রোমান সাম্রাজ্য প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। এত বছর পরও পৃথিবী তাদের দেওয়া অনেক অবদান ভুলতে পারেনি। আধুনিক অনেক প্রযুক্তিই প্রাচীন রোম থেকে পাওয়া। কৃষি থেকে শুরু করে বিনোদন সব জায়গাতেই রোমানদের ঐতিহ্য, জ্ঞান আর ডিজাইন ব্যবহার করা হচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। আরফাতুন নাবিলা লিখেছেন আধুনিক সভ্যতায় কিছু রোমান অবদানের কথা
প্রবেশদ্বার
প্রবেশদ্বার তৈরি করেছিল গ্রিকরা। কিন্তু প্রবেশদ্বারকে উন্নত করেছিল রোমানরা। গ্রিকরা কিছু স্থাপত্য বেশ নিষ্ঠার সঙ্গে তৈরি করলেও, সেগুলোকে পরবর্তী সময়ে জ্ঞান আর টেকনোলজি দিয়ে উন্নত করায় মনোনিবেশ করে রোমানরা। তাদের প্রবেশদ্বার তৈরির উন্নত পদ্ধতি অনুসরণ করে, পরে সহজে ভাঙবে না এমনভাবে তৈরি করা হয় বিভিন্ন নালা, রাজপ্রাসাদ ও গ্যালারি। এই পদ্ধতিগুলো যে শুধু বছরের পর বছর ধরেই ব্যবহার হচ্ছিল তাই নয়, সেই সময়ের কিছু কিছু পদ্ধতি এখনো ব্যবহার করা হয়।
রোমান প্রজাতন্ত্র
রোম একটি বিশাল সাম্রাজ্য হওয়ার আগে, এটি প্রধানত ইতালীয় পেনিনসুলায় একটি উদীয়মান প্রজাতন্ত্র হিসেবে ছিল, যেখানে দুজন নির্বাচিত নেতা ছিলেন, যাদের একজন রাষ্ট্রপ্রধান এবং অপরজন নির্বাচিত সিনেট প্রধান হিসেবে কাজ করতেন। সেই যুগকে বলা হয় রোমের রিপাবলিকান অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের যুগ। বেশ কিছু দেশে রাজাদের শাসনামল থাকার পরও এই পদ্ধতি চালু ছিল। অনেক বছর পর, তাদের তৈরি এই পদ্ধতিটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যরা গ্রহণ করে। রোমে প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ৫০০ বছর। আর রাজতন্ত্র বিরাজমান ছিল পরবর্তী ১৫০০ বছর। সব মিলিয়ে এই দুই সহস্রাব্দে মানব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান জুড়ে ছিল রোমান সাম্রাজ্য, যার ফলাফল এই আধুনিক যুগে এখনো রয়ে গেছে।
কংক্রিট
দীর্ঘ সময় টিকে থাকার জন্য রোমানরা খুব ভালো মানের কংক্রিট বানাতে পারত। বর্তমানে ব্যবহৃত কংক্রিটগুলো পঞ্চাশ বা এর কাছাকাছি সময়ে গেলেই দুর্বল হয়ে ভেঙে যায়। কিন্তু রোমানদের তৈরি করা কংক্রিটগুলোর স্থায়িত্ব ছিল অনেক বেশি। রোমান স্থপতি মারকিউস ভিত্রুভিয়াস এই শক্তিশালী কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহার করেছিলেন আগ্নেয় ছাই, সমুদ্রের পানি আর চুন। এই তিনটি জিনিসের মিশ্রণ একসঙ্গে করে সেগুলো সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো আগ্নেয়গিরির পাথরের সঙ্গে। দশ বছর পর, এই কংক্রিট থেকে অ্যালুমিনিয়াম টারবোমোরাইট নামে একটি দুর্লভ খনিজ তৈরি হয়, যা এই কংক্রিটের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিনোদন
রোমানরা বিনোদন খুব ভালোবাসত। তারা বিশ্বাস করত বিনোদন তাদের নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। রোমান সম্রাট আর রাষ্ট্রপ্রধানরা বিনোদন-সংক্রান্ত জিনিস বিনামূল্যে বিতরণ করতেন। রথযাত্রা, মল্লযুদ্ধ, থিয়েটারে নাটক প্রদর্শন সবই ছিল রোমান সমাজে বিনোদন উপভোগ করার প্রধান উপায়। এখনো সেগুলোর প্রতি ভালোবাসা মানুষের রয়ে গেছে।
