পেঁয়াজে পরনির্ভরতা কমানোর উপায়

বেশি দিনের কথা নয়, গত বছর জানুয়ারি মাসে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দামে ধস নামে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১ রুপি দামে। সে-সময় হিলি স্থলবন্দরে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৪ থেকে ৫ টাকা দামে। মহারাষ্ট্রের অনেক কৃষক রাগে-দুঃখে মাঠ থেকে পেঁয়াজ না তুলে উৎপাদিত পেঁয়াজ  ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন। ভারতের পেঁয়াজের দরপতনের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে। ওই সময় প্রতিকেজি বাংলাদেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ টাকা কেজিতে। এত অল্প দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে চাষিরা পেঁয়াজের উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। কৃষকদের প্রতি বিঘা জমির উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসেও পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ার কারণে রাস্তায় পেঁয়াজ ফেলে প্রতিবাদ জানান মেহেরপুরের পেঁয়াজ চাষিরা। ওই সময় তারা বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ও অন্যান্য সবজির মতো বিদেশে পেঁয়াজ রপ্তানির দাবি জানান।

 

বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে প্রয়োজনীয় পেঁয়াজ দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু ভারতীয় পেঁয়াজের আগ্রাসনের কারণে বাংলাদেশের কৃষক পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পান না। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের  প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ পচে নষ্ট হয়ে যায়। ভারতে বছরে দুই বার পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। একবার শীতকালে আর একবার গ্রীষ্মকালে। বাংলাদেশে  শীতকালেই অধিকাংশ পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে তেমন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় না বললেই চলে। যদিও গ্রীষ্মকালে চাষ করার মতো উন্নত জাতের ‘বারি পেঁয়াজ-২’ ও ‘বারি পেঁয়াজ-৫’ নামের দুটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে মসলা গবেষণা কেন্দ্র। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

 

বন্যায় ভারতের মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে পেঁয়াজ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যটির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারত সরকার গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে প্রতি টন পেঁয়াজের  ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ করে ৮৫০ ডলার। অথচ সাত দিন আগেও ভারতে পেঁয়াজের  রপ্তানি মূল্য ছিল প্রতি টন ২৫০ থেকে ৩০০ ডলার। ভারতে রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধির সংবাদে বাংলাদেশে এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।  ভারত দাম বাড়ানোর আগে দেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজের খুচরা মূল্য ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে। রসুন ও আদার মূল্য আগেই বেড়েছে। এখন পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপদে পড়েছেন স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ।

 

জনপ্রতি দৈনিক ৪০ গ্রাম হিসেবে বাংলাদেশে বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। সংরক্ষণের অভাবে শতকরা ৩০ ভাগ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। সেই হিসাবে  নষ্ট পেঁয়াজের পরিমাণ ৯ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন। বিনষ্ট পেঁয়াজের পরিমাণ বাদ দেওয়ার পরও দেশে উৎপাদিত মজুদ পেয়াজের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার মেট্রিক টন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশে এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ ১০ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টনের মতো। অর্থাৎ দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত পেঁয়াজের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন, যা প্রয়োজনের চেয়ে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন বেশি। এসব পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয়, তাহলে দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে এবং ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না।

 

