সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েরা। এক সময় মেয়েরা মাঠে ফুটবল খেলবে, এমনটা ভাবাই ছিল অকল্পনীয়। সেখানে এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়মিত চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে লাল-সবুজের মেয়েরা। ফুটবল মাঠে কৃষ্ণা রানী সরকার, সানজিদা আক্তাররা লিখছেন সাফল্যের গল্প। আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিয়মিত বাঁশি বাজাচ্ছেন সাবেক ফুটবলার জয়া চাকমা, সালমা ইসলাম মনিরা। এসব চিত্রই বলে প্রেক্ষাপট কিছুটা বদলেছে। তবে দেশের প্রথম নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করা রেফারি জয়া চাকমা বলছেন, এখনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকার মেয়েরা।
ক’দিন আগে জয়া চাকমা ও সালমা ইসলাম মনি দেশের জন্য বয়ে এনেছেন বড় গৌরব। রেফারি হিসেবে জয়া চাকমা ও সহকারী রেফারি হিসেবে সালমা আক্তার মনি ফিফার তালিকাভুক্ত হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। সব ঠিক থাকলে আগামী বছর থেকে ফিফার ম্যাচে বাঁশি বাজাবেন জয়া। জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার জয়া একই সঙ্গে ফুটবল কোচও। বিকেএসপির নারী ফুটবল দলের কোচ তিনি।
রাঙামাটির মেয়ে জয়া চাকমার এগিয়ে চলার পথটা আসলে দারুণ অনুপ্রেরণার। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের শুরুর সময়ের সারথি জয়া। ২০১০ এসএ গেমসে বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। তবে ২০১২ সালে দল থেকে পড়ার পর আর ফেরা হয়নি দলে। কিন্তু জয়া ফুটবলেই থাকতে চেয়েছেন শুরু থেকেই। ২০১০ সালেই রেফারিংয়ে লেভেল থ্রি কোর্স করে রেখেছিলেন। তাই রেফারিংয়ে পা রাখেন। ২০১২ সাল থেকে নিয়মিত ঘরোয়া ফুটবলে রেফারিং করছিলেন। দেশের প্রথম নারী রেফারি হিসেবে পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক ম্যাচ। লেভেল টু, লেভেল ওয়ান কোর্স করেন রেফারিংয়ে। ২০১৬ সালে হন জাতীয় রেফারি। এরপর গত দুই বছর ফিফা রেফারি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তবে এবার উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ফিফা ম্যাচ পরিচালনার স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় এখন জয়া। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপে জয়া বলেন, ‘যখন আমি ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কা যাই, প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করতে, তখন থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আমি ফিফার রেফারি হব।’ শুধু রেফারিংয়েই থেমে নেই জয়া। কোচিংয়ে এএফসি ‘বি’ লাইসেন্স করেছেন। বিকেএসপির নারী ফুটবল দলের কোচ তিনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে কোনটা বেশি ভালোবাসেন জয়া? রেফারিং না কোচিং?
জয়ার উত্তর, ‘আমার কাছে ফুটবলই বেশি ভালো লাগে। সেটা রেফারিং হোক বা কোচিং হোক। বেশি-কম নেই। দুটিই আসলে ফুটবল নলেজের বিষয়। আমি ফুটবল নলেজের ওপরে ধ্যান দিই। আর এখন লক্ষ্য- মেয়েদের ফুটবলের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা।’
মেয়েদের ফুটবলে নিজের শুরুর সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে বেশ পার্থক্য দেখেন জয়া। তার মতে, ‘আমরা যখন শুরু করেছিল তখন কাউকে ফুটবল খেলতে দেখিনি। আর এখন মেয়েরা দেখছে মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতে আসছে। আমি যখন রেফারিং শুরু করেছি কখনো কাউকে দেখিনি কোনো মেয়ে রেফারি বাঁশি বাজাচ্ছে। এখন মেয়েরা ফুটবলে আসলে এটা ভাবতে পারছে যে আমরা ফুটবলের পরও একটা ক্যারিয়ার গড়তে পারি। সেটা রেফারিং হোক বা কোচিং। এখন জায়গাটা প্রশস্ত হয়ে গেছে।’
কিন্তু এই প্রশস্ত জায়গাটাতেই কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখেন জয়া। ইউরোপিয়ান ফুটবলে ছেলেদের খেলায় নারী রেফারিরা ম্যাচ পরিচালনা করছেন। ঘরোয়া ফুটবলে জয়ারও অভিজ্ঞতা আছে ছেলেদের ম্যাচ পরিচালনা করার। তবে সেটা লোকদেখানো বলে মনে করেন জয়া, ‘আমি পাইওনিয়ার, স্কুল ফুটবলে নিয়মিত রেফারিং করছি। তৃতীয় বিভাগ (ছেলেদের ফুটবলে) পর্যন্তও ম্যাচ করেছি। তৃতীয় বিভাগে একটা ম্যাচ করেছি। যদিও ওই ম্যাচটা অত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই আমাকে দিয়ে চালিয়েছে আরকি। এটা দেখানো, যে ছেলেদের টুর্নামেন্টে আমাদের মেয়েরাও কাজ করছে।’
জয়া তাই বলছেন, ‘আশা করি এখন এটা বদলাবে। আমাদের মেনে নেওয়ার বিষয়টি আসতে হবে। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তো থেকেই থাকে। যতই আমি ফুটবল কোচ, রেফারি হই, দিন শেষে যদি আমাদের বিবেচনা করা হয় আমি মেয়ে, তাহলে কিন্তু কিছু করার থাকে না। আমাদের বাঁধার জায়গা আসলে এটাই। দিন বদলাচ্ছে। আমাদের এই জায়গাগুলো বিবেচনা করা লাগবে।’