একটি মৌলিক প্রশ্ন ও বিশ্ববিদ্যালয় সমাচার

বলা হয়ে থাকে জগতের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের উদ্ভব কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেÑ কী, কেন, কীভাবে। এজন্য সঠিক প্রশ্ন করতে পারাটা সব সময় জরুরি। আপাত অর্থে খুব সহজ-সরল মনে হলেও এই প্রশ্নগুলোর ওজন যে অনেক তা বিজ্ঞজন মাত্রই জানেন। হয়তো এ কারণেই ফেইসবুক স্ট্যাটাসে এমন একটি প্রশ্ন করার দায়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এক ছাত্রীকে। ঘটনাটি ঘটেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি)। গোপালগঞ্জে অবস্থিত ওই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির এক ছাত্রী ফাতেমা তুজ জিনিয়া ফেইসবুক স্ট্যাটাসে জানতে চেয়েছিলেন, ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত?’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই প্রশ্ন কেন এতটা ভয়ংকর মনে হয়েছে, তা বোধগম্য না হলেও ওই ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। 

 

শুধু তা-ই নয়, ফেইসবুকে এই প্রশ্ন উত্থাপনের কারণে উপাচার্য অধ্যাপক

ড. খোন্দকার মো. নাসিরউদ্দিন যে ভাষায় ওই ছাত্রীকে শাসিয়েছেন তার একটি অডিও ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন আপত্তিকর ভাষায় কথা বলেন তা সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। বশেমুরবিপ্রবির ওই ছাত্রী ডেইলি সান পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যুক্ত। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট’ নিয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন ওই শিক্ষার্থী-সাংবাদিক। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি ফেইসবুকে ওই স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন। এরপর উপাচার্য তাকে ডেকে নিয়ে অত্যন্ত অশালীন ভাষায় বকাঝকা করেন। ওই কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। 

 

কোনো শিক্ষার্থী অপরাধ করে থাকলে যথাযথ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বশেমুরবিপ্রবি প্রশাসন কী অপরাধে, কোন যুক্তিতে ওই ছাত্রীকে বহিষ্কার করেছে তা যেমন বোধগম্য নয়, তেমনি উপাচার্যের অশালীন আচরণও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকারী অধ্যাপক ড. খোন্দকার মো. নাসিরউদ্দিন এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপাচার্যের বাসভবনে বিউটি পার্লার খুলে সংবাদ শিরোনাম হন। এ ছাড়া একাধিক ঘটনায় তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও প্রতারণার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-অধ্যাপক ও উপাচার্যের কাছ থেকে নৈতিকতার যে উচ্চ মান আশা করা হয় এসব ঘটনা তার সঙ্গে কেবল সাংঘর্ষিকই নয়; বরং এমন সব অভিযোগের পর এরকম পদে থাকাটাই অগ্রহণযোগ্য।

 

‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত?’ এই মৌলিক প্রশ্নটি কেন আজ এতটা বিস্ফোরক হয়ে উঠল; তা অনুধাবনের জন্য দেশের খ্যাতনামা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে চোখ বোলানোই যথেষ্ট। বিগত বছরগুলোতে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে হামলা, মামলা, হুমকির শিকার এমনকি গ্রেপ্তারও হতে হয়েছে।  যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাঈদুল ইসলাম। গত বছর একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাসকে ঘিরে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এ প্রসঙ্গে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলাবিধি’ অধ্যাদেশ জারির কথাও স্মরণ করা যেতে পারে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা বশেমুরবিপ্রবির তিনটি ঘটনাতেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে প্রশাসনের দমনপীড়নের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই পরিস্থিতির সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকেও মিলিয়ে দেখা জরুরি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষতি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনোরকম লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই ‘চিরকুটের মাধ্যমে’ ছাত্রনেতাদের ¯œাতকোত্তর কোর্সে ভর্তির অভিযোগ উঠেছে একটি অনুষদের ডিন এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হচ্ছে, আরেকদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্বাধীন মতপ্রকাশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কোনো শিক্ষার্থী যদি জানতে চান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত, তাহলে সেটিকে অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রশ্নই বলতে হবে।