ডেঙ্গুতে পুরুষ আক্রান্ত বেশি মৃত্যুতে নারীর সমান

এ বছর ডেঙ্গুতে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হলেও নারী ও পুরুষের মৃত্যুর সংখ্যা সমান। গতকাল বুধবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে ৬৮ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে, এদের মধ্যে অর্ধেক নারী ও অর্ধেক পুরুষ। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৬৩ শতাংশই পুরুষ। বাকি ৩৭ শতাংশ নারী।

ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে ১০ মাস বয়স থেকে শুরু করে ১২ বছর বয়সের মধ্যে মোট ২২ জন শিশুও রয়েছে। এদের মধ্যে কন্যাশিশুর সংখ্যা ১০ জন ও ছেলেশিশুর সংখ্যা ১২ জন। এ সংখ্যা মোট মৃত্যুর ৩২ শতাংশ।

আক্রান্ত কম হলেও নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি কেন জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার মোট আক্রান্তের

এক-তৃতীয়াংশ নারী। অথচ তাদের মৃত্যুর হার পুরুষের সমান। কারণ আমাদের দেশে সামাজিক কারণেই সাধারণত মেয়েরা দেরিতে হাসপাতালে আসে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। মেয়েরা দেরিতে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে জটিলতা বেশি ধরা পড়েছে। শেষ মুহূর্তে বাঁচানো যায়নি। আমরা তিনজনের মতো গর্ভবতী নারীকেও পেয়েছি। তাদের শরীরে নানা জটিলতা

 

তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া আমাদের দেশের মেয়েরা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও আমাদের পুরুষদের তুলনায় কম। এসব কারণেই আক্রান্ত কম হলেও মৃত্যুটা বেড়েছে।

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি আক্রান্তদের মধ্যে যেসব নারী রোগীর জটিলতা বেশি দেখা দিয়েছে, তারাই হাসপাতালে এসেছে। তারা বাড়িতেই জটিলতা সৃষ্টি করেছে।

আইইডিসিআর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু সন্দেহে ২০৩টি মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে ১১৬টি মৃত্যু পর্যালোচনা করে ৬৮টি মৃত্যু ডেঙ্গুজনিত বলে নিশ্চিত করেছে।

আইইডিসিআরের মৃত্যু প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া নারীদের গড় বয়স ২৯ বছর ও পুরুষের ২৪ বছর। বিভিন্ন বয়সী রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ০-৩০ বছর বয়সী রোগীরা। এ সংখ্যা ৪৩ জন যা মোট মৃত্যুর ৬৩ শতাংশ। এরপরই বেশি মারা গেছেন ৩১-৫০ বছর বয়সী রোগী। এ সংখ্যা ১৬ জন, যা মোট মৃত্যুর ২৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম মারা গেছেন ৫০ বছরের বেশি বয়সী রোগী। এ সংখ্যা ৯ জন, যা মোট মৃত্যুর ১৩ শতাংশ।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে, ১০ জন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল ও অ্যাপোলো হাসপাতালে ৫ জন করে রোগী মারা গেছেন। এসব হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও ছিল বেশি। তবে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকলেও সেখানে মারা গেছেন অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় কম, ৪ জন। এছাড়া ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৪ জন, পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে ৩ জন ও গে-ারিয়ার আসগর আলী হাসপাতালে ৩ জন মারা গেছেন।

আইইডিসিআরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গতকাল বুধবার পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৯৯০ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৬৩ শতাংশ ও নারী ৩৭ শতাংশ। আক্রান্তদের ২৮ শতাংশেরই বয়স ১৫-২৫ বছর। ২১ শতাংশ রোগীর বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে। ৫-১৫ বছর বয়সী রোগীর সংখ্যা ১৭ শতাংশ।

সে হিসাবে ৫-৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত রোগী সবচেয়ে বেশি বলে জানান ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, এরা হচ্ছে মোটামুটি ৭০ শতাংশের বেশি। এই গ্রুপটাই অ্যাকটিভ গ্রুপ। এদের মধ্যে আবার বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ৫-২৫ বছর বয়সী ছেলেমেয়েরা। কারণ এরা শিক্ষার্থী। স্কুল-কলেজে যায়। অর্থাৎ স্কুল ও অফিসগামী মানুষই ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

এরপর ধারাবাহিকভাবে যে বয়সের রোগী পাওয়া গেছে, তা হলো ৩৫-৪৫ বছর ১১ শতাংশ, ৪৫-৫৫ বছর ৮ শতাংশ, ৫৫-৬৫ বছর ৪ শতাংশ। ১-৫ বছর ও ৬৫ বছর বয়সের বেশি রোগীর সংখ্যা যথাক্রমে ৭ শতাংশ ও ২ শতাংশ। ০-১ বছর বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হার মাত্র ১ শতাংশ।

আইইডিসিআর আরও বলছে, মোট আক্রান্তের মধ্যে ১৮ বছর বয়সের বেশি রোগীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশ ও ১৮ বছরের নিচে ৩২ শতাংশ।

আক্রান্তদের পেশাগত তথ্যও বের করেছে আইইডিসিআর। সে তথ্য অনুযায়ী এবার ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের ৩৭ শতাংশ করে শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবী। এছাড়া গৃহিণীর সংখ্যা ১৩ শতাংশ, ব্যবসায়ী ৫ শতাংশ ও অন্যান্য পেশার ৮ শতাংশ।

এর কারণ হিসেবে অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীর বেশি আক্রান্ত হওয়ার মানে হচ্ছে তাদের স্কুল-কলেজে ও কর্মস্থলে মশা কামড়িয়েছে। তার মানে এসব স্থানে এখনো মশা আছে। নিধন হয়নি। যদি তা না হতো তাহলে বাড়িতে গৃহিণীরা বেশি আক্রান্ত হতেন। 

বয়স অনুপাতে নারী-পুরুষের সংখ্যাও নিরূপণ করেছে আইইডিসিআর। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এক বছর বয়সের নিচে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ৬২ শতাংশ ও নারী ৩৮ শতাংশ, ১-৫ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে পুরুষ ৫৪ শতাংশ ও নারী ৪৬ শতাংশ, ৫-১৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৫৮ শতাংশ ও নারী ৪২ শতাংশ, ১৫-২৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৭০ শতাংশ ও নারী ৩০ শতাংশ, ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৬৬ শতাংশ ও নারী ৩৪ শতাংশ, ৩৫-৪৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৬০ শতাংশ ও নারী ৪০ শতাংশ, ৪৫-৫৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৫৬ শতাংশ ও নারী ৪৪ শতাংশ, ৫৫-৬৫ বছরের মধ্যে পুরুষ ৫৭ শতাংশ ও নারী ৪৩ শতাংশ এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে পুরুষ ৫৬ শতাংশ ও নারী ৪৪ শতাংশ।