২০১৭ সালেও ভারত পেঁয়াজের সর্বনিম্ন রপ্তানি মূল্য ৪৩০ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ ডলারে নির্ধারণ করে। ওই সময় ঢাকায় ভারতীয় পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দর বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকা। সে-সময় মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ টাকা। এখন ডলারের দাম হয়েছে ৮৫ টাকা। সে হিসাবে ওই সময়ের চেয়ে পণ্যটির দাম এবার বেশি হবে। আমদানিকারকদের মতে ভারত থেকে ৮৫০ ডলারে প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানি করলে ভাড়া ছাড়াই পণ্যটির দাম পড়বে ৭২ থেকে ৭৩ টাকা। তারপর পরিবহন খরচ ও ব্যবসায়ীদের লাভ যোগ করলে বাংলাদেশে ভারতীয় আমদানিকৃত পেঁয়াজের  খুচরা দাম  পড়বে ৯০ টাকা। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে প্রতি টন পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে ৪৬০ ডলার দামে। ওই দেশটি  থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজি ৫০ টাকার বেশি হওয়া কথা নয়। তবে মিয়ানমার  থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ভারতীয় পত্র-পত্রিকার খবর বলছে, মহারাষ্ট্রের পাইকারি বাজার লাসালগাঁওয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর, পেঁয়াজের পাইকারি দাম ছিল ৩৫ রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪১ টাকা। টিসিবি গত মঙ্গলবার (১৭.৯.১৯) থেকে স্বল্প পরিসরে রাজধানী ঢাকায় পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। টিসিবি জনপ্রতি ২ কেজি  করে  প্রতি কেজি ৪৫ টাকা দরে ঢাকার ৫টি স্থানে মাত্র ৫ টন পেঁয়াজ বিক্রি করে। দেশে প্রতিদিন পেঁয়াজের চাহিদা ৬ হাজার ৫৭৫ টনের বিপরীতে টিসিবির ৫ টন পেঁয়াজ বিতরণ বাজারে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। এদিকে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন এবং সুদের হার কমানোর জন্য উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরে যাতে বাড়তি সময় ব্যয় না হয় তার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্যটা বেশিÑ এটা কমানোর জন্যও চেষ্টা চলছে।

 

ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার পর দেশটি থেকে কোনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। আগের আনা পেঁয়াজই বাজারে আছে; যার দাম কোনোভাবেই ৫০ থেকে ৫৫ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অতিলোভী ব্যবসায়ীরা পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দিয়ে ভোক্তাদের বিপদে ফেলেছেন। আমদানি করা পেঁয়াজের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ আসে ভারত থেকে। বাকি ১০ থেকে ২০ ভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয় মিয়ানমার, মিসর ও চীন থেকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানির ওপর জোর দেওয়া যায়। টিসিবির মাধ্যমে সারা দেশে পেঁয়াজ বিক্রির কাজ জোরদার করতে হবে। দিনে ৫টন নয়, কম পক্ষে ২ থেকে ৩ হাজার টন পেঁয়াজ সারা দেশে টিসিবির ডিলারদের মাধ্যমে বিতরণ করতে হবে। 

 

নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি ভারতের মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে। বাংলাদেশে মধ্য ডিসেম্বর থেকে নতুন মুড়ি কাটা পেঁয়াজ তোলা শুরু হবে। উৎপাদন ও আমদানি মিলে দেশে যদি ২৭  লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টনও পেঁয়াজ থাকে, তা হলে গত ৯ মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে পেঁয়াজ ব্যবহার হয়েছে ১৮ লাখ মেট্রিক টন। দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ মজুদের পরিমাণ ৯ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন। আগামী তিন মাসে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৬ লাখ মেট্রিক টন। তাহলেও দেশে ৩ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উদ্বৃত্ত থাকবে।

 

আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি টন আলু উৎপাদিত হয়। আমাদের বার্ষিক আলুর চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। ফলে প্রতি বছর ৩০ লাখ মেট্রিক টন প্রয়োজনের অধিক আলু নিয়ে বিপদে পড়েন আলু চাষিরা। আলু বিক্রি করে কখনো কখনো হিমাগারের ভাড়া ও উৎপাদন খরচ তুলতে পারেন না আলু চাষিরা। আমন ধান কাটার পর যেসব জমিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ৩০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়, সেখানে যদি আলুর পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে পেঁয়াজের চাষ করা হয় এবং আলুর মতো দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষায়িত হিমাগার বা ওয়ার হাউজ নির্মাণ করা হয়Ñ তা হলে  বাংলাদেশ পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে এবং পেঁয়াজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাবে বহুলাংশে। কৃষকও পণ্যটির ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হবেন। এছাড়া রবি মৌসুমের পাশাপাশি দেশে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের ওপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে গ্রীষ্মকালীন  পেঁয়াজ চাষের ওপর  প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। প্রশিক্ষণ দিতে হবে কৃষকদের।

 

লেখক

 সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস্ লি., নাটোর

netairoy18@yahoo.com