জুনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে বিশ্বসেরাদের পেছনে ফেলে অর্জন করেছিলেন ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার টিকিট। সম্প্রতি ফিলিপাইনে এশিয়া কাপ আসরে স্বর্ণপদক জিতে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন আবারও। তাকে ঘিরে এখন সবার স্বপ্নটা আকাশছোঁয়া। নিজেও পণ করেছেন, খেলা দিয়েই হয়ে থাকতে চান চিরস্মরণীয়। গতকাল সুদীপ্ত আনন্দর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সাফল্য, আগামীর লক্ষ্য নিয়ে অনেক কথাই বললেন দেশসেরা তীরন্দাজ রোমান সানা
জুনে অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন, এবার এশিয়া কাপে স্বর্ণপদক। সব মিলিয়ে দারুণ সময় কাটছে আপনার...
সত্যি তাই। সব জায়গা থেকে বাহবা পাচ্ছি। সহায়তার আশ্বাস পাচ্ছি। এই যেমন বিসিবির সভাপতি পাপন (নাজমুল হাসান) স্যার ফুল আর কেক পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন। এটা আমাকে আরও ভালো করায় উজ্জীবিত করছে।
এশিয়া কাপের দলগত ইভেন্টে স্বর্ণপদক হাতছাড়া হওয়ার কিছু পরই চীনা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এককের ফাইনালে খেলতে হয়। একটু কি চাপ ছিল?
আসলে দলগত ইভেন্টে আমরাও স্বর্ণপদক জিততে পারতাম। খুব টাফ কম্পিটিশন হয়েছিল। শেষ সিরিজে ওদের ১০ মারতে হতো জিততে। ৯ হলে ড্র হতো। এমন পরিস্থিতিতে ১০ মারা খুব কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু ওরা ১০ মেরেই স্বর্ণপদক জিতে যায়। এর পরপরই সেই চীনেরই একজনের সঙ্গে এককের ফাইনালে খেলতে হয়। প্রথম সেট ড্র হওয়ার পর দ্বিতীয় সেট চীনের ও জিতে যায়। তখনো আমি হাল ছাড়িনি। কারণ, একটি সেট জিতলেই তো সমান হয়ে যাবে। কিন্তু আমি পরপর তিনটি সেট জিতে ওকে পেছনে ফেলে দেই। আসলে অভিজ্ঞতায় আমি ওর চেয়ে খানিকটা এগিয়ে ছিলাম বলেও ও শেষদিকে চাপে পড়ে যায়।
অলিম্পিকের আগে এক বছর সময় পাচ্ছেন। কী পরিকল্পনা আপনার?
পরিকল্পনা একটাই, যতটা সম্ভব আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলা। অলিম্পিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর। সেই আসরে সেরা ৬৪ জন তীরন্দাজ খেলবে। সুতরাং লড়াইটাও হবে সেই মানের। এর জন্য প্রস্তুতিটাও চাই সেই পর্যায়ের। আমাকে আরও বেশি পরিশ্রম ও সাধনা করতে হবে এবং বেশি বেশি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে হবে। প্রথম লক্ষ্য থাকবে কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখানো। সেটা হবে অনেক বড় সাফল্য। তা করতে পারলে এরপর যেকোনো কিছু হতে পারে। বলব না পদক জিতে যাব। কারণ অলিম্পিকের একটা পদক পাওয়া স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। তবে দেশকে বিশেষ কিছু দেওয়ার জন্য চেষ্টা থাকবে।
সামনে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং এসএ গেমস আছে। লক্ষ্য কী থাকবে?
এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের কোনো পদক নেই। আমার তিনটি ইভেন্ট থাকবে একক, দলগত এবং মিশ্র দ্বৈত। লক্ষ্য থাকবে যেকোনো একটি ইভেন্টে পদক জেতা। তবে পুরো দল হিসেবে আমাদের লক্ষ্য যেকে নো ইভেন্টের স্বর্ণপদক। আর এসএ গেমসে গতবার স্বর্ণপদক ছিল না। এবার সেই আক্ষেপ ঘোচাতে চাই।
১০ বছর আগে কি ভেবেছিলেন আরচারির মতো একটা অপ্রচলিত খেলা খেলে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন?
