বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট পালন

পরিবর্তন মোকাবিলায় ঢাকায় হাজারো শিশুর সমাবেশ

জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সম্প্রতি বৈশ্বিক ধর্মঘটের ডাক দেয় বিভিন্ন দেশের পরিবেশবাদী সংগঠন ও অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। এই ডাকের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সমাবেশ করে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। শুক্রবার বিশ্বের ১৩৯টি দেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ডাক দিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার অনুষ্ঠান হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করে পৃথিবীকে রক্ষায় আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের হাজারো শিশু। গতকাল জাতীয় সংসদের সামনে এক সমাবেশে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এই আহ্বান জানায়। একই দিন এই বিষয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করে জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকটি সংগঠন। শিশুদের সমাবেশে গ্রিন হাউজ গ্যাস বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও এর প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়।

সমাবেশে পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরাও অংশ নেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ধনী দেশগুলোর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু ও পরিবেশগত নানা বৈরী আচরণ দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব রোধ করতে না পারলে পৃথিবী বাসযোগ্য থাকবে না। বৈশ্বিক উষ্ণতা ঠেকাতে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। 

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, আগামীর পৃথিবী শিশুদের জন্য। তাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলবার অধিকার অবশ্যই শিশুদের রয়েছে। বাংলাদেশের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৃহৎ বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে সচেতন হয়েছে, যা সত্যিই অসামান্য ব্যাপার।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি র‌্যালিতে অংশ নেয় শিশুরা। র‌্যালি শেষে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষায় শপথ নেয় তারা। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশি শিশুরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

শিশু-কিশোর নেটওয়ার্ক ন্যাশনাল চিলড্রেন্স টাস্কফোর্স, গার্লস গাইড এবং রোভার স্কাউটের নেতৃত্বে ও ব্যবস্থাপনায় শিশুদের এ কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করছে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ এবং গ্রিন স্যাভার্স অ্যাসোসিয়েশন। ১৬ বছর বয়সী গ্রেটা থুনবার্গ একজন জলবায়ু কর্মী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিবাদ জানিয়ে ২০১৮ সালের আগস্টে সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর দ্য ক্লাইমেট’ লিখিত একটি প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতি শুক্রবার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরে এই আন্দোলন নিয়ে তিনি বিভিন্ন প্লাটফর্মে কথা বলতে শুরু করেন। এর নামকরণ করেন ‘ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’। সারা বিশ্বে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এই আন্দোলন।

জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিচার্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, কোস্ট ট্রাস্ট, নেটওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বাংলাদেশ, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি এবং কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ। এতে পরিবেশকর্মীরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান সময়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ দায়ভার মানবজাতির। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই আলোচনা-পর্যালোচনা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে ভাবছে। তবে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘদিন পর্যন্ত উপেক্ষিত। বক্তারা বলেন, আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবীর জন্য বিশ্বের গড় উষ্ণায়ন প্রাক শিল্পায়ন যুগের পর্যায় থেকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করে ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো। অথচ চার বছর অতিক্রম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে গতকাল প্রায় ১১ লাখ শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ীদের করণীয় প্রশ্নে দাবি তোলেন। নিউইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও এক টুইটবার্তায় শিক্ষার্থীদের সমর্থন দিয়ে বলেন, ‘আমাদের তরুণদের পাশে আছে নিউইয়র্ক শহর। ওরাই আমাদের সচেতন অংশ।’

প্রতিবেশী দেশ ভারতের মুম্বাইয়ের কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে র‌্যালি করে শিক্ষার্থীরা। অধিকারবিষয়ক আন্দোলনকারী পূজা দোমাদিয়া সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা জানি জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা কতটা প্রকট। এটা এখন আর কোনো বিশ্বাস বা কল্পিত বিষয় নয়। এই সপ্তাহে আমরা আরও কয়েকটি ইভেন্ট করতে যাচ্ছি, যাতে আমাদের নেতারা ও কর্র্তৃপক্ষ জরুরি অবস্থাটা বুঝতে পারে। কম কথা বলে অধিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন। আমাদের অপেক্ষা করলে চলবে না।’

তবে সবচেয়ে বড় র‌্যালিটি হয় অস্ট্রেলিয়ায়। দেশটির মেলবোর্নের রাস্তায় দশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অধিকারকর্মীরা জড়ো হয়। র‌্যালি থেকে তারা ক্ষমতাসীন নেতৃত্বকে পরিবেশ দূষণ রোধে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এ ছাড়া লন্ডন, প্যারিস, কেপটাউন, ম্যানিলা, সিউলসহ অন্য অনেক শহরে এই র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। চলতি সপ্তাহ জুড়েই বিভিন্ন শহরে চলবে জলবায়ু পরিবর্তনরোধী সমাবেশ।