অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার জি কে শামীম এবং কলাবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ। রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এমন তথ্যই দিয়েছেন তারা। জিজ্ঞাসাবাদে শামীম টেন্ডার ও বিভিন্ন কাজের বিল পাওয়ার জন্য বিভিন্নজনকে ঘুষ দেওয়ার তথ্য দিয়েছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথা স্বীকার করেছেন ফিরোজ। আর খালেদ জানিয়েছেন, ক্যাসিনোর টাকার ভাগ পুলিশকেও দিয়েছেন তিনি।
এদের মধ্যে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গুলশান থানা পুলিশের হেফাজতে, খালেদ মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে ও ফিরোজ ধানমন্ডি থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তদন্ত তদারকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য দিয়েছেন।
শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদ : গুলশান থানা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডের প্রথম দিনে জি কে শামীম জানিয়েছেন, তার বাসা থেকে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়নি। যেসব মদের বোতল উদ্ধার হয়েছে সেগুলো কার, সেটাও তিনি জানেন না বলে দাবি করছেন। অস্ত্রের বিষয়ে বলেছেন, তার সাতটি অস্ত্র ২০২১ সাল পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন করা রয়েছে। তাই অস্ত্রগুলো বৈধ। তার দেহরক্ষীরা সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া এবং তারা সবাই প্রশিক্ষিত। কেউ অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত নন। অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারে টেন্ডার নেওয়া বিষয়ক প্রশ্নে তিনি পুলিশকে বলেছেন, বর্তমানে ই-টেন্ডারের মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে টেন্ডার ড্রপ করা যায়। তাই অস্ত্র দেখিয়ে টেন্ডারবাজি করতে হয় না। বিল তোলার সময় গণপূর্তসহ বেশকিছু দপ্তরে ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে স্বীকার করছেন শামীম। কাদের কত টাকা দিয়েছেন তার কিছু তথ্য দিলেও তদন্তের স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করেনি পুলিশ।
গত শুক্রবার গুলশান নিকেতনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শামীমকে। পরদিন অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও মানি লন্ডারিং আইনে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করে র্যাব। এর মধ্যে দুটি মামলায় তাকে পাঁচ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। এছাড়া অস্ত্র মামলায় শামীমের সাত দেহরক্ষীকে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রিমান্ডে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম বলেন, শামীম ঠিকাদারি ব্যবসা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। আর তিনি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার ও মাদক রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ : এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া দাবি করেছেন, অবৈধ অস্ত্র ও ইয়াবাগুলো তার নয়। সেটা কীভাবে তার বাসায় গিয়েছে সেটা তিনি জানেন না। তবে তিনি ইয়ংমেন্স ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো ও হাউজি বোর্ড চালানোর কথা স্বীকার করেছেন। ওইসব ক্লাব থেকে পাওয়া অর্থ পুলিশের অনেক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাকে মাসোহারা হিসেবে দিতেন। পুলিশের নামের বড় একটি তালিকাও দিয়েছেন তিনি। ওইসব নাম পাওয়ার পর অস্বস্তিতে পড়েছেন খোদ ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গত শনিবার ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে ডিএমপির সব ডিসি, এসিডি ও থানার ওসিদের ডেকে এনে অবৈধ টাকা নেবেন না মর্মে শপথ পড়ান। ওই সভায় কমিশনার কার কাছে কী তথ্য সেটাও জানতে চান।
জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির কমিশনার শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, রিমান্ডে থাকা আসামি কিছু তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো সত্য না মিথ্যা যাচাই করা হচ্ছে।
গত বুধবার রাতে গুলশানের বাসা থেকে খালেদকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। এ সময় তার বাসা থেকে লাইসেন্স করা দুটিসহ তিনটি অস্ত্র, ১০ লাখ টাকা ও ৫৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তিনটি মামলা করেন র্যাব-৩-এর ওয়ারেন্ট অফিসার গোলাম মোস্তফা। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় চার ও মাদক মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে দিয়েছে আদালত। গতকাল ছিল রিমান্ডের চতুর্থ দিন।
ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদ : কলাবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ মাদক ও অবৈধ অস্ত্র রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের ধানমন্ডি জোনের এক কর্মকর্তা। ফিরোজ জানান, ক্লাবে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য রাখার প্রশ্ন আসে না। যারা অভিযান পরিচালনা করেছে তারাই বলতে পারবে এগুলো কোথা থেকে এসেছে। তিনি পুলিশকে বলেছেন, বহু বছর ধরে রাজনীতি করেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে তার সঙ্গে অনেকের শত্রুতা থাকতে পারে। তারাই তার (ফিরোজ) বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। ফিরোজ বলেছেন, ২০১৭ সাল থেকে কলাবাগান ও ধানমন্ডি ক্লাবে জুয়ার বোর্ড বন্ধ রয়েছে। তবে সেখানে তাস খেলা ও তাসের মাধ্যমে জুয়া খেলা চলমান থাকার বিষয়ে স্বীকার করেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এক সময় সুইডেন আসলাম, আওরঙ্গজেবসহ অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে সখ্য ছিল ফিরোজের। বলা যায় তারাও তাকে ভয় পেত। বর্তমানে ফিরোজের কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। দাবি করেছেন, তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি নির্বাচন করতে চেয়েছেন। এ নিয়ে একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব হয়েছে। যার ফলে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। ধানমন্ডি জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ আল কাফি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফিরোজ কিছু তথ্য দিয়েছেন সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করছি। তিনি মাদক ও অস্ত্র রাখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
গত শুক্রবার কলাবাগান ক্লাবে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে প্রায় এক হাজার পিস হলুদ ইয়াবা ও একটি অবৈধ অত্যাধুনিক পিস্তল উদ্ধার করে র্যাব। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে র্যাব। দুই মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় তাকে। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফিরোজকে কৃষক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।