নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাসিনো থেকে আটক ১৪২, উদ্ধার ২৪ লাখ টাকা ও বিপুল পরিমাণ মদ
বাসা থেকে অবৈধ অস্ত্র ও ৪০০ ইয়াবা উদ্ধার
৪ ক্যাসিনো সিলগালা
রাজধানীর গুলশানের একটি বাসা থেকে প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখ করা যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গতকাল বুধবার বিকেলে র্যাবের একটি দল তার বাসা ঘিরে ফেলে। রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরিয়ে র্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে অস্ত্র ও মাদকসহ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান এবং র্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সরওয়ার-বিন-কাশেম।
এর আগে খালেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানীর ফকিরাপুলে ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে অবৈধ ক্যাসিনো চালানো ও জুয়া খেলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে ১৪২ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ সময় এই ক্যাসিনো থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও বিয়ার জব্দ করা হয়। শাহজাহানপুরের বাসিন্দা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের সভাপতি। গতকালই ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাব, আরামবাগের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্যাসিনো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। র্যাবের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে অন্য ক্লাবেও।
খালেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সরওয়ার-বিন-কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর ফকিরাপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনো ও অবৈধ জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খালেদকে গ্রেপ্তারের সময় একটি অবৈধ অস্ত্র, বেশ কিছু গুলি ও ইয়াবা (৪০০ পিস) উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও বলেন, লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করায় খালেদের দুটি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে গুলশান ২ নম্বরের ৫৯
নম্বর সড়কে খালেদ মাহমুদের বাসা ও ক্লাব ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্সে একযোগে অভিযান চালায় র্যাব। অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী ও গুলশানের বাড়ির ম্যানেজার আরিফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেলা ৩টার সময় (গতকাল) সাদাপোশাকে খালেদের বাসায় একদল লোক যান। তারা বাসায় খালেদ আছেন কি না জানতে চান। সাদাপোশাকে আসা ওই ব্যক্তিরা নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ডিবি পুলিশের কর্মকর্তা পরিচয় দেন। খালেদ বাসায় আছেন নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ওই বাড়িতেই অবস্থান নেন। বিকেল ৪টার কিছু সময় পর বাড়িতে র্যাব ও পুলিশের গাড়ি আসে। আসে দুটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস।
সরেজমিনে দেখা যায়, ওই বাড়ির সামনে র্যাবের চারটি ও পুলিশের দুটি গাড়ি। বাসার বাইরে অস্ত্র হাতে র্যাব সদস্যরা পাহারায় ছিলেন। গুলশান থানা পুলিশ ও র্যাবের কয়েকজন সদস্য খালেদের বাসায় যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা খালেদের ফ্ল্যাটে ভবনের চারতলায় যান। রাত ৮টা ২২ মিনিটের সময় সাদা রঙের কালো কাচে ঢাকা হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে খালেদকে নিয়ে যায় র্যাব। এ সময় বিপুলসংখ্যক সংবাদকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাকে কারও সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। খালেদ মাঝখানের সিটে বসে ভেতরের দিকে মুখ করেছিলেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তার বাসায় তল্লাশি শেষে র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। তারা সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পরে শুধু র্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে একটি খুদে বার্তা দিয়ে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যসহ খালেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়। হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে র্যাব সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ তাকে আদালতে পাঠানো হতে পারে।
বাড়ির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলশানের ৩১০০ বর্গফুটের ওই ফ্ল্যাটে খালেদ চার বছর ধরে আছেন। সেখানে তার স্ত্রী, শাশুড়ি ও দুই ছেলে থাকেন। বাড়ির ম্যানেজার জানান, খালেদের বাসা থেকে দুই প্যাকেটে ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তার বাসা থেকে ১০ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ও প্রায় ৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ মার্কিন ডলার উদ্ধার করা হয়। বাড়ির ম্যানেজার জানান, র্যাব সদস্যরা সব কটি কক্ষ ও প্রতিটি আসবাব তল্লাশি করেন। সেখান থেকে লাইসেন্স করা একটি শটগান ও একটি পিস্তল পাওয়া যায়। এর বাইরে একটি অবৈধ অস্ত্র পাওয়া যায়।
তিন মামলার প্রস্তুতি : র্যাবের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, খালেদের বিরুদ্ধে গতকাল রাতেই তিনটি মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করা হবে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ও অস্ত্রের লাইসেন্স ভঙ্গ করার দায়ে আরও দুটি মামলা করা হবে। এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
