ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

জনসনের পার্লামেন্ট মুলতবির সিদ্ধান্ত বেআইনি

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পার্লামেন্টের অধিবেশন মুলতবির সিদ্ধান্তকে গতকাল মঙ্গলবার ‘বেআইনি’ ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। পার্লামেন্ট মুলতবিতে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে করা প্রধানমন্ত্রী জনসনের অনুরোধ আইনসম্মত ছিল না বলেও জানায় আদালত। আদালত জানায়, ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিট সময়সীমা সামনে রেখে দায়িত্বপালন না করে পার্লামেন্ট বন্ধ করে দেওয়া ভুল ছিল। যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের ১১ বিচারপতির সর্বসম্মত এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলছে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট লেডি হেল বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। পার্লামেন্ট মুলতবির ব্যাপারে রানীকে পরামর্শ দেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ এতে করে পার্লামেন্ট তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কোনো কারণ ছাড়াই বাধা পেয়েছে। ১১ জন বিচারকই বলেছেন পার্লামেন্ট মুলতবি না হলে সিদ্ধান্ত অন্যরকম হতে পারত।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিচারপতিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, পার্লামেন্ট স্থগিত হয়নি এই সিদ্ধান্ত বাতিল এবং এর কোনো কার্যকারিতা নেই। পরবর্তী সময়ে কী হবে সে সিদ্ধান্তের ভার হাউজ অব কমন্স এবং হাউজ অব লর্ডসের স্পিকারদের।’

আদালতের রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্মত নই। বিচারব্যবস্থার প্রতি আমার যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। আমি মনে করি না এটা কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ একই সময় তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে রানীর ভাষণ দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন।

আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়ে হাউজ অব কমন্সের স্পিকার জন বারকাউ বলেছেন, আর কোনো দেরি না করে পার্লামেন্ট বসবে। জরুরি ভিত্তিতে দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, এই রায়ে জনসনের ‘গণতন্ত্রের প্রতি অবমাননা’ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া তিনি অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগও দাবি করেছেন। আদালতের এই রায়ের পর প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন একদল আইনপ্রণেতা। যত দ্রুত সম্ভব পার্লামেন্ট অধিবেশন চেয়েছেন তারা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কোনো প্রধানমন্ত্রীরই আর কখনো উচিত হবে না এভাবে রানী অথবা পার্লামেন্টের সঙ্গে এমন ঘটনার সূত্রপাত করা। অবিলম্বে পার্লামেন্টের কার্যক্রম শুরু করা ও প্রধানমন্ত্রীর উচিত ক্ষমা চাওয়া।’

গত ১০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহের জন্য মুলতবি ঘোষণা করা হয়। এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছিলেন, আগামী ১৪ অক্টোবর পার্লামেন্টে রানীর ভাষণ সামনে রেখে তিনি যাতে তার সরকারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারেন সেইজন্য পার্লামেন্ট স্থগিত চেয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, পার্লামেন্ট সদস্যরা যাতে তার ব্রেক্সিট পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে না পারেন সেজন্য তাদের পাশ কাটাতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছেন জনসন।

ব্রেক্সিট প্রশ্নে এমপিদের একজোট করতে ব্যর্থ হয়ে টেরিজা মে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালে গত জুলাইয়ের শেষ ভাগে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন তার দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা বরিস জনসন। যুক্তরাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর নিয়মিতই পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিত করা হয়। ওই সময়ে নতুন সরকারের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে রানী কবে ভাষণ দেবেন তা ঠিক করা হয়।

যুক্তরাজ্যের বর্তমান আইনে ব্রাসেলসের সঙ্গে বিচ্ছেদের বিষয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পারুক বা না পারুক তাদের আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তেই হবে। তার আগে জনসনের পার্লামেন্ট স্থগিতের সুযোগ নেওয়ার বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন আইনপ্রণেতারা। পার্লামন্ট মুলতবির ঘোষণা এলে হাউজ অব কমন্সে ‘শেম অন ইউ’ বলে চিৎকার করেন কয়েকজন আইনপ্রণেতা।