ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটছেই। দুর্ঘটনাগুলো মারাত্মক। কোনো কোনোটা অবিশ্বাস্য। মানুষ পাচার হচ্ছে, সমুদ্রে ভাসছে, ডুবছে, মরছে, তীরে উঠে দাসের জীবনযাপন করছে, হারিয়ে যাচ্ছে। তবু মানুষ পড়ি তো মরি করে ছুটছে, বিদেশে যাবে, কেননা দেশে তার জন্য কর্মের সংস্থান নেই। দেশের অর্থনীতি যে টিকে আছে তার মূল কারণ কৃষক। কৃষক শ্রম দেয়, বিনিয়োগ করে, কিন্তু পরিণতিতে শ্রমের মূল্য পায় না, বিনিয়োগ উঠে আসে না। উৎপাটিত হয়ে সে শহরে আসে, নয়তো বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। অতিউন্নত ভারতে কৃষকের আত্মহত্যা এখন স্বাভাবিক ঘটনা, বাংলাদেশও মনে হয় পিছিয়ে থাকবে না।
বৈশাখে বাঙালির উৎসব করার কথা, অধিকাংশই তা করে না। খাজনার কথা ভাবে, আকাশের তপ্ত সূর্য দেখে ভয় পায়। কিছুটা ভালো যাদের অবস্থা, শহরে থাকে, বয়স অল্প, তারা পহেলা বৈশাখের উৎসব খোঁজে। ছেলেরা আসে, মেয়েরাও আসে। মেয়েরা বিপদে পড়ে। ঢাকা শহরের সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা যে এলাকা সেখানেই মেয়েরা নিগৃহীত হয়। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে, দেখেও দেখে না, বাধা দেয় না, কাউকে গ্রেপ্তার করে না, পাবলিক যদি ধরে ফেলে পুলিশ তবে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জে ত্বকী নিহত হয়। আসামিকে চেনা যায়, কিন্তু ধরা যায় না। ঢাকায় রুনি-সাগরকে হত্যা করা হয়। বছরের পর বছর ধরে তদন্ত চলে, কিন্তু রহস্যের উদঘাটন হয় না। শিশু জিহাদ খেলতে গিয়ে খোলা পাইপে পড়ে গিয়ে হারিয়ে যায়। সংবেদনশীল তরুণরা এগিয়ে আসে, কিন্তু হাত লাগাতে পারে না, রাষ্ট্রীয় লোকদের তৎপরতার কারণে; রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকর্মীরা জিহাদকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, তারা বলতে চায়, ঘটনা আসলে ঘটেইনি, গুজব মাত্র। শেষ পর্যন্ত ওই তরুণরাই জিহাদকে উদ্ধার করে, জীবিত জিহাদকেই হয়তো তুলে আনতে পারত, যদি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ না ঘটত। মৃত অবস্থায় ফেরত এসে জিহাদ অবশ্য তার পিতামাতাকে বাঁচিয়েছে, তা না হলে তারা অভিযুক্ত হতো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মামলায়, তার খেলার সাথীরাও অভিযোগের জাল থেকে বাঁচত কি না কে জানে। ওদিকে হত্যা, গুম, ছিনতাই, রাহাজানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতপ্রকাশের অধিকার নেই; সরকার কণ্ঠরোধ করে, জঙ্গিরা চাপাতি মারে। ওদিকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে ধর্ষণ এখন দুর্বৃত্তদের স্বচ্ছন্দ ও বীরত্বব্যঞ্জক বিনোদনে পরিণত হয়েছে। হানাদারদের সন্ত্রাসের কারণে একাত্তরে মেয়েরা বোরকার আড়ালে লুকাতে চাইত, সেই বোরকা আবার ফেরত এসেছে, তবু বাঁচতে পারছে না।