খালেদের ক্যাসিনোতে অভিযান : গতকাল বিকেলে ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান শুরু করেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, অবৈধভাবে জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে কয়েকজন নারীসহ মোট ১৪২ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে কয়েকটি অস্ত্র, বেশ কিছু মোবাইল ফোন, জুয়া খেলার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ইয়ংমেন্স ক্লাবে ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট, তিন তাস, নয় তাস, কাটাকাটি, নিপুণ, ডায়েস, চরকি রামিসহ নানা ধরনের জুয়া খেলা হতো। মতিঝিল থানাসংলগ্ন ক্লাব ভবনটিতে অনুমোদনবিহীনভাবে মদ বিক্রি ও পরিবেশন করা হতো। ২৪ ঘণ্টা আরামবাগ ফকিরাপুলের এই ক্লাবে জুয়ার আসর চলে। জুয়ার বোর্ড থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় আয়োজকচক্র। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে এসব জুয়ার আসর ও ক্লাব চালানো হতো। আর এসব নিয়ন্ত্রণ করতেন খালেদ মাহমুদ, এলাকার কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদসহ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা।
১৪২ জনকে সাজা : ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে আটক ১৪২ জনকেই সাজা দিয়েছে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাদের মধ্যে ক্লাবটির ১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৩১ জনকে এক বছরের কারাদণ্ড ও অন্য ১১১ জনের প্রত্যেককে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা দোষ স্বীকার করায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম এই সাজা দেন। তিনি জানান, মদ, বিয়ার, ইয়াবা ও জুয়া খেলার টাকাসহ ১০টি বাকারার জুয়া খেলার টেবিল, ৬টি ইলেকট্রনিক মেশিন ও ডিজিটাল মেশিন জব্দ করা হয়।
ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সিলগালা : এদিকে রাত সোয়া ১০টায় র্যাব জানিয়েছে, আরামবাগের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে র্যাব অভিযান পরিচালনা করেছে। সেখানে জাল টাকা, বিপুল পরিমাণ মাদক (ইয়াবা), মদ, টাকা ও ক্যাসিনো সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। র্যাব-৩-এর অধিনায়ক দেশ রূপান্তরকে অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সেখান থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার সমপরিমাণ জাল নোট ও বেশ কিছু স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, জুয়াড়িরা খেলার জন্য স্বর্ণের গয়না বন্ধক রাখত। এসব স্বর্ণালঙ্কার ওই সব জুয়াড়ির বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযানে অংশ নেওয়া এক র্যাব সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অনুমোদনবিহীন মদ ও বিয়ার বিক্রি হচ্ছিল। বার হিসেবে নিবন্ধন না থাকার পরও ক্লাবের ছোট-বড় কক্ষগুলোতে এসব সরবরাহ করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের ক্যাসিনো সিলগালা : রাত পৌনে ১১টায় র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সিলগালা করার পর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের অবৈধ ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। সেখানেও অবৈধ ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে কয়েকজনকে সাজা ও ক্লাবটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে মদ, হেরোইন, নগদ টাকা ও কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার করা হয়।
বনানীর গোল্ডেন ঢাকা ক্যাসিনো সিলগালা : এদিকে রাত সাড়ে ৯টায় র্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীর বনানীতে আহম্মেদ টাওয়ারে গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামে একটি ক্যাসিনো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। র্যাব-১-এর একটি দল ক্যাসিনো সিলগালা করে। সেখান থেকে কাউকে আটকের বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। র্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সরওয়ার-বিন-কাশেম গোল্ডেন ঢাকা ক্যাসিনোটি সিলগালা করার খবর নিশ্চিত করেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রাত সাড়ে ৯টায় সেখানে অভিযান চলছিল।
আরও ক্লাবে অভিযান : এদিকে রাতে র্যাব সদস্যরা আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, ডিআইটিএস ক্লাব, আজাদ বয়েজ ক্লাব, বিজি প্রেস স্পোর্টিং ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। রাত ১১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অভিযান চলছিল। এ ছাড়া পুরানা পল্টন ও সেগুনবাগিচা এলাকায় যুবলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাসিনোগুলোতে র্যাবের অভিযান চালানোর কথা রয়েছে।
