দক্ষিণ-পশ্চিমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসছে না

ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী কমে এসেছে। চলতি মাসের শেষে রোগীর সংখ্যা আরও কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকার বাইরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ এখনো কমেনি। কিছুতেই বিভাগ দুটির আট জেলার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এসব জেলায় এখনো ঢাকার তুলনায় তিনগুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। জেলাগুলো হলো বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও বরগুনা এবং খুলনা বিভাগের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরা।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) গত আগস্টের শেষের দিকে এই দুই বিভাগে রোগী ও এডিস মশার জরিপ করে। জরিপ অনুযায়ী, এসব জেলায় ইজিপ্টি ও এলবোপিক্টাস দুই ধরনের এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জেলাগুলোয় এডিসের বংশ বিস্তারের সব ধরনের উপাদান মিলেছে। তবে ইজিপ্টির তুলনায় এলবোপিক্টাস লার্ভার পরিমাণ অনেক বেশি।

এ বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব জেলায় বাহকের মাধ্যমে যেমন ডেঙ্গু রোগ ছড়াচ্ছে, তেমনি এডিস মশার লার্ভাও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে আগে থেকেই সেখানে বংশ বিস্তার করা এলবোপিক্টাসের লার্ভার মাত্রা অনেক বেশি। এখন পরিবেশ পেয়ে বিস্তার বেড়েছে। এসব অঞ্চলে মশা নিধন কাজ হয় না বললেই চলে।

চলতি সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমতে থাকে। ৩০ আগস্টের আগপর্যন্ত প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। সেখানে ৩০ আগস্ট থেকে রোগীর সংখ্যা এক হাজারের নিচে নামতে থাকে। এভাবে কমতে কমতে গত সপ্তাহে দাঁড়ায় পাঁচশর নিচে। গত শুক্রবার মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ৫০৮ জন। পরের দুদিন শনি ও রবিবার আরও কমতে থাকলেও গতকাল সোমবার আগের দুদিনের তুলনায় রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬১ জনে।

ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে এলেও এ দুই বিভাগের কারণে ডেঙ্গু এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি বলেন, কিছুটা নিয়ন্ত্রণে। তবে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এখনো রোগী অনেক বেশি। তবে এখন অনেক কমে এসেছে। ২৫ হাজার থেকে ৫০০-তে নেমে এসেছে। এটা ইতিবাচক। এখন ঢাকার বাইরের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলা যাবে। দেশে এ বছর আর ডেঙ্গু বাড়ার আশঙ্কা নেই বলে মত দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, অক্টোবরেও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ সেপ্টেম্বরে এমনিতেই ডেঙ্গু কমে আসে। পরিবেশগত কারণেই ফ্যাক্টরগুলো কমতে থাকে। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে আর বাড়বে না।

‘তবে আগামী বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু নিয়ে ঝুঁকি আছে’ বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় এবার বেশিরভাগ রোগীই পুরনো ‘ডেন-৩’ সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হয়েছে। যেহেতু এই সেরোটাইপ এখানে পুরনো, গত দুই-তিন বছর ধরেই এটা দেখা যাচ্ছে, তাই অতটা ভয় নেই। তবে চিন্তা নতুন সেরোটাইপ নিয়ে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে এবার ‘ডেন-৩’ নতুন। তাই গ্রামাঞ্চলে নতুন সেরোটাইপ এলেও ঝুঁকি, আবার দ্বিতীয়বার দেখা দিলেও ঝুঁকি। ফলে আগামী বছর নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন আমরা।

‘তাছাড়া এবার ঢাকার বাইরে খুলনা ও যশোরে এডিস মশা পাওয়া গেছে। অনেক লার্ভাও পেয়েছি। ঢাকায় যেসব ফ্যাক্টর ছিল, গ্রামাঞ্চলে সবই মিলেছে। ঢাকার বাইরে বড় ঝুঁকি হচ্ছে সেখানে মশা নিধন হয় না। ফলে সেখানে আগে থেকেই বংশ বিস্তার করা এডিস এলবোপিক্টাস মশার পরিমাণ ও প্রজনন স্থান বেড়েছে’ বলেন তিনি।

এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন, আগামী বছর ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে হলে বছরজুড়ে মশা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। ঢাকার মতো ঢাকার বাইরেও মশা নিধন করতে হবে। এছাড়া এডিসের লার্ভা ও প্রজনন স্থান ধ্বংসে কিছুতেই বাড়ির ভেতর বা বাইরে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এ অভ্যাস নিয়মিত রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে দেশে ডেঙ্গুর রোগীর সংখ্যা কখনো কমেছে কখনো বেড়েছে। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ৬১৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ৫৩৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ৪৯১, ২০ সেপ্টেম্বর ৫০৮, ২১ সেপ্টেম্বর ৪০৮ ও ২২ সেপ্টেম্বর ভর্তি হয়েছিল ৪৩০ জন। গতকাল সোমবার দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৪৬১ জন। এ নিয়ে দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৮৫ হাজার ২৮৮ জন। সরকারি হিসাবে মোট মৃত্যু ৭৫ জন।

এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে এ বছর (১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত) ৫ হাজার ৪৪০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর গত সাত দিনে ভর্তি হয়েছে ৩৬১ জন। প্রতিদিন গড় আক্রান্ত ৫২ জন।

খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ হাজার ৩০৫ জন ভর্তি হয়েছে। আর গত সাত দিনে ভর্তি হয়েছে ৮৯৯ জন। প্রতিদিন গড়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২৮ জন ডেঙ্গু রোগী।

বরিশাল জেলা ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে চলতি বছর ২ হাজার ৯৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে আর গত সাত দিনে ভর্তি হয়েছে ১৬৩ জন, যার দৈনিক গড় আক্রান্ত ২৩। পিরোজপুর জেলায় মোট আক্রান্ত ৭৩৮ ও গত সাত দিনে আক্রান্ত ৭৩ জন। বরগুনা জেলায় মোট আক্রান্ত ৪৮৭ ও গত সাত দিনে ৩৬ জন। পটুয়াখালী জেলায় এবার মোট আক্রান্ত হয়েছে ৫৮৩ আর গত সাত দিনে আক্রান্ত ৪২ জন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও খুলনা জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৮৬৬ জন। গত সাত দিনে এই সংখ্যা ১০৭ জন, দৈনিক গড় আক্রান্ত ১৫। যশোর জেলায় এ বছর মোট আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৪৬ জন। গত সাত দিনে ৩৪০ জন, দৈনিক গড় আক্রান্ত ৪৯ জন। সাতক্ষীরা জেলায় মোট আক্রান্ত ৭৩৫ জন। গত সাত দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০০, প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হয়েছে ১৪ জন। কুষ্টিয়া জেলায় এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ১৪০ জন। এদের মধ্যে গত সাত দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭১, প্রতিদিনের গড় আক্রান্ত ২৫ জন।

এমন পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যার দিক দিয়ে এখন পরিস্থিতি সন্তোষজনক। অক্টোবরেও আর বাড়বে না। তাই এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে আর দুশ্চিন্তা নেই। তবে ডেঙ্গু যেহেতু সবসময়ই থাকে, তাই মশা নিধন বছরজুড়েই চালাতে হবে। আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলা যায়। তবে পুরোপুরি আসেনি। কারণ খুলনা ও বরিশাল বিভাগে রোগী বাড়ছে ও কমছে। ঢাকার পরিস্থিতি ভালো বলা চলে। খুলনা, যশোর ও বরিশালে এখনো ঢাকার তুলনায় দ্বিগুণ বেশি রোগী। দেশের আট বিভাগের মধ্যে এখনো খুলনা ও বরিশাল নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্যান্য বিভাগে বেশ উন্নতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ জেলায় কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি। এই দুই বিভাগের আট জেলায় এখনো অনেক বেশি রোগী। রংপুর, রাজশাহী ও সিলেটে রোগী অনেক কমেছে।

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে আইইডিসিআরের জরিপেও। গত বছরের শেষ সপ্তাহে চালানো এ জরিপে দেখা গেছে, এবার বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলায় (৫৪%), পিরোজপুরে (১৫%), ঝালকাঠি ও বরগুনায় (১০%) আক্রান্তের হার বেশি। জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের মধ্যে গৃহিণী ৪০ শতাংশ, শিক্ষার্থী ৩০, শিশু ১১, ব্যবসায়ী ৭ ও কৃষক ৬ শতাংশ। এই বিভাগে আক্রান্তদের মধ্যে ২৫-৩৪ বছর বয়সী সবচেয়ে বেশি। তারপর ঝুঁকিতে রয়েছে পঞ্চাশোর্ধ।

এই বিভাগে কীটতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচিত ১২০টি বাড়ির মধ্যে ৬টি বাড়ির ৯টি উৎসে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। সরকারি ও বেসরকারি ৫৬টি স্থাপনার মধ্যে ১৯টি স্থাপনার ২৫টি উৎসে লার্ভা পাওয়া গেছে। ৭৫৫টি লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ১৪টা এডিস মশা। এর মধ্যে ৭টি এলবোপিক্টাস। বাকিগুলো অন্য প্রজাতির। তবে এখানে এডিস ইজিপ্টি মশা পাওয়া যায়নি।

খুলনা বিভাগে কুষ্টিয়া জেলার জরিপ অনুযায়ী, এখানে পুরুষ ও নারীর সংখ্যার অনুপাত ৫২:৪৮ হলেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা নারীদের সংখ্যার প্রায় তিনগুণ। পেশার দিক থেকে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষক ২৫.৮ শতাংশ, গৃহবধূ ও চাকরিজীবী উভয়ই ২২.৬ শতাংশ করে এবং শিক্ষার্থী ১৬.১ শতাংশ। এখানে এলবোপিক্টাস ও ইজিপ্টি দুই ধরনের এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এখানে ৭১টির মধ্যে ৬৫টি বাড়ির (৯১.৫৫%) আশপাশেই ছোট মাটির পাত্র ও প্লাস্টিকের পাত্রে পানি জমেছিল।