরপত্রে নিয়ম না মেনে জেনারেটরটি ক্রয় করাসহ তা রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণও মিলেছে। এ ঘটনায় প্রকল্প পরিচালকসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে দায়ী করেছে কমিটি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রতিবেদন জমার ৬ মাস পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রচার) ও তদন্ত কমিটির সভাপতি পরিতোষ চন্দ্র দাস গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস আগেই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেখানে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও শাস্তির অংশ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে। আমি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে এসেছি। পরে সেখানে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আমার জানা নেই।’ তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ বেতারের ঢাকার ধামরাই স্টেশনের জন্য ২ কোটি ৩৭ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৩ টাকা ব্যয়ে ১৫০০ কেভিএ’র একটি জেনারেটর কেনা হয়। অভিযোগ ওঠে কেনার চারদিনের মাথায় বিকল হয়ে যায় জেনারেটরটি। এরপর অনেক চেষ্টা করেও তা ঠিক করতে করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ঠিক করার নামে যন্ত্রাংশ খুলে রাখা হয়। এছাড়া বার্ষিক অডিটেও চারদিন পর জেনারেটরটি বিকল হওয়ার সত্যতা মেলে। এ অবস্থায় ২০১৮ সালের নভেম্বরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রচার) পরিতোষ চন্দ্র দাসকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রধান প্রকৌশলী কাজী সোলায়মান, তথ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন-১) মো. নায়েব আলী ও বাংলাদেশ বেতারের সিনিয়র প্রকৌশলী আবু তবির মো. জিয়া হাসান। এ কমিটি প্রায় তিন মাস অনুসন্ধানের পর ক্রয়সংক্রান্ত নানা অসংগতির বিষয় উল্লেখ করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তে জেনারেটরটি চারদিন নয়, প্রায় দুই বছর চলেছে- এমন তথ্যউপাত্ত মিলেছে বেতার কেন্দ্রের লগবই যাচাই-বাছাইয়ে। জেনারেটর ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে দরপত্রে সেকশন ৭ প্রতিপালনে অবহেলা করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি মনে করে, এ ঘটনায় সিনিয়র প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. খায়ের (বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, মহাশক্তি প্রেরণ কেন্দ্র, ধামরাই) ও প্রকল্প পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম দায়ী। একই ঘটনায় তৎকালীন জেনারেটর গ্রহণ কমিটির সদস্য (বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী) আহম্মদ কামরুজ্জামান, কেন্দ্রের তৎকালীন উপ-স্টেশন প্রকৌশলী (বর্তমানে স্টেশন প্রকৌশলী, ধামরাই) রণজিৎ কুমার মন্ডল ও সংরক্ষণ অনুবিভাগের তৎকালীন সিনিয়র প্রকৌশলী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ইউনুস আলীও দায়ী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত কমিটি পাঁচজনকে দায়ী করে প্রতিবেদন দিলেও সিনিয়র প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. খায়েরকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. নজরুল ইসলামও স্বপদে বহাল রয়েছেন। আহম্মদ কামরুজ্জামান নামের কর্মকর্তা যিনি তৎকালীন জেনারেটর গ্রহণ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি এখন প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন। রণজিৎ কুমার ম-ল কেন্দ্রের তৎকালীন উপ-স্টেশন প্রকৌশলী হিসেবে থাকলেও বর্তমানে স্টেশন প্রকৌশলীর দায়িত্বে আছেন। উচ্চ পর্যায়ের এ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রচার) নূরুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। সেই তদন্তে কিছু ক্রটি-বিচ্যুতি ছিলÑ তা নিয়ে কাজ চলছে। তাই কাউকে এখনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।