খালেদের উত্থান : খালেদ মাহমুদ শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনির বাসিন্দা। তার বেড়ে ওঠা সেখানেই। তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত ল্যাংড়া খালেদ হিসেবে। একসময় তিনি বিএনপির সমর্থক ছিলেন। ছিলেন মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই মির্জা খোকনের সহযোগী। ওই সময় তার মূল কাজ ছিল খিলগাঁও কাঁচাবাজার ও শাহজাহানপুর এলাকার নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাঁদা তুলে ভারতে পলাতক পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের কাছে পাঠানো। এখনো মানিকের সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদ রাতারাতি আওয়ামী লীগার বনে যান। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বিশাল শোডাউনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগে প্রবেশ করেন খালেদ। দলের সাধারণ সদস্য পদ না থাকলেও মোটা টাকার বিনিময়ে সরাসরি মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। ২০১৪ সালে যুবলীগের আরেক নেতা মিল্কি হত্যাকা-ের পর ক্রসফায়ারে নিহত হন ঘাতক যুবলীগ নেতা তারেক। বিদেশে পাড়ি জমান যুবলীগ উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল। এই সুযোগে যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতা ও দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সখ্য বাড়িয়ে রেলওয়ে, ক্রীড়া পরিষদ, কৃষি ভবন, রাজউক ও পিডব্লিউডির ইএম ডিভিশনের টেন্ডারবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেন খালেদ। গড়ে তোলেন বিশাল ক্যাডার বাহিনী। যুবলীগ নেতা রিয়াজ মিল্কি ও তারেক নিহত হওয়ার পর পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন খালেদ। ২০১২ সালের পর মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের প্রভাবশালী এক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ঢাকার এক অংশের নিয়ন্ত্রণ আসে তার হাতে। তিনি সিন্ডিকেট ও যুবলীগের নাম ব্যবহার করে রেলওয়ে ভবনে ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ নেন। মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুলের ১৭টি ক্লাব তার নিয়ন্ত্রণে।
যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজির পাশাপাশি ক্লাবপাড়ার জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করেন। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, এই খাত থেকে প্রতিদিন চাঁদা আসে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। টাকার ভাগ যুবলীগের বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে যায়।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ আরও বলেন, তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের টেন্ডারবাজি ও মাদক বাণিজ্য। এসব নিয়ন্ত্রণে তার রয়েছে বিশাল অস্ত্রবাজ ক্যাডার বাহিনী। ক্যাডার বাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলার সচিত্র গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখেই ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
খালেদের টেন্ডারবাজ সিন্ডিকেটের সদস্য যারা : খালেদের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত যুবদলের সাবেক নেতা কিসলু। সব ধরনের কাজের পরামর্শদাতা তিনি। খালেদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ক্রিস্টাল ডবল মার্ডার মামলার আসামি রামপুরার রইসউদ্দিন রইস। ২০১১ সালে কারাগার থেকে বেরিয়েই খালেদের সিন্ডিকেটে যোগ দেন। আরেক সদস্য যুবলীগের সহসম্পাদক অংকুরও তার অন্যতম সহযোগী।
খালেদের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, মাদক স্বর্গরাজ্য, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য খালেদেরও রয়েছে বিশাল সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। এ বাহিনীর প্রায় সবাই দামি মোটরসাইকেলে চলাফেরা করে। এমনকি খালেদ যখন কোথাও যান, তখন তার কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির পেছনে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে চলে এসব ক্যাডার।
খালেদের আন্ডারওয়ার্ল্ড সম্পর্ক : একাধিক সূত্র জানায়, ভারতে পলাতক পুরস্কারঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের সঙ্গে সম্পর্কে ভাঙন ধরার পর তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুবাইয়ে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের। তার সহযোগিতায় খালেদ টেন্ডারবাজিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। টেন্ডারবাজির টাকার ভাগ নিয়মিত জিসানকে পাঠাতেন খালেদ। কিন্তু ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দুজনের সম্পর্ক খারাপ হলে জিসানের কাছ থেকে সরে আসেন খালেদ। একপর্যায়ে মোটা টাকা খরচ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জিসানের বেশ কিছু ক্যাডার ধরিয়ে দেন তিনি। বেশ কয়েকজন ক্রসফায়ারে নিহত হয়। এরপর মুখোমুখি চলে যান জিসান ও খালেদ। তখন নিজের নিরাপত্তা বাড়াতেই অস্ত্র উঁচিয়ে চলতে থাকেন খালেদ ও তার ক্যাডাররা। তখন খালেদের আন্ডারওয়ার্ল্ড ঘনিষ্ঠতা প্রমাণে সিঙ্গাপুরের অভিজাত হোটেল মেরিনা বের সুইমিংপুলে জিসান ও খালেদের সাঁতার কাটার ছবি দিয়ে করা পোস্টারে ছেয়ে যায় নগরী। থাইল্যান্ডে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী নবীউল্লাহ নবীর সঙ্গেও রয়েছে খালেদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
খালেদের হাতে আলাদিনের চেরাগ : আন্ডারওয়ার্ল্ড ও খালেদের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, থাইল্যান্ডে পলাতক মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী নবীউল্লাহ নবী খালেদের ব্যবসায়িক অংশীদার। ব্যাংককে একটি টু-স্টার মানের হোটেল ও পাতায়ায় ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে খালেদের। এসব দেখভাল করেন নবী।