রুটিন করে ডিসি-এডিসিদের থানার কার্যক্রম তদারকি

রুটিন করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাভুক্ত ৫০টি থানায় উপ-কমিশনার (ডিসি), অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এসিডি) ও সহকারী কমিশনারদের (এসি) দায়িত্ব পালনের বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রতি এ নির্দেশনা দেয় ডিএমপি।

নির্দেশনার পর গতকাল ডিএমপির ৮টি ক্রাইম বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তাদের তাদের আওতাধীন থানায় গিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে। এ সময় তারা ওসিসহ থানার সার্বিক কার্যক্রম তদারকি ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। সংশ্লিষ্ট ওসিরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থানায় আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন।  পুলিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে এ উদ্যোগকে ইতিবাচক বলছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তবে তারা এও বলছেন, পুরো প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো সম্ভব না হলে সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

এ বিষয়ে নবনিযুক্ত ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানার কাজ ওসিরাই করবেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে ২-৩ ঘণ্টা তাদের কার্যক্রম তদারকি করবেন। সেখানে সেবাগ্রহীতারা যাতে হয়রানির শিকার না হন, কাক্সিক্ষত সেবা নিয়ে খুশি মনে ফিরতে পারেন, সেজন্য পদক্ষেপ নেবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘থানাকে জনকল্যাণমুখী করার জন্য আরও কিছু চমক আসছে। শিগগিরই এসব পরিকল্পনা দৃশ্যমান হবে।’

এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় দিনে গত রবিবার ডিএমপি কমিশনার থানার সেবার মান বাড়াতে নিজে ‘ওসিগিরি’ করার কথা জানান। তারপর মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে ওইদিনই সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও জোনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সমন্বয় করে থানায় ওসির জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসে কাজ শুরু করেন। এরপর গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে লিখিত নির্দেশনা আসার পর সংশ্লিষ্টরা কর্মবণ্টন তালিকা (ডিউটি রোস্টার) তৈরি করে থানায় দায়িত্ব পালন করেন।

পুলিশের ধানমণ্ডি জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল্লাহিল কাফি দেশ রূপান্তরকে জানান, নির্দেশনা মোতাবেক তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে হাজারীবাগ থানায় কাজ করেন। এ সময় থানায় আসা লোকজনের অভিযোগ সরাসরি শুনে সেগুলো প্রতিকারের ব্যবস্থা করেন।

রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার এইচএম আজিমুল হক গতকাল মঙ্গলবার শাহবাগ থানায় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, ‘থানায় জিডি, মামলা করতে টাকা লাগেÑ এখন থেকে এ ধরনের আর কোনো কথা উঠবে না। দৈবচয়নের ভিত্তিতে জিডি এবং মামলার বাদী ও সাক্ষীদের সঙ্গে ফোন করে কথা বলব। তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

থানায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ ধরনের তদারকি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ওসিরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওসি বলেন, ‘পিআরবিতে (পুলিশ রেগুলেটরি অব বেঙ্গল) বলা আছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থানায় এলে তিনি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং তাদের দায়িত্ব পালনে আইনগত কোনো সমস্যা দেখছি না।’

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে পুলিশের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তবে পুরো প্রক্রিয়াকে ঢেলে সাজানো না গেলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না বলেও মনে করেন তারা। অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘থানাগুলো সেবা নিশ্চিত করতে পারছে নাÑ পুলিশ প্রশাসনে এই উপলব্ধি আসাটা ইতিবাচক। তবে শুধু ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা মনিটর করলে হবে না, থানার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ, তাদের আচরণ পরিবর্তনে মোটিভেটশনেও জোর দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৮৬৪ সালের পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল-পিআরবিকে ভিত্তি ধরেই চলছে বাংলাদেশ পুলিশ। সেবাধর্মী পুলিশ গড়তে আরও যুগোপযোগী পরিচালন পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে।’

ডিএমপির নির্দেশনায় যা আছে : গতকাল মঙ্গলবার ডিএমপির সব অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ডিসি, এডিসি, এসি ও ওসিদের উদ্দেশে ডিএমপির লিখিত নির্দেশনায় বলা হয়, ডিএমপি জনগণকে আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সেবা দিতে বদ্ধপরিকর। জনসাধারণের প্রত্যাশিত ও প্রাপ্য সেবা দিতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো থানা। জনসাধারণ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ইত্যাদি বিষয়ে নানাবিধ সমস্যাসহ একান্ত নিরুপায় হয়ে আইনের আশ্রয় পাওয়ার জন্য থানার শরণাপন্ন হয়। সাধারণ নাগরিক তথা ভুক্তভোগী বা বিচারপ্রার্থীর অভিযোগ বা অনুযোগ বা যেকোনো তথ্য সঠিকভাবে আমলে নিয়ে যথাযথ পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই অভিযোগ আসে, নিরীহ অসহায় জনসাধারণের বিরাট একটা অংশ থানায় তার প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমলযোগ্য অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ আমলে না নেওয়া, অনাকাক্সিক্ষত কালক্ষেপণ, ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণসহ অনেক সময় অযথা হয়রানিমূলক আচরণের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার সব থানার সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং সেবাপ্রত্যাশীরা কোনো ধরনের হয়রানি বা অসহযোগিতার শিকার না হন, সে জন্য থানার অফিসার ইনচার্জরা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

এতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট জোনাল এসি এবং এডিসিরা সার্বক্ষণিক থাকার কার্যক্রম মনিটরিং করবেন। সংশ্লিষ্ট উপকমিশনার তার অধিক্ষেত্রের প্রতিটি থানায় প্রতি সপ্তাহে অবস্থানের জন্য পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি প্রণয়ন করবেন এবং সে মোতাবেক থানায় কমপক্ষে ২-৩ ঘণ্টা অবস্থান করে থানার বাস্তব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে আইন অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করবেন।