এদেশে আরচারির শুরু ২০০৮ সালে। তখনো ভাবিনি যে এই খেলাটা খেলব। একবার খুলনাতে ২০০৮ সালে একটা প্রতিভা অন্বেষণ হয়েছিল। সাবেক খেলোয়াড় সাজ্জাদ ভাই গিয়েছিলেন ট্রেনিং করাতে। খেলাটা দেখে তো আমি অবাক হয়ে যাই। কারণ ছোটবেলায় গুলতি বানিয়ে খেলতাম। নিজে নিজে তীর-ধনুক বানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। কিন্তু এটা যে একটা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত খেলা হতে পারে, সেদিন ট্রেনিং করাতে দেখে বুঝতে পারলাম। তাতে খানিকটা আগ্রহ বাড়ল। এছাড়া আরেকটা বিষয়ও ছিল। ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় পা রাখিনি। সব সময় ভাবতাম, রাজধানী ঢাকা কতই না সুন্দর জায়গা, একবার যদি যেতে পারতাম (হাসি)। আরচারির কল্যাণে ঢাকায় খেলতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় সেটা লুফে নেই। এরপর ২০১০ এসএ গেমসের ক্যাম্পেও আমাকে ডেকেছিল। কিন্তু বাবা-মা এসএসসি পরীক্ষার জন্য আমাকে তখন ছাড়েননি। পরে অবশ্য পরীক্ষা শেষে খেলাটার সঙ্গে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যাই।
আরচারির হাতেখড়িটা কার মাধ্যমে?
সাজ্জাদ ভাই আমাকে খুঁজে বের করে একটা প্ল্যাটফর্ম দিয়েছিলেন। এরপর জাতীয় দলে আসার পর ভারতীয় কোচ নিশিথ দাসের কাছেই মূলত হাতেখড়ি। ছয় বছর ওনার কাছে দীক্ষা নিয়েছি। আর বর্তমান কোচের অধীনে আমি নিজেকে বিশ্বমানে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছি। শুধু একা আমার জন্য নয়, বর্তমান কোচকে পাওয়া সত্যিই আমাদের সবার জন্যই পরম সৌভাগ্যের। তার অধীনে বাছাইপর্বে ক্যারিয়ার সেরা ৬৮১ করেছিলাম এ বছর থাইল্যান্ডে। এখন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে আমি দশম স্থানে। আর বাংলাদেশ বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৩ নম্বরে চলে এসেছে। ব্যক্তিগত র্যাঙ্কিংয়ে লক্ষ্য সেরা চারে চলে আসা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার গণভবনে ডেকে পাঠালেন। আক্ষেপ কি এখন খানিকটা কমেছে?
আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছি, তাদের একটাই চাওয়া থাকে একটু প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বাবা-মাকে একটু শান্তি, সচ্ছলতা দেওয়া। পরিবারকে নিয়ে উজ্জ্বল একটা ভবিষ্যৎ গড়া। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিলেন। সেটা পূরণ হলে আক্ষেপ থাকবে না। আসলে আর্থিক ব্যাকআপ থাকলে খেলার প্রতি পুরো মনোনিবেশ করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার চারটা করে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ ও রৌপ্যপদক আছে। এছাড়া দলগতভাবে সাতটি স্বর্ণপদক জিতেছি। প্রথম বাংলাদেশি তীরন্দাজ হিসেবে অলিম্পিকে নাম লিখিয়েছি, ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে। সব মিলিয়ে এই ১০ বছরে হয়তো আরও আগে থেকেই আমার আর্থিক সংকটটা কেটে যাওয়া উচিত ছিল। ক্রিকেটে দেখেন এক-দুই বছর খেললেই তারা কতটা টাকা পান। আমাদের খেলাটা এদেশে নতুন। তাই হয়তো সেভাবে আলোচনা হয় না আমাদের নিয়ে। অন্তরালেই থেকে যাই। তবে আশা করি সময়টা নিশ্চয়ই পাল্টে যাবে।
খেলা ছাড়ার পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
আমি যখন খেলা শুরু করি, তখন থেকেই একটা স্বপ্ন ছিল বিশ্বের সব আসরে পদক জিতব। সে লক্ষ্য নিয়েই নিজেকে তৈরি করছি। যতদিন খেলব ততদিন লক্ষ্য থাকবে যে এমন একটা কিছু করব, যাতে খেলা ছাড়ার বহুদিন পরও মানুষ আমাকে মনে রাখে।