সড়ক ও জনপথ
যখন রোমানরা বুঝতে পারল যে মসৃণ রাস্তা তাদের সৈন্যদল আর সাম্রাজ্যকে বেশ সুবিধা দিচ্ছে, তখন তারা তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত অসংখ্য রাস্তা পাকা করে ফেলল। ৭০০ বছর ধরে, পুরো ইউরোপে ৫৫ হাজার মাইল রাস্তা তারা পাকা করে ফেলে। প্রতিটি রাস্তা ছিল দক্ষ প্রকৌশলীদের নকশা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী বানানো। এসব রাস্তা অনেক বছর ধরে টিকে ছিল। এমনকি আজ দুই হাজার বছর পরও রোমানদের তৈরি রাস্তা দেখতে পাওয়া যায়।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার
রোমান ইতিহাসে অনেক ক্যালেন্ডারের কথা বলা আছে। তবে প্রাচীন রোমে সবচেয়ে কার্যকর ক্যালেন্ডারের কথা যদি বলতে হয়, তবে সেটি হচ্ছে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। মাস, দিন, অধিবর্ষসহ যেসব গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের খোঁজ পাওয়া যায়, তার সবই জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে অনুপ্রাণিত। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মূলত তৈরি হয়েছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সমস্যা সমাধানের জন্য।
সুগঠিত ডাইনিং
খাওয়া-দাওয়া করতে ভালোবাসত রোমান সম্প্রদায়। আর এ কারণে ডাইনিং রুম তাদের থাকার জায়গার একটি অংশ হয়ে যায়। এখানে মূলত তিন ধরনের খাবার খাওয়া হতো। চা পর্ব, মূল খাবার আর মিষ্টান্ন। খাবার সময়ে ওয়াইন পরিবেশনেরও রীতি ছিল। গ্রিস থেকে নিয়ে আসা নানা ওয়াইন খাওয়া হতো খাবার শেষে।
বই বাঁধানো
বই বাঁধানো পদ্ধতি ব্যবহারের আগে, লেখা সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হতো পাথর অথবা পাকানো পৃষ্ঠা। প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে, প্যাপিরাস দিয়ে বাঁধাই করা প্রথম হাতে লেখা পুঁথি তৈরি করে রোমানরাই। যদিও পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত বই সেভাবে তৈরি হয়নি।
পাইপ
প্রাচীন রোমানরাই সর্বপ্রথম এক্যুইডাক্ট বা কৃত্রিম জলপ্রবাহ তৈরি করতে যুগান্তকারী পাইপ সরবরাহ পদ্ধতির আবিষ্কার করে। পাইপের মধ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে নগরে নিয়ে যেত। ধীরে ধীরে তারা উন্নত মানের পাইপ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। তারাই প্রথম এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এবং পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন করতে উৎসাহ দেয়।
কুরিয়ার সার্ভিস
রোমান সাম্রাজ্যর সর্বপ্রথম রোমান সম্রাট অগাস্তাস কুরিয়ার পদ্ধতি চালু করেন। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘কারসাস পাবলিকাস’। এর মাধ্যমে নানা ধরনের বার্তা এবং ট্যাক্সজাতীয় তথ্যাদি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আদান-প্রদান করা হতো। প্রথমে এটি পার্সিয়ান পদ্ধতিতে চালু করা হলেও পরে তিনি এই দায়িত্বকে একজন ব্যক্তির মধ্যেই অর্পণ করেন যেন বিভিন্ন জায়গায় একজনকে দিয়েই তথ্য পাঠানো যায়। এই পদ্ধতি কিছুটা ধীরগতির হলেও নিরাপত্তা আর হাতে-হাতে তথ্য প্রদানের জন্য ছিল বেশ উপযুক্ত।