বলা হচ্ছে সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্যতিক্রমও নয়; সব কিছুই একই সূত্রে গাঁথা একই কথা বলে, সেটা হলো গোটা ব্যবস্থাটাই এখন ভয়ংকরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। কেন যে পারছে না তাও অজানা নয়। এ রাষ্ট্র জনগণের নয়। জনগণের কাছে এর কোনো জবাবদিহির দায় নেই। শাসনকর্তারা জনগণের সম্মতি নিয়ে শাসন করে না। এবং তাদের শাসন শোষণ ভিন্ন অন্যকিছু নয়। শোষণ চলে ক্ষমতার জোরে। শাসকদের একদল ক্ষমতা প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে থাকে, অপর দল দখল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে সংঘর্ষ বাধে। শাসকদের দুই পক্ষের এই সংঘর্ষই হচ্ছে এখন মূলধারার রাজনীতি। বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছেন তারা বলছেন আগে উন্নয়ন দরকার, গণতন্ত্র পরে দেখা যাবে। অর্থাৎ উন্নয়ন হবে শতকরা পাঁচ জনের, পঁচানব্বই জনের শ্রম ও বঞ্চনার ওপর ভর করে। অবশ্য এমন উন্নতিসাধনই স্বৈরশাসকদের স্বাভাবিক সাধনা।
মানুষ এখন ভরসা করবে কার ওপর? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেকেই বেআইনি কাজে ব্যস্ত। আদালতে বিচার পাওয়া যায় না। আইন টাকাওয়ালাদের সমীহ করে চলে। আর রাষ্ট্র নিজেই যখন অপরাধী হয়ে দাঁড়ায় তখন বিচারটা করবে কে? জনগণের জন্য গণমাধ্যমের পক্ষে ভরসাস্থল হওয়ার কথা। সাংবাদিকরা অনেক কিছুই দেখেন ও জানেন, কিন্তু সত্য প্রকাশ করতে পারেন না। সরকার বাধা দেয়, বাধা দেয় গণমাধ্যমের মালিক, যাদের স্বার্থ সরকারের স্বার্থের সঙ্গে অভিন্ন। পাকিস্তান আমলেও সাংবাদিকদের একটা শক্তি ছিল, কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। লৌহমানব আইয়ুব খান পর্যন্ত তাদের সমীহ করতেন। এখন তারা ভাগ হয়ে গেছেন শাসক শ্রেণির দুই বড় শরিকের লাইন ধরে।
বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অতীতে যে অত্যুজ্জ্বল ছিল তা নয়; এখন তা একেবারেই নিষ্প্রভ, ক্ষেত্রবিশেষে ন্যক্কারজনক। সাংবাদিকদের মতো তারাও খাড়াখাড়ি ভাগ হয়ে গেছেন। বড় বড় বুদ্ধিজীবীদের একদল শত নাগরিকের কমিটি গড়েছেন, দেখাদেখি অন্যদল খাড়া করেছেন সহস্র নাগরিকের কমিটি। শতদল অপ্রস্ফুটিত, সহস্রের দল কর্কশ বাচনে মুখর; কিন্তু এই শত-সহস্রদের কেউই জনবান্ধব নন, সবাই জনবিরোধী। ছাত্ররা ছিল, এখন নেই। জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান প্রবাহ সরকারের কুক্ষিগত, বিপরীত প্রবাহ সরকারের ভয়ে সন্ত্রস্ত। বামপন্থি ছাত্ররা দুর্বল ও বিভক্ত। দুই যুগ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নেই। তার অর্থ ছাত্ররা সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই ফাঁকে দুর্বৃত্তরা বীর সেজে বহুবিধ অপকর্ম করে চলেছে।
সমাধান একটাই; রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছি। রাষ্ট্র আকারে এবং নামে বদলেছে, কিন্তু স্বভাব-চরিত্রে বদলায়নি; আগের মতোই ফ্যাসিবাদী রয়ে গেছে। তবে রাষ্ট্রের নিপীড়ন আজ আগের তুলনায় দুঃসহ, কেননা রাষ্ট্রকে বদলাবার জন্য মানুষ প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছে। রাষ্ট্র যে বদলিয়েও বদলালো না তার কারণ এর পুঁজিবাদী চরিত্র। মানুষ চেয়েছে পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত হবে। সে-মুক্তি আসেনি। তাই দুষ্ট লোকেরা যতই মিষ্টি কথা বলুক না কেন মুক্তির ওই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় নেই। ইতিমধ্যে ফ্যাসিবাদের তৎপরতা কিন্তু বাড়ছেই।
লেখক
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়