চাঁদা না পেয়ে মসজিদের কাজ বন্ধ করে দিলেন ছাত্রলীগ নেতা

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চাঁদা না পেয়ে মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ করা এবং ঠিকাদার ও তার প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে মারধর-ভাঙচুরের ঘটনায় উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাসফিকুর রহমান সাকিবকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে জেলা ছাত্রলীগ। গত শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান আকতার ও সাধারণ সম্পাদক মারুফ রায়হান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তেঁতুলিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাসফিকুর রহমান সাকিবের নামে বেশ কিছু অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে, যা সংগঠনের শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ করেছে। তার বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরাসরি দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সভাপতি ও সম্পাদকের কাছে ব্যাখ্যা   

 

দিতে হবে। এর আগে সাকিবের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ কর্মী তেঁতুলিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদার টাকা না পেয়ে গত বৃহস্পতিবার তারা ওই মসজিদ নির্মাণকাজের ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের মারপিট এবং প্রকল্প এলাকায় থাকা চেয়ার-টেবিল ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পর মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নর্দান টেকনো ট্রেডের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে তেঁতুলিয়ায় একটি মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলা এই মসজিদ নির্মাণের কাজটি করছে রংপুরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নর্দান টেকনো ট্রেড। বেশ কয়েক দিন ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকল্প এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাকিবের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী ঠিকাদারের লোকজনের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। কিন্তু ঠিকাদার না থাকায় তারা এ বিষয়ে কোনো কথা বলেনি। তখন চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ রাখার কথা বলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। পরে গত বৃহস্পতিবার সকালে ঠিকাদার নাজমুল হক এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুসাইন মো. সাফি ম-লসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের উপস্থিতিতে ভিত্তি ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়। এ খবর পেয়ে ছাত্রলীগ নেতা সাকিব, প্রিন্স, রাজন, হৃদয়সহ ২৫-৩০ নেতাকর্মী সেখানে গিয়ে প্রকল্পের অস্থায়ী ঘর, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করে। এ সময় তারা ঠিকাদার নাজমুল হকসহ কর্মীদের মারধর করে এবং কাজ বন্ধ করে দেয়। মারপিটের ভিডিওচিত্র মোবাইল ফোনে ধারণের সময় ঠিকাদারের গাড়ির চালকের মোবাইল ফোন এবং এক্সেভেটরের গাড়ির চাবি খুলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এছাড়া দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের সব কাজ বন্ধ রাখতে বলে তারা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টেকনো ট্রেডের পরিচালক ঠিকাদার নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে সাকিব ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে। আমরা তা দিতে অস্বীকার করায় বারবার আমাদের কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে। বুধবার কাজ বন্ধ করে দিলে রাতেই আমি রংপুর থেকে তেঁতুলিয়ায় যাই। বৃহস্পতিবার সকালে আমরা ভিত্তির ঢালাইয়ের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই। কাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সাকিব তার ২৫-৩০ সহযোগী নিয়ে হাজির হয়। কাজ শুরু করার অনুমতি দিল কে বলেই তারা ভাঙচুর শুরু করে। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু তারা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকে ও আমার লোকজনকে মারধর করে। আমরা এ ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতিমধ্যে একটি লিখিত অভিযোগ আমি তেঁতুলিয়া থানায় দিয়ে এসেছি।’

একই ধরনের অভিযোগ করেন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চাঁদা না দেওয়ায় এবং ইট, বালু ও পাথর সরবরাহের সুযোগ না দেওয়ায় তারা এসে কোনো কথা না বলেই ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় ঠিকাদার ও আমাদের লোকজনদের মারধর করে। এমনকি চাঁদা না দিয়ে কাজ শুরু করলে আমাদের সিমেন্টের সঙ্গে বেঁধে ঢালাই করে দেওয়ার হুমকি দেয়। তাদের হুঁশিয়ারি অমান্য করলে অবস্থা খারাপ হবে বলে হুমকি দিয়ে পরে চলে যায়।’

ছাত্রলীগ কর্মীদের বাধায় কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চগড় গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুসাইন মো. সাফি ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। একদল ছেলে সেখানে এসে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং ঠিকাদারসহ লোকজনদের মারপিট করে। আমি বিষয়টি আমার ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগ নেতা সাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেছে, ‘আমরা কোথাও কোনো চাঁদাবাজি করিনি। আমরা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে বিশ্বাস করি না। তবে আমি আমার কর্মীদের এসব থেকে বিরত রাখতে তাদের কাজের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম। তারা (ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান) যেসব অভিযোগ করছে তা সম্পূর্ণ বানোয়াট।’

ছাত্রলীগ নেতাদের হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তেঁতুলিয়া মডেল থানার ওসি জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি শোনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ ব্যাপারে এখনো কেউ আমাকে কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’