দেয়াল ছবি
দেয়াল ছবি আধুনিক আর্ট নয়, এটি প্রাচীন রোম থেকেই ছিল। ৭৯ খ্রিস্টাব্দে মাউন্ট ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতের পর থেকে পম্পেই সংরক্ষণের জন্য দেয়াল ছবি ছিল। দেয়ালে হিজিবিজি শব্দে অনেক কিছু লেখা থাকত। যেমন : ‘হে দেয়াল, আমি সত্যিই অবাক হই, তুমি এখনো ভেঙে পড়োনি, কতশত লেখকের পদছাপ নিয়ে তুমি টিকে আছো।’
আইনি পদ্ধতি
রোমান আইন জীবনের সবদিককে প্রাচীন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। নাগরিকত্ব, অপরাধ, শাস্তি, দায়বদ্ধতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি থেকে পতিতাবৃত্তি, কল্পনা এবং স্থানীয় রাজনীতি পর্যন্ত রোমানরা আইনি ব্যবস্থায় সর্বোত্তম অনুশীলন গঠনে সহায়তা করেছিল। যেকোনো অবস্থায় রোমানরা যেন সঠিক এবং সম-আইনি বিচার পায়, সে জন্য ‘টুয়েলভ টেবিলস’ সব সময় সচেষ্ট থাকত।
পত্রিকা
পত্রিকার কথা জানতে হলে অনেক পেছনে ফিরতে হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে, শুধু সিনেটরদের সব মিটিংয়ের রেকর্ড রাখার জন্য রোমানরা এটি শুরু করে। পরে, খ্রিস্টপূর্ব ২৭-এর পর, ‘অ্যাক্টা ডিউরনা’ নামে প্রতিদিনের একটি গ্যাজেট প্রথম পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়।
অ্যাপার্টমেন্ট ভবন
রোমান সময়ে তৈরি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনগুলো দেখতে বর্তমান সময়ের মতোই। ভবনগুলো যদি উঁচু জায়গায় হতো, তবে ভবনমালিকরা নিচের রুমগুলো দোকানি অথবা ব্যবসার কাজের জন্য ভাড়া দিত। এগুলোর নাম ছিল ‘ইনসুলি’। বেশির ভাগ সময়েই এগুলো দেওয়া হতো গরিব শ্রেণির লোককে যাদের নিজেদের ঘর ভাড়া করার অবস্থা ছিল না। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, এক অস্তিয়া শহরেই প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বাস করত।
ঘর গরম রাখার পদ্ধতি
সর্বপ্রথম এইচভিএসি সিস্টেম তৈরি করেছিল রোমানরা। গোসলের জন্য ‘হাইপোকাস্ট’ নামে অনেক বড় হাম্মামখানা পাওয়া যেত সে সময়। মেঝেতে সব সময় জ্বলন্ত আগুন একই সঙ্গে ঘর এবং হাম্মামখানাকে গরম রাখত।
কলোসিয়াম
কলোসিয়ামকে বলা হতো ফ্লাভিয়ান অ্যাম্পিথিয়েটার। ৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই রোমান কলোসিয়াম ছিল রোমানদের জন্য অনেক বড় উপহার। ঘটনার স্মৃতি রক্ষার্থে ১০০ দিনব্যাপী খেলার আয়োজনের জন্য খোলা হতো এটি। রোমানদের স্থাপত্যের নজির আর বিনোদনের অন্যতম প্রতীক ছিল এই কলোসিয়াম।
সেনাদের ওষুধ
প্রাচীন সময়ে, বেশির ভাগ সৈন্যদেরই যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হলে নিজেদের সেবা নিজেদেরই করতে হতো। দ্বিতীয় শতকে সম্রাট ট্রাজানের সময়ে, রোমান সৈন্যরা ‘মেডিসি’ নামে একটি পদ্ধতি চালু করে যেখানে চিকিৎসকরা ব্যথা পেলে ড্রেসিং অথবা ছোটখাটো সার্জারি করতে পারতেন। এরও অনেক সময় পর, ঘটনাস্থল ট্রেনিংপ্রাপ্ত চিকিৎসকসহ রোমান সৈন্যদের জন্য হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়।
