দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে থানায় ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের ঘটনায় পাবনা সদর থানার ওসি ওবাইদুল হককে প্রত্যাহারের পর বেরিয়ে আসছে তার নানা অপকর্মের তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, মাদক কারবারি ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশে মামলার নামে থানায় সালিশ বাণিজ্যই ছিল তার প্রধান কাজ। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা থেকে আসামিদের নাম বাদ দেওয়া এবং নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়ানোসহ নানা অভিযোগ
পাওয়া গেছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এছাড়া পাবনা সদর থানায় প্রায় দুই বছরের দায়িত্বকালে একাধিক মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে থানায় ধরে আনার পর আদালতে হাজির না করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এদিকে রাজশাহীতে স্ত্রীর নামে কেনা আলিশান বাড়িসহ এই পুলিশ কর্মকর্তার বেশ কিছু সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
সদ্য বিদায়ী ওসি ওবাইদুল হকের বেশ কিছু ‘অপকর্মের’ তথ্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন পাবনা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ রাসেল আলী মাসুদ। তিনি বলেন, ‘ওসি ওবাইদুল হক সম্প্রতি পাবনার ভাড়ারা ইউনিয়নের জাসদ নেতা লস্কর খানসহ ডাবল মার্ডার মামলার মতো চাঞ্চল্যকর মামলার অন্যতম প্রধান আসামিকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে এজাহার থেকে নাম বাদ দিয়েছেন। বিষয়টি পাবনায় ওপেন সিক্রেট হলেও কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায়নি।’
এই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, ‘চরঘোষপুরে চাঞ্চল্যকর রফিকুল ইসলাম রফি ম-ল হত্যা মামলার বাদীর ভাই কামরুল ইসলামের কাছ থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে মামলা নথিভুক্ত করেন ওসি ওবাইদুল।’
পাবনা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এবং বৈশাখী টিভি ও দৈনিক সংবাদের পাবনার স্টাফ রিপোর্টার প্রবীণ সাংবাদিক হাবিবুর রহমান স্বপন দেশ রূপান্তরকে জানান, সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে পুলিশের গাফিলতি এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে ওসির সখ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় গত বছরের ১৩ অক্টোবর তার ওপর সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। হামলার আগে সাঁথিয়া উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি তার (সাংবাদিক স্বপন) বাড়িতে গিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ না করতে হুমকি দেয়। কিন্তু এরপরও খবর প্রকাশ করায় তার ওপর হামলা হয়।
সাংবাদিক স্বপন বলেন, ‘ঘটনার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে হামলার সঙ্গে শফিকুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয়ে ওসি ওবাইদুল হকের কাছে বারবার অভিযোগ নিয়ে যাই। কিন্তু ওসি আমার অভিযোগের তোয়াক্কা না করে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে দেন। সম্প্রতি থানায় বিয়ের ঘটনায় ওসি বেকায়দায় পড়লে তাকে বাঁচাতে শফিকুল আবারও সক্রিয় হয় এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মোবাইলে ফোন করে ওসির বিপক্ষে নিউজ না করতে তদবির করতে থাকে। এতেই প্রতীয়মান হয়, অপরাধীদের সঙ্গে ওসির কতটা সখ্য রয়েছে। এছাড়া অন্তত এক ডজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী ওসিকে বাঁচাতে ফেইসবুকসহ বিভিন্নভাবে নানা অপতৎপরতা চালায়।’
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাবনা জেলা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, চলতি বছরের আগস্ট মাসে পৌর এলাকার পাটকিয়াবাড়ি থেকে একাধিক মাদক মামলার আসামি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী কাইল্লা শাহিনকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। কিন্তু পরে তাকে আদালতে হাজির না করে মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দেন ওসি ওবাইদুল। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তার (ওসি ওবাইদুল) বিরুদ্ধে এ ধরনের অসংখ্য অভিযোগ ছিল।’
গত বছরের ২৮ আগস্ট রাতে পাবনার নারী সাংবাদিক সুবর্ণা আক্তার নদীকে তার বাড়ির সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই মামলার আসামি পাবনার শিমলা হাসপাতালের মালিক আবুল হোসেন ও তার ছেলে রাজিবের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উৎকোচ নিয়ে ওসি ওবাইদুল মামলাটি নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত নদীর মা মর্জিনা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওসি নিজে আবুলের টাকার কাছে এই মামলাকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন মামলাটি কী অবস্থায় আছে আমরা আর তা জানি না।’
ওসি ওবাইদুল হক সাংবাদিক নদী হত্যা মামলার আসামি আবুল হোসেনের কাছ থেকে থানার জন্য একটি ৪২ ইঞ্চি টিভি এবং দেড় লাখ টাকা দামের দুই সেট সোফা উপহার নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পাবনা সদর থানা চত্বরের ভেতরের মসজিদ সংস্কারের নামে এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা তুলে সেই টাকার অধিকাংশই লোপাটের অভিযোগ রয়েছে ওসি ওবাইদুলের বিরুদ্ধে। মসজিদ উন্নয়নে থানাপাড়া এলাকার কায়কোবাদ মানিক নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওই টাকা তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র কয়েকজনের টাকায় মসজিদের সংস্কারকাজ করে বাকি অর্থ তিনি আত্মসাৎ করেন বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে।
রাজশাহীতে আলিশান বাড়ি : দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে ওসি ওবাইদুলের বেশ কিছু ধনসম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার ৩ নম্বর সেক্টরে তার রয়েছে স্ত্রীর নামে কেনা একটি দ্বিতল ডুপ্লেক্স বাড়ি। ১৪৫/৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওই বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে আইডিএফ নামে একটি এনজিওর কাছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাড়িটি পুলিশ কর্মকর্তা ওবাইদুল হকের বলেই তারা জানেন। তবে খাতাকলমে এটি তার স্ত্রী সাবিহা সুলতানার নামে। বাড়িটির গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আসে সাবিহা সুলতানার নামে। ভাড়াটেদের ভাড়ার রিসিটও দেওয়া হয় তার নামে। জমিসহ ওসি ওবাইদুলের এই বাড়িটির দাম কোটি টাকার ওপরে বলে এলাকার বাসিন্দা জানিয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি ২৬ লাখ টাকা দিয়ে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি প্রাইভেটকার কিনেছেন ওসি ওবাইদুল। তিনি ৮৪ হাজার টাকা দামের হাতঘড়ি এবং ৪২ হাজার টাকা মূল্যের চশমার ফ্রেমও ব্যবহার করেন।
ওসি ওবাইদুলের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইবনে মিজান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এসব বিষয়ে বেশ কয়েকটি কমিটি তদন্ত করছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর ওবাইদুল হকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন দেশ রূপান্তরের রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আহসান হাবীব অপু।