এনআইডি জালিয়াতি

জড়িত ১৫ জন নজরদারিতে

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি ও দুর্নীতি বন্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু হয়েছে জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেছেন, ইতিমধ্যে দুটি তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রাথমিক তথ্যে সন্দেহভাজন ১৫ জনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এনআইডি জালিয়াতি বন্ধে যা যা দরকার, তার সবই করা হবে।

ডিজির এই সংবাদ সম্মেলনের পরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের আরও এক অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন এনআইডি প্রকল্পের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ শাহানুর মিয়া। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এনআইডি অনুবিভাগের জনসংযোগ শাখায় সংযুক্ত ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি কিছুদিন স্মার্টকার্ড শাখাতেও কাজ করেন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনেও শাহিনুর মিয়ার উপস্থিতি দেখা যায়। সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছু সময় পর তাকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একটি দল গ্রেপ্তার করে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট থেকে তার আটকের বিষয়ে জানালেও কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটা বলা হয়নি।

জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের মূল ডেটাবেজ সুরক্ষিত আছে। যারা এখানে ঢোকার অপচেষ্টা করেছিল তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগ এই অপচেষ্টাকারীদের চিহ্নিত করেছে। আমরা কাউকে ছাড় দেব না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। এনআইডিতে কোনো ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, সিআইডি, দুদক, এসবির সহায়তা নেওয়া হবে।

অতীতে এনআইডির প্রকল্পের কাজে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদেরও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধের কারণে ইসি থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন যারা, তাদের তালিকা করে আমরা বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছি । কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিয়েছি, যাতে কোনোভাবেই অস্থায়ী ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেওয়া না হয়। ডেটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবেও যাতে তারা নিয়োগ না পান সে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুতদের আমরা কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখছি।’

সম্প্রতি এক রোহিঙ্গা নারী ভুয়া এনআইডি সংগ্রহ করে চট্টগ্রামে পাসপোর্ট নিতে গিয়ে ধরা পড়ার পর জালিয়াত চক্রের খোঁজে নামে ইসি। এরপরই রোহিঙ্গা সন্দেহে অর্ধশত এনআইডি বিতরণ আটকে দেয় এনআইডি অনুবিভাগ।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ড দেওয়া ও স্মার্টকার্ড দেওয়ার সঙ্গে প্রায় দেড় ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে মহাপরিচালক সাইদুল ইসলাম এই জালিয়াত চক্রের সঙ্গে কতজন সম্পৃক্ত রয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেননি। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে নাম বলতে চাই না। আমরা পর্যায়ক্রমে তাদের নাম প্রকাশ করব। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এর সঙ্গে কতজন জড়িত। তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার স্বার্থে আমরা এখনই তাদের নাম প্রকাশ করছি না। তবে এই সংখ্যা ১৫ জনের বেশি না।’ দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করার আশ্বাস দিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের ৬১ জনের তালিকা পেয়েছি, যারা ভোটার হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তারা কীভাবে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করল, কারা তাদের সহযোগিতা করল, যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১২ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থেকে ইসির চারটি এবং বিভিন্ন সময় আরও তিনটি ল্যাপটপ হারিয়েছিল। তবে সার্ভারে প্রবেশের জন্য ইসির নির্ধারিত পাসওয়ার্ড ও মডেম থাকতে হয় বলে ওই ল্যাপটপগুলো দিয়ে সার্ভারে প্রবেশ করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে যদি দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা দুদকের সহযোগিতা নেব। শুধু দুদক নয়, যে কোনো সংস্থার কার্যক্রমকে আমরা স্বাগত জানাই। রোহিঙ্গাদের ভোটার করার ব্যাপারে যাদেরই সম্পৃক্ততা পেয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি এবং তা অব্যাহত থাকবে। এখানে যদি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করতে হয় আমরা তা করব। ফৌজদারি মামলা করতে হলে আমরা তাও করব।’

মহাপরিচালক জানান, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া ঠেকাতে ইসি কর্মকর্তাদের বদলি করা হবে, যাতে তারা একই জায়গায় দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারে। সেই সঙ্গে নিবন্ধন কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড যাতে অন্যরা ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য কড়া নজরদারি করা হবে। যদি কেউ হস্তান্তর করে তাহলে সেই ব্যর্থতার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইসির এনআইডি উইংয়ের  পরিচালক (অপারেশন্স) আবদুল বাতেন, ইসির আইসিটি মেনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ হোসেন, ৫ সদস্যের প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির প্রধান এনআইডি উইং পরিচালক খোরশেদ আলম, কারিগরি বিশেষ তদন্ত কমিটির প্রধান এনআইডি পরিচালক ইকবাল হোসেন ও সদস্য এনআইডি উইংয়ের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সাহাব উদ্দিন  সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।