রোমান সংখ্যা
সাধারণত জিনিসপত্রের সঠিক মূল্যমান নির্ধারণের জন্য রোমান সংখ্যা ব্যবহার করত রোমানরা। রোমানদের সময়ে, এটি প্রায় সবাই ব্যবহার করত। বর্তমানে এই সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা হয় শুধু আনুষ্ঠানিক কিছু কাজে। যেমন : সুপার বোল, অলিম্পিক এবং ভবন গঠনের সংখ্যায়ন করতে।
নালা-নর্দমা
খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় উপদ্বীপে আর্টস্কানের রাজত্বকালে রোমানরা নর্দমার পুরো পথ তৈরি করেছিল। পরে তারা এই নর্দমাগুলোকে আরও প্রসারিত করে। এই নর্দমা পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হতো না, হতো বন্যার পানি কমানোর জন্য।
সিজারিয়ান সেক্টর
রোমান আইনে যারা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুমুখী হন বা মারা যান, তাদের সিজারের মাধ্যমে সন্তান বাঁচানোর জন্য বিধান পাস করা হয়। সংকটাপন্ন মায়েদের জীবন এই পদ্ধতিতে হয়তো বাঁচানো যেত না, কারণ তেমন কার্যকর কোনো ওষুধ তখন ছিল না। বর্তমান সময় এ অবস্থা থেকে বের হয়ে এসেছে। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান উন্নত হওয়ার ফলে মা এবং সন্তান উভয়ের জীবন বাঁচানোর জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে নানা পদ্ধতি।
চিকিৎসার যন্ত্রপাতি
রোমানদের পম্পেই নগরীর বিভিন্ন সরঞ্জাম সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, চিকিৎসায় রোমানরা কী ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত। এর মধ্যে বেশ কিছু জিনিস ২০ শতক পর্যন্ত ব্যবহার করা হতো। সে সময় আবিষ্কৃত হয় ভ্যাজাইনাল স্পেকালাম, রেক্টাল স্পেকালাম এবং পুরুষদের জন্য ক্যাথেটার।
নগর-পরিকল্পনা
নগর-পরিকল্পনায় রোমানরা ছিল সত্যিই অসাধারণ। তাদের প্রতিটি কাজ মুগ্ধ করার মতো। এ সময়ই তারা প্রথম তৈরি করে ‘গ্রিড সিটিস’। পরে তাদের তৈরি অনেক নকশাই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যকেন্দ্রের প্রথম মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নগরের সঠিক পরিকল্পনা দিয়েই তারা আবিষ্কার করে যারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তারা ব্যবসা এবং উৎপাদনকে আরও বেশি কার্যকর করে তুলতে পারে।
ট্রাফিক সংকেত
ট্রাফিক এবং রাস্তার সংকেতগুলো যে শুধু আধুনিক সময়েই ব্যবহৃত হয় তা নয়। রোমানরাও এ ধরনের সংকেত ব্যবহার করত। অনেক রাস্তা আর হাইওয়েতে তারা ভ্রমণকারীদের রোম এবং অন্যান্য শহরের দিক ও দূরত্ব সম্পর্কে তথ্য দিতে বড় বড় ‘মাইলফলক’ ব্যবহার করেছিল।
রেস্তোরাঁ ও ফাস্ট ফুড
বর্তমানে ম্যাকডোনাল্ড হয়তো ভাবতে পারে তারাই প্রথম ফাস্ট ফুডের উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি তা নয়। প্রাচীন নগর পম্পেইয়ের বেশির ভাগ মানুষই রান্না করতে পছন্দ করত না। এর পরিবর্তে সবাই ‘পপিনাই’ অথবা প্রাচীন রেস্টুরেন্টগুলোতে খাওয়া-দাওয়া করতে বাইরে যেত। বাইরে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া বেশ স্বাভাবিক একটি বিষয় ছিল